সাহিত্য

শার্ল বোদলেয়ার: এক প্রতীকবাদী মহাকবি

হাসান জাহিদ

আমি কবিতা নির্মাণকারী নই। নির্মাণ কৌশলও তেমন জানা নেই। তবে একটা সময় ফরাসি কবি শার্ল বোদলেয়ারের কবিতা আমাকে তীব্রভাবে আকর্ষণ করেছিল। তার অন্যতম বিখ্যাত ‘ক্লেদাক্ত কুসুম (লা ফ্লর দ্যু মাল)’ কবিতার বইটি একসময় আমার হাতে আসে আমার সিনিয়র খালাতো ভাই সাহিত্য-সংগীত প্রিয় মানুষ মুরশেদ নূর শাহরিয়ারের মাধ্যমে। বইটি পড়ে তাকে আমি ফেরত দিয়েছিলাম আবার। পরে আমি নিজেই কিনেছিলাম বইটি। বইটির সরস অনুবাদ করেছেন বুদ্ধদেব বসু। টরন্টো ও ঢাকায় কোনো এক স্থানে বইটি নিখোঁজ হয়ে যায়। ২০১৮ সালে বইটি আমি আবার সংগ্রহ করি। এখন সেটা ঢাকাতেই আমার সংগ্রহশালায় আছে।

শার্ল বোদলেয়ার (১৮২১-১৮৬২) ছিলেন ফ্রান্সের প্রথম বিশ্বকবি। মাত্র ৪৬ বছর বয়সে তার জীবনাবসান হয়। এই স্বল্পসময়েই তিনি কবিতার আঙ্গিকে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনেন। তিনি ছিলেন ফরাসি সাহিত্যের অন্যতম অনুবাদক, সমালোচক ও কবি। তার কাব্যগ্রন্থ ‘দ্য ফ্লাওয়ার অব ইভিল’ বিশ্ব সাহিত্যে আজও আদৃত ও পঠিত। তাঁকে আধুনিক কবিতার জনকও বলা হয়। প্রচলিত কবিতার কাঠামো ভেঙে তিনি নির্মাণ করেন ভিন্ন আঙ্গিকের কবিতা, যা বদলে দিয়েছিল কবিতার প্রথাগত প্রচলিত ধারাকে। তোলপাড় তোলেন বিশ্বসাহিত্যে। তাঁর কলকাতায় আগমনের সুবাদে তিনি বাংলা কবি ও কবিতার ওপর প্রভাব বিস্তার করেন।

তিনি যখন লিখছিলেন; তখন দুটি মহাযুদ্ধ হয়ে গেছে আর ইউরোপজুড়ে চলছিল প্লেগ, হারিয়ে গিয়েছিল রেনেসাঁ যুগের নৈতিকতা। তিনি অনুভব করলেন কবিতায় আঙ্গিকগত পরিবর্তনের। তাই তিনি জন্ম দিলেন এক আধুনিক নির্মাণশৈলীর। শাণিত করলেন প্রতীকবাদ। তিনি মনে করতেন মানুষের চরিত্র যুগপৎ ঈশ্বর ও শয়তানের সমন্বয়।

ফরাসি সাহিত্যাঙ্গনে বোদলেয়ার একটি উজ্জ্বল নাম। ফ্রান্সের সমাজে উনিশ শতকের শুরুর দিকে যেরকম কবিতা লেখা হতো শার্ল বোদলেয়ার সেগুলো থেকেই কবিতা লেখার অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন। একজন মানুষের মধ্যে আসা রোমান্টিকতাকে কীভাবে আরও ব্যাপ্তিময় এবং সৌন্দর্যমণ্ডিত করা যায় সেটা শার্ল ভাবতেন। তাঁর কবিতায় শৈল্পিকতা পাওয়া যায়। তিনি প্যারিস নগরীকে তাঁর কবিতায় অনেকবার স্থান দিয়েছেন। ফরাসি কবিতা পাঠকেরা তার কবিতা পড়ে এক অন্য জগতে চলে যেতেন।

