দেশজুড়ে

বরগুনার বেশিরভাগ মানুষই জানে না গণভোট কী

‌‘এরশাদের আমলে একফির (একবার) গণভোট দিছি। এহন (এখন) আবার গণভোটের কথা হুনি (শুনি)। টিভির চ্যানেলেও নানান জায়গায় হুনি। এহন আবার কীভাবে কী ভোট দিমু মাথায়ই খ্যালে না।’

এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন বরগুনা সদর উপজেলার দক্ষিণ মনসাতলী গ্রামের ষাটোর্ধ্ব সুনিল সরকার। শুধু তিনি একা নয়, এমন বক্তব্য বরগুনার বেশিরভাগ মানুষের। তবে তাদের দাবি, সঠিক ধারণা পেলে নির্বাচনে ভোট দেওয়ার পাশাপাশি গণভোট বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন তারা।

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরগুনার দুটি আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এরমধ্যে বরগুনা-১ (বরগুনা সদর, আমতলী ও তালতলী) আসনে বিভিন্ন দলের পাঁচ প্রার্থী এবং বরগুনা-২ (বামনা, বেতাগী ও পাথরঘাটা) আসনে আট প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। এ দুটি আসনে বর্তমানে মোট ভোটার সংখ্যা আট লাখ ৫১ হাজার ৭৯০ জন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার চার লাখ ২৩ হাজার ১৯৬ জন, নারী ভোটার চার লাখ ২৮ হাজার ৫৭৯ জন, তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১৫ জন। তবে নতুন ৫০ হাজার ৬৩২ এবং তরুণ ভোটারদের গণভোট বিষয়ে ধারণা থাকলেও বেশিরভাগ ভোটারদের গণভোটের বিষয়ে ধারণা নেই।

সরজমিনে বরগুনার বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দেওয়ার অভিজ্ঞতা থাকলেও অনেকেই জানেন না গণভোট বিষয়ে। টিভি চ্যানেল এবং মানুষের মুখেমুখে গণভোটের কথা শুনলেও ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’ এর বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না তারা।

সদর উপজেলার বাসিন্দা রতন কর্মকার জাগো নিউজকে বলেন, ‘গণভোট আমি কখনো দেইনি। নির্বাচন এলেই প্রতি নির্বাচনেই আমরা ভোট দিতে যাই। তবে গণভোটের কথা শুনিনি। এই ভোট দিলে কী হবে তাও জানি না।’

আমতলারপাড় এলাকার গৃহকর্মী নাসিমা বেগম জাগো নিউজকে বলেন, ‘গণভোট কী জানি না। আমরা মানুষের বাসায় কাজ করে খাই। ভোট দেওয়ার সুযোগ পেলে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিয়ে আসি। এর বাইরে আর কিছু জানি না।’

হাসপাতাল এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে চা বিক্রি করছেন নুরনাহার বেগম। তার দোকানে বিভিন্ন বয়সী মানুষের নিয়মিত আনাগোনা। কাস্টমাররা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দোকানে আলোচনা করেন। তবে তাদের কেউই গণভোট বিষয়ে কোনো আলোচনা করছেন না বলে জানান তিনি।

নুরনাহার বেগমের কাছে গণভোটের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ভোট আসে ভোট দেই। শুধুমাত্র টেলিভিশন আর ফেসবুকেই গণভোটের কথা শুনি। এত মানুষ আমার দোকানে আসে কেউই গণভোটের কথা আলোচনা করে না।’

সাগরে মাছ ধরা ট্রলারের মাঝি সিদ্দিক জাগো নিউজকে বলেন, ‘সারা বছরই আমরা সাগরে থাকি। সাগরে বাঁচি সাগরেই মরি। আমরা নিখোঁজ হলে আমাদের পরিবার পথে বসে যায়। তখন কোনো সরকারই আমাদের খোঁজ নেয় না। শুনেছি এবছর নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট হবে। কিন্তু কীভাবে হবে বা এই গণভোটে আমাদের কী উপকার সেটা কেউ বলে না।’

গ্রামের মানুষের গণভোট বিষয়ে ধারণা নেই জানিয়ে সদ্য ভোটার হাওয়া পুরাকাটা এলাকার বাসিন্দা সোহাগ হাওলাদার জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা যারা নতুন ভোটার বা এই প্রজন্মের যারা তারা গণভোট বিষয়ে জানি। তবে আমাদের গ্রামের বেশিরভাগ লোকই গণভোট বিষয়ে জানেন না। সরকারের উচিত এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া।’

এ বিষয়ে বরগুনা জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আতিকুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে গণভোট বিষয়ে আমরা বিভিন্ন উপজেলা ও গ্রাম পর্যায়ে মতবিনিময় সভা করছি, প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছি। পাশাপাশি ব্যানার, ফেস্টুন, লিফলেট, টেলিভিশন, সোশ্যাল মিডিয়া, উঠান বৈঠকের মাধ্যমে প্রচার করা হচ্ছে। এরপরও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সচেতন করতে জেলার ১৪ হাজার ভিজিডি ও ভিজিএফ উপকারভোগীদের মাধ্যমেও প্রচারণা চালানো হচ্ছে। আশা করছি খুব দ্রুত সময়ের মধ্যেই বরগুনার মানুষ গণভোট সম্পর্কে জেনে যাবেন।’

বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম গণভোট হয়েছিল শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে ১৯৭৭ সালে। দ্বিতীয় গণভোট হয় রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের শাসনামলে ১৯৮৫ সালে। সবশেষ ১৯৯১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

এবার গণভোটে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থা, ৩০টি ঐকমত্যভিত্তিক সংস্কার প্রস্তাব এবং অন্যান্য সাংবিধানিক সংশোধনী—এ চারটি বিষয়ে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোট দিতে হবে।

এসআর/জেআইএম