দেশজুড়ে

‘রাজা’ মনোভাবে সন্ত্রাসীরা, নির্বাচনে শঙ্কা অবৈধ অস্ত্র

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে লক্ষ্মীপুরে সন্ত্রাসীদের শক্তির মহড়া দেওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাদের হাতে থাকা বিপুলসংখ্যক অবৈধ অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার হতে পারে। এ নিয়ে শুধু সাধারণ ভোটার নয়, বিএনপি ও জামায়াত ঘোষিত সংসদ সংসদ প্রার্থীরাও উদ্বিগ্ন রয়েছেন। তারা অবৈধ অস্ত্র ও মাদকের বিষয়ে অভিযান জোরদার করতে সভা-সমাবেশে দাবি জানাচ্ছেন।

রোববার জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় একাধিক বক্তা নির্বাচনে অবৈধ অস্ত্র ব্যবহারের আশঙ্কা ও সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারে যৌথ অভিযান পরিচালনার দাবি উপস্থাপন করেছেন। এসময় ডিসি, এসপি, সেনাবাহিনীর ক্যাম্পের মেজরসহ বিভিন্ন শ্রেণির প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক নেতাদের মদদে সন্ত্রাস হচ্ছে বলে। রাত হলেই সদর উপজেলার পূর্বাঞ্চলের (চন্দ্রগঞ্জ থানা এলাকা) বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ে। মেঘনা উপকূলীয় রামগতির চরআবদুল্লাহসহ কয়েকটি চরে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের শক্তির মহড়া দেওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

নির্বাচন ঘিরে অস্ত্রবাজির আশঙ্কার কথা জানিয়ে সম্প্রতি সরকারের শীর্ষ স্থানীয় একটি গোয়েন্দা সংস্থা লক্ষ্মীপুর থেকে সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে প্রতিবেদন পাঠিয়েছে। এতে সুষ্ঠু নির্বাচন ও খুনোখুনি রোধে সন্ত্রাসবিরোধী যৌথ অভিযান জোরদার করার তাগিদ দেওয়া হয়।

সম্প্রতি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। তিনি বলেছেন, নির্বাচনে অংশ নিতে ইচ্ছুক প্রার্থীরা চাইলে ব্যক্তিগত অস্ত্রের জন্য লাইসেন্সের অনুমোদন দেওয়া হবে।

বিগত নির্বাচনগুলোর সময় লাইসেন্সকৃত আগ্নেয়াস্ত্র জমা নিয়েছিল সরকার। অথচ এবার লাইসেন্সপ্রাপ্ত অস্ত্রগুলো জমা নেওয়া হবে না। বরং নির্বাচনে অংশ নিতে ইচ্ছুক প্রার্থীরা চাইলে ব্যক্তিগত অস্ত্রের জন্য লাইসেন্সের অনুমোদন দেওয়া হবে।

বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, লক্ষ্মীপুর জেলার বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রতিক সময়ে ছোট-বড় অন্তত ২০টি সন্ত্রাসী বাহিনী ও উপ-বাহিনী সক্রিয় রয়েছে। তাদের হাতে বিপুলসংখ্যক অত্যাধুনিক দেশি-বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। এসব অস্ত্র ব্যবহার ও প্রদর্শন করে চাঁদাবাজি, হত্যা, গুলি, ধর্ষণ, অপহরণ, ডাকাতি, দখল, মাদক ব্যবসা, মুক্তিপণ আদায়সহ নান অপরাধ চলছে। ভয়ে ভুক্তভোগীরা আইনের আশ্রয় নিতে পারছেন না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুইজন ইউপি চেয়ারম্যান জানান, বিভিন্ন সন্ত্রাসীর নামে মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ রয়েছে। তারপরও তারা অনেকটা প্রকাশ্যে মহড়া দিচ্ছে। তাদের গুলি থেকে রেহাই পাচ্ছে না শিশু, সাংবাদিক, জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতারাও।

