পোষা প্রাণী আমাদের একাকীত্ব দূর করে এবং মানসিক প্রশান্তি যোগায়। তবে ভালোবাসার এই সঙ্গীদের শরীর থেকে অনেক সময় বিভিন্ন রোগজীবাণু মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘জুনোটিক ডিজিজ’।
সঠিক সচেতনতা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে এসব রোগ এড়িয়ে চলা সম্ভব। এসব বিষয় নিয়ে বিস্তারিত জানিয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. কাকলী হালদার-
১. জলাতঙ্ক বা রেবিজপোষা প্রাণীর মাধ্যমে ছড়ানো সবচেয়ে বিপজ্জনক রোগগুলোর একটি হলো জলাতঙ্ক। সাধারণত কুকুর, বিড়াল, বেজি বা বাঁদরের কামড় বা আঁচড়ের মাধ্যমে এই ভাইরাস ছড়ায়।
লক্ষণ: শুরুতে জ্বর, মাথাব্যথা এবং কামড়ানো স্থানে অস্বস্তি হয়। পরবর্তী পর্যায়ে পানিভীতি বা হাইডোফোবিয়া, বাতাসভীতি, প্রচণ্ড অস্থিরতা এবং পক্ষাঘাত দেখা দিতে পারে।
প্রতিকার ও প্রতিরোধ: কামড় বা আঁচড় দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতস্থান অন্তত ১৫ মিনিট সাবান-পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে। দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টি-রেবিজ ভ্যাকসিন নিতে হবে। সেই সঙ্গে আপনার পোষা প্রাণীকে নিয়মিত জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকা দিন।
২. ক্যাট স্ক্র্যাচ ডিজিজএটি মূলত বিড়ালের কামড় বা আঁচড় থেকে ছড়ানো একটি ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ। বার্টোনেলা হেনসেলি নামক ব্যাকটেরিয়া এজন্য দায়ী।
লক্ষণ: আক্রান্ত স্থানে ফোলাভাব বা লাল হয়ে যাওয়া, লসিকা গ্রন্থি বা লিম্ফ নোডস্ ফুলে যাওয়া, জ্বর, মাথাব্যথা এবং ক্লান্তি।
প্রতিকার: আক্রান্ত স্থানটি ভালোভাবে জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে। সংক্রমণের মাত্রা বেশি হলে চিকিৎসকের পরামর্শে অ্যান্টিবায়োটিক খেতে হবে।
এটি বিড়ালের বিষ্ঠার মাধ্যমে ছড়ানো এক ধরনের পরজীবী সংক্রমণ। বিশেষ করে গর্ভবতী নারীদের জন্য এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
লক্ষণ: শরীর ম্যাজম্যাজ করা, পেশিতে ব্যথা এবং লসিকা গ্রন্থি ফুলে যাওয়া। অনেক ক্ষেত্রে কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না। তবে গর্ভবতী নারী আক্রান্ত হলে গর্ভস্থ শিশুর মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে।
প্রতিকার: বিড়ালের ঘর বা লিটার বক্স পরিষ্কার করার সময় গ্লাভস ব্যবহার করুন এবং কাজ শেষে হাত ভালোভাবে ধুয়ে ফেলুন। গর্ভবতী নারীদের পোষা বিড়ালের বিষ্ঠা পরিষ্কার না করাই ভালো।
৪. দাদ বা ছত্রাক সংক্রমণকুকুর এবং বিড়ালের গায়ের লোম বা চামড়া থেকে এই চর্মরোগ ছড়ায়। এটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে একটি রোগ।
লক্ষণ: ত্বকের ওপর গোলাকার লাল চাকা তৈরি হয়, যাতে প্রচণ্ড চুলকানি থাকে। অনেক সময় ওই স্থানের লোম পড়ে যেতে পারে।
প্রতিকার: আক্রান্ত স্থানে অ্যান্টি-ফাঙ্গাল ক্রিম ব্যবহার করতে হয়। পাশাপাশি পোষা প্রাণীকেও চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গিয়ে সঠিক চিকিৎসা করাতে হবে যাতে তার থেকে পুনরায় সংক্রমণ না ঘটে।
৫. সালমোনেলোসিসমূলত কচ্ছপ, সরীসৃপ ও পাখির মল থেকে এই ব্যাকটেরিয়া ছড়ায়।
লক্ষণ: ডায়রিয়া, পেটে তীব্র ব্যথা, বমি বমি ভাব এবং উচ্চমাত্রার জ্বর।
প্রতিকার: খাবার ধরার আগে এবং পোষা প্রাণীর সংস্পর্শে আসার পর সাবান দিয়ে হাত ধোয়া নিশ্চিত করতে হবে। রান্নাঘরে বা ডাইনিং টেবিলের পাশে এসব প্রাণীকে ছাড়বেন না।
৬. কৃমি সংক্রমণকুকুর ও বিড়ালের মলের মাধ্যমে পরজীবী কৃমির ডিম মাটিতে ছড়ায়। শিশুরা খালি পায়ে মাটিতে হাঁটলে বা অপরিচ্ছন্ন হাত মুখে দিলে সহজেই আক্রান্ত হয়।
লক্ষণ: পেটে ব্যথা, কাশি, শ্বাসকষ্ট এবং মলের সঙ্গে রক্ত যাওয়া। হুকওয়ার্মের ক্ষেত্রে ত্বকের নিচে সুড়সুড়ি বা দাগ দেখা দিতে পারে।
প্রতিকার: পোষা প্রাণীকে নিয়মিত কৃমিনাশক ওষুধ খাওয়াতে হবে। শিশুদের বাড়ির বাইরে খেলার পর হাত-পা ধোয়ার অভ্যাস করাতে হবে।
রোগ প্রতিরোধের সাধারণ উপায়সমূহপোষা প্রাণীর মাধ্যমে ছড়ানো রোগগুলো প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ করাই উত্তম। প্রতিকারের কিছু কার্যকর উপায় হলো—
১. নিয়মিত টিকাদান: আপনার পোষা কুকুর বা বিড়ালকে সময়মতো রেবিজসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন দিন।
২. পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা: প্রাণীর সংস্পর্শে আসার পর, তাকে খাওয়ানোর পর বা তাদের বর্জ্য পরিষ্কার করার পর অবশ্যই ২০ সেকেন্ড ধরে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিন।
৩. ঘর পরিষ্কার রাখা: পোষা প্রাণীর থাকার জায়গা, বিছানা এবং খাবারের পাত্র নিয়মিত জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করুন।
৪. নিরাপদ দূরত্ব: প্রাণীদের কখনও মুখ বা ক্ষতে চাটতে দেবেন না। বিশেষ করে ছোট শিশু এবং বৃদ্ধদের (যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম) ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্ক থাকতে হবে।
৫. নিয়মিত চেকআপ: অন্তত ছয় মাস অন্তর আপনার পোষা প্রাণীকে অভিজ্ঞ ভেটেরিনারি চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান।
পোষা প্রাণী আমাদের পরিবারের অংশ। তাদের কাছ থেকে রোগ হওয়ার ভয় থাকলেও সচেতনতা অবলম্বন করলে ঝুঁকি প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন এবং আপনার প্রিয় সঙ্গীর স্বাস্থ্যের যত্ন নিন, তবেই আপনারা উভয়েই নিরাপদ ও সুস্থ থাকতে পারবেন।
এএমপি/এএসএম