ফ্রান্সে তাঁর সমাধিস্থলে আজও ভিড় করে অজস্র কবি, কাব্যপ্রেমিক ও ভ্রমণপিপাসুরা। এখানে বোদলেয়ারের দুটি কবিতা (বুদ্ধদেব বসু অনূদিত) তুলে ধরলাম:আশ্চর্য মেঘদলবলো আমাকে, রহস্যময় মানুষ, কাকে তুমি সবচেয়ে বেশী ভালবাস:তোমার পিতা, মাতা, ভ্রাতা অথবা ভগ্নীকে?তোমার পিতা, মাতা, ভ্রাতা, ভগ্নী–কিছুই নেই আমার।তোমার বন্ধুরা?ঐ শব্দের অর্থ আমি কখনো জানিনি।তোমার দেশ?জানিনা কোন দ্রাঘিমায় তার অবস্থান।সৌন্দর্য?পারতাম বটে তাকে ভালবাসতে–দেবী তিনি, অমরা।কাঞ্চন?ঘৃণা করি কাঞ্চন, যেমন তোমরা ঘৃণা করো ভগবানকে।বলো তবে, অদ্ভুত অচেনা মানুষ, কি ভালবাসো তুমি?আমি ভালবাসি মেঘ... চলিঞ্চু মেঘ... ঐ উঁচুতে... ঐ উঁচুতে...আমি ভালবাসি আশ্চর্য মেঘদল!****প্যাঁচারাজ্ঞানীর চোখ, তা দেখে যায় খুলেহাতের কাছে যা আছে নেয় তুলেথামায় গতি, অবুঝ আন্দোলন;শান্তি তার এ তো চিরন্তন–কেবল চায় বদল, বাসা বদল!

আধুনিক কবিতার অন্যতম বড় নাম বোদলেয়ারে জন্ম ফরাসি বিপ্লবের শেষবেলা হলেও তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ছিল ফরাসি বিপ্লবের মতোই উত্থান-পতনে অস্থির। বাবার দ্বিতীয় স্ত্রীর সন্তান তিনি। ৬ বছর বয়সে বাবা মৃত্যুবরণ করলে মা দ্বিতীয় বিয়ে করেন। বোদলেয়ার তা কখনোই মেতে নিতে পারেননি। তরুণ বয়সেই আক্রান্ত হন বিষাদে। বোদলেয়ারের বেশিরভাগ কবিতায় তাই বিষাদ প্রাধান্য পায়। বস্তুত, তাঁর জীবনটা ছিল ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ। ফরাসি বিপ্লবে তিনি অংশ নিয়েছিলেন। ভগ্ন পরিবার, বিপ্লব আর তাঁর সৃষ্টির তাগিদ তাঁকে বেসামাল করে তোলে। মূলত কষ্ট, বিষাদ ও হতাশাই তাঁকে সরস কবিতা নির্মাণে প্রেরণা জোগায়। যত বেশি দুঃখ-হতাশা, ততই সৃষ্টি হয় বাঙময় দ্যোতনা।

আরও পড়ুনহাসান আজিজুল হকের ছোটগল্প: জীবনের নির্মোহ উচ্চারণ আমিনুল ইসলাম: স্নিগ্ধতার কবি 

নাগরিকজীবনের সহস্র জটিলতাই ছিল বোদলেয়ারের কবিতার প্রধান বিষয়। যা কিছু কবিতা নয় তা থেকে কবিতাকে মুক্তি দেওয়াই ছিল তাঁর কাজ। তাই তিনি তাঁর কবিতাকে বাহুল্য বর্জন করে কবিতাসর্বস্ব করে তোলেন। আধুনিকতার পুরোধা কবি হিসেবে তিনি আজও সারাবিশ্বে সমাদৃত। বাঙালি কবিদেরও তিনি প্রভাবিত করেছেন, তা আগেই বিধৃত করেছি। দুই বাংলার এমন কোনো কবি-সাহিত্যিক নেই, যিনি বোদলেয়ার পড়েননি।

আধুনিকতার গতিপথকে ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন বোদলেয়ার। তাঁর কবিতার প্রতিটি পঙ্‌ক্তি ও শব্দ, মিল ও অনুপ্রাস অমোঘ ও তীক্ষ্ণ। তাঁর মহৎ কীর্তি হলো, তিনি ক্ল্যাসিক ও রোমান্টিকের চিরাচরিত দ্বৈতকে লুপ্ত করে দিয়েছিলেন। আবেগের নিবিড়তম মুহূর্তেও উচ্ছ্বাসের কাছে ধরা দেননি। কবির ওপর সব সময় কবিতাকে স্থাপন করেছিলেন। তাঁর কাব্যে কোনো হেঁয়ালি নেই। তাঁর প্রতিটি কবিতা স্বপ্রতিষ্ঠ ও স্বতোদ্ভাসিত। বোদলেয়ারের সমগ্র কাব্যে যে-বাণী নিরন্তর ধ্বনিত হয়েছে, তা হলো ‘সকলে জানবে না, জানতে পারবে না বা চাইবে না; কিন্তু কবিরা জানুন।’ কবিরাই ঈশ্বর।