সবশেষ ১৫ নভেম্বর রাতে সদরের পশ্চিম লতিফপুর গ্রামে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিএনপি নেতা আবুল কালাম জহিরকে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় ছাত্রদল নেতা কাউসার মানিক বাদল ওরফে ছোট কাউসারসহ ১৩ জনের নাম উল্লেখ করে হত্যা মামলা করা হয়।

অন্যদিকে লক্ষ্মীপুরের পশ্চিম চন্দ্রগঞ্জ বাজারে একটি ওয়ার্কশপের আড়ালে অস্ত্র তৈরির সন্ধান মিলেছে। গত ১ ডিসেম্বর জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) অভিযান চালিয়ে সেখান থেকে একটি পিস্তল ও অস্ত্র তৈরির বিপুল পরিমাণ সরঞ্জাম উদ্ধার করে। এ ঘটনায় ৭ ডিসেম্বর নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার আলাইয়াপুর ইউনিয়নের চন্দ্রগঞ্জ পূর্ব বাজার এলাকার একটি কবরস্থান থেকে ৫টি রাইফেল ও একটি এলজি উদ্ধার করেছে পুলিশ। ৯ ডিসেম্বর ওই ওয়ার্কশপ মালিক নুর উদ্দিন জিকুকে রাঙামাটি থেকে গ্রেফতার করা হয়।

১২ ডিসেম্বর রাতে সদর উপজেলার সন্ত্রাস কবলিত বশিকপুর ইউনিয়নের বিরাহিমপুর এলাকা থেকে ৫টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ১৬টি কার্তুজ নিয়ে হত্যা-ডাকাতিসহ ১৮ মামলার আসামি আলাউদ্দিন বরকতকে গ্রেফতার করে সেনাবাহিনী।

একই রাতে লক্ষ্মীপুর জেলা নির্বাচন কার্যালয়ের নিচতলার স্টোর রুমে পেট্রোল ঢেলে আগুন দিয়েছে এক যুবক। ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার (সিসি) ফুটেজে মাস্ক পরিহিত যুবককে দেওয়াল টপকে কার্যালয়ের ঢুকতে ও বের হতে দেখা গেছে। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত যুবককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

সন্ত্রাসীরা অপ্রতিরোধ্যদসদর উপজেলার পূর্বাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে লাগামহীনভাবে সন্ত্রাসী কার্যক্রম চলছে। অহরহ খুন-খারাবিতে মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে পড়ে। একসময় সন্ত্রাসীদের গুলির মুখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও প্রায়ই পিছু হঠতে হয়। অনেক পুলিশও গুলিবিদ্ধসহ আহত হয়েছিল। একপর্যায়ে ২০১৪ সালের ২ জুন চন্দ্রগঞ্জ পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রকে থানা ঘোষণা করা হয়। তখন পূর্বাঞ্চলের সন্ত্রাসকবলিত চন্দ্রগঞ্জ, চরশাহী, দিঘলী, হাজীরপাড়া, দত্তপাড়া, বশিকপুর, উত্তর জয়পুর, মান্দারী, কুশাখালী ইউনিয়ন নিয়ে চন্দ্রগঞ্জ থানার কার্যক্রম শুরু হয়। তৎকালীন জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) শাহ মিজান শাফিউর রহমান বাজারের ব্যবসায়ীসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে থানা বাস্তবায়ন কমিটি করেন। সন্ত্রাস রুখতে তারা প্রায় ৪০ লাখ টাকা চাঁদা তুলে নিজেরাই চন্দ্রগঞ্জ থানা ভবন নির্মাণ করেন। যদিও পরে অন্যস্থানে থানা ভবন হয়েছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট অনেকেই সন্ত্রাসীদের হাত থেকে রক্ষা পেতে পরিবার-পরিজন নিয়ে এলাকা ছেড়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীতে আত্মগোপনে গেছেন। কোনো বাহিনী প্রধান মারা গেলে মানুষের দুশ্চিন্তা বাড়ে। আগে এলাকাভেদে ২-১ জন অত্যাচার করলেও প্রধানরা মারা গেলে তখন সন্ত্রাসীরা বিভক্ত হয়ে পড়ে। উপ-বাহিনী তৈরি হয়, অস্ত্রগুলো ভাগবাটোয়ারায় হাতবদল হয়। সন্ত্রাসীরা ‘সবাই রাজা’ মনোভাবের কারণে তখন কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। বিদেশে থাকা সন্ত্রাসী বাহিনীর অনেকেই অর্থায়নসহ কলকাঠি নাড়েন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেলা পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, লক্ষ্মীপুরে দুই বছরে অর্ধশতাধিক আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়। এরমধ্যে বিদেশি পিস্তল, এলজি, রিভলবার, পাইপগান ও একনলা বন্দুক রয়েছে। এসময় শতাধিক তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করা হয়। অভিযানে র‌্যাব ও সেনাবাহিনীও অংশ নেয়।