আত্মভোলা, সৎ ও শিল্পীমনের অধিকারী বাবা ফ্রাঁসোয়ার পেশা ছিল শিক্ষকতা। একমাত্র ছেলে বোদলেয়ারকে ভীষণ ভালোবাসতেন তিনি। বোদলেয়ারও বাবার ভক্ত ছিলেন। বাবার পাণ্ডিত্য ও চিত্রকলার ওপর যে নেশা, তারই প্রভাব পড়েছিল শিশু বোদলেয়ারের ওপর। ছবি দেখা ও চেনার সুরটা তিনি বাবা ফ্রাঁসোয়ার কাছ থেকেই পেয়েছিলেন। শিশু বোদলেয়ারের যখন ছয় বছর বয়স, বাবার কাছ থেকে লাতিন অক্ষর শিখছেন মাত্র, ঠিক তখনই ১৮২৭ সালে বাবা জোসেফ ফ্রাঁসোয়া বোদলেয়ারের মৃত্যু হয়। আর এই সময়টিতেই ফ্রান্সে রোমান্টিকতার চরম উত্থান ঘটে। ১৮২৯ সালে শিশু বোদলেয়ারের বিধবা মা ক্যারোলিন দ্যুফে পুনর্বিবাহ করেন ক্যাপ্টেন (যিনি পরে জেনারেল হয়েছিলেন) ওপিককে। মাতা ও বিপিতার সমূহ ভালোবাসা, মনোযোগ পাওয়া সত্ত্বেও বালক বোদলেয়ার কিশোর বয়স থেকেই বিষাদাক্রান্ত হন এবং জীবনভর সে-বিষাদেই ডুবে থাকেন।

২১ বছর বয়সে বোদলেয়ার উত্তরাধিকার সূত্রে অনেক সম্পত্তি লাভ করলেও কয়েক বছরের মধ্যেই সেসব নিঃশেষ করে ফেলেন তিনি। ভোগ-বিলাসে মত্ত তাঁর এ সময়কার কবিতায় ঘৃণা, অমরত্ব এবং প্রহসনের রূপ ফুটে উঠেছে। ১৮৫০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে স্বাস্থ্যের দুর্বলতা, আর্থিক দুরবস্থা এবং অনিয়মিত সাহিত্য সৃষ্টির মানসিক যন্ত্রণার সঙ্গে লড়তে হয় তাঁকে। তাঁর ওপরে ঋণের বোঝাও চেপেছিল।

শেষে তিনি অর্থ সংস্থানের জন্য এডগার অ্যালান পোর সাহিত্যের অনুবাদ করতে শুরু করেন। তাঁর বিখ্যাত কবিতার বই ‘লা ফ্লর দ্যু মাল’ কিংবা ‘দ্য ফ্লাওয়ারস অব ইভিল’র কবিতাগুলো তিনি এই সময়েই লিখেছিলেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই উন্নাসিক ও প্রথাবিরোধী কবি হিসেবে পরিচিত হন তিনি।

অনিয়ন্ত্রিত জীবনযপান, পতিতালয়ে গমনের ফলে তাঁর সিফিলিস ও গনোরিয়া রোগ হয়েছিল। তিনি মাত্র ৪৬ বছর বেঁচে ছিলেন। আর এই স্বল্পসময়েই তিনি ফরাসি বিপ্লবের মতো কবিতাতেও বিপ্লব ঘটিয়ে যান। জীবৎকালে তাঁর অধিকাংশ লেখাই প্রকাশকেরা প্রকাশ করতে চাননি। তাঁর মৃত্যুর পরে বোদলেয়ারের সব লেখাপত্র ৭০ পাউন্ড নিলাম হয়ে যায় এবং মৃত্যুর পরেই তাঁর সব লেখা প্রকাশিত হতে থাকে।

১৮৬৭ সালের ৩১ আগস্ট তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর স্বল্পায়ু জীবনে তিনি যা রচনা করে গেছেন, তা নিয়ে অনাগত শতকেও গবেষণা, থিসিসি বা পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের প্রতিযোগিতা চলতে পারে। জগদ্বিখ্যাত অনেক লেখক-কবিদের মধ্যে কোনো না কোনোভাবে ট্র্যাজিক ফ্ল কাজ করে। বিষাদগ্রস্ত হয়ে আর্নেস্ট হেমিংওয়ে আত্মহত্যা করেন। ভার্জিনিয়া উল্‌ফও আত্মহনন বেছে নেন। মাইকেল মধুসূদন দত্ত প্রায় অনাহারে মৃত্যুবরণ করেন।

বোদলেয়ার আরও দীর্ঘায়ু হলে হয়তো সারাবিশ্বের পাঠকের হাতে চন্দ্র-সূর্য-নক্ষত্র তুলে দিতেন।

এসইউ