অস্ত্রধারীদের কদর নির্বাচন ঘনিয়ে এলেই বিভিন্ন প্রার্থীদের কাছে সন্ত্রাসীদের কদর বেড়ে যায়। পছন্দের প্রার্থীকে জয়ী করতে ভাড়াটে হিসেবে নির্বাচনে সন্ত্রাসীরা চোখ রাঙায়। তখন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে অপহরণ, কেন্দ্র দখল, গোলাগুলি, অস্ত্র ও শক্তির মহড়ায় বহিরাগতদের আনাগোনাও বাড়ে কয়েকগুণ। পাশের জেলা ও উপজেলাতে বাহিনীগুলো ক্যাডার-অস্ত্র সরবরাহ করে। প্রায় প্রত্যেক নির্বাচনের দিন বা তার আগের রাতে জেলার কোথাও না কোথায় লাশ ফেলার ঘটনা রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ঢাকা মহানগর (উত্তর) জামায়াতের সেক্রেটারি ও লক্ষ্মীপুর-৩ (সদর) আসনের দলীয় প্রার্থী রেজাউল করিম বলেন, অবৈধ অস্ত্রের কাছে কেউ নিরাপদ নয়, নির্বাচনের আগেই সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করতে হবে। সন্ত্রাসীদের কোনো দল নেই।

বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব ও লক্ষ্মীপুর-৩ (সদর) আসনে দলের এমপি প্রার্থী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি বলেন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করতে আমরা বারবার প্রশাসনকে জানাচ্ছি। নির্বাচন বানচালে একটি চক্র সন্ত্রাসী তৎপরতা চালানোর চেষ্টা করছে। আমরা নেতাকর্মীদের নিয়ে সজাগ আছি।

লক্ষ্মীপুর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. রেজাউল হক বলেন, সন্ত্রাস কবলিত চন্দ্রগঞ্জ থানা এলাকাতে ডিবি পুলিশসহ আমাদের একাধিক দল কাজ করছে। ইতোমধ্যে অভিযান চালিয়ে বেশ কিছু অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ও কয়েকজন চিহ্নিত সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করা হয়। সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে যে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে আমরা সার্বক্ষণিক কাজ করছি।

সুষ্ঠু নির্বাচন মূল লক্ষ্য জানিয়ে লক্ষ্মীপুর জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আবু তারেক বলেন, প্রত্যেক ভোটকেন্দ্রের জন্য ক্যামেরা এসেছে। নির্বাচনের দিন প্রত্যেক থানা থেকে লাইভ দেখা যাবে।

তিনি আরও বলেন, লক্ষ্মীপুরে ৪৯৬টি ভোট কেন্দ্র রয়েছে। প্রতিকেন্দ্রে দুইজন করে পুলিশ সদস্য দিলে আমাদের এক হাজার জন হয়ে যায়। কিন্তু আমাদের ১০৫০ জন পুলিশ সদস্য রয়েছেন। আরও ৫০০ জন পুলিশ সদস্য প্রয়োজন। এরমধ্যে ২১৫টি কেন্দ্রকে অতিগুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে বাড়তি নিরাপত্তা দেওয়া হবে। নির্বাচনে সেনাবাহিনী, বিজিবি ও র‍্যাবও নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করবেন। অপরাধ করলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

এমএন/এমএস