দেশজুড়ে

‘বাপু, গণভোট আবার কী? আজই প্রথম শুনলাম’

‘বাপু, গণভোট আবার কী? আজই প্রথম শুনলাম। আমরা পড়াশোনা ছাড়া মানুষ। গত তিন চার মৌসুমে তো এমপিদের ভোটই লাগেনি। এহন গণভোট কী, কেউ বুঝিয়ে দিলে হয়তো বুঝতে পারবো।’ এভাবেই নিজের বিভ্রান্তির কথা জানালেন শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার নয়াবিল ইউনিয়নের চাটকিয়া গ্রামের বাসিন্দা সোহরাব উদ্দিন।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন নিয়ে মানুষের মধ্যে নানা ধরনের ধারণা কাজ করছে। জাতীয় নির্বাচনে ভোটের বিষয়ে ধারণা থাকলেও শেরপুরের বেশিরভাগ ভোটার গণভোটের বিষয়ে তেমন কিছু জানেন না। গণভোট কেন, কীভাবে গণভোট দিতে হবে—তা নিয়েও অনেকে প্রশ্ন রেখেছেন জাগো নিউজের সঙ্গে আলাপে।

গত চারদিন সদর, শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী, নকলা ও নালিতাবাড়ী উপজেলার বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে দেখা যায়, গ্রামাঞ্চলে গণভোটের কোনো প্রচার-প্রচারণা নেই। শহরের মানুষ গণভোট সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পেলেও গ্রাম পর্যায়ে বিষয়টি প্রায় অজানা রয়ে গেছে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, জেলার ৫২টি ইউনিয়নেই সরকারি ও বেসরকারিভাবে যদি গণভোটের বিষয়ে প্রচার চালানো হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ বিষয়টি দ্রুত বুঝতে পারবে।

প্রান্তিক পর্যায়ের ভোটারদের সঙ্গে গণভোট নিয়ে কথা বলেছে জাগো নিউজ। তারা জানান, সাধারণ ভোটের বিষয়ে তারা যথেষ্ট জানেন এবং বোঝেন। কিন্তু গণভোট কী, এ বিষয়ে তাদের কোনো ধারণা নেই।

আরও পড়ুন: বরগুনার বেশিরভাগ মানুষই জানে না গণভোট কী

শ্রীবরদী উপজেলার রাণীশিমুল ইউনিয়নের বালিজুড়ির খ্রিস্টান পাড়ার ইরিনা চিসিম বলেন, ‘এরশাদের আমলে একবার গণভোট অইছিল (হয়েছিল)। এহন (এখন) আবার গণভোটের কথা হুনতেছি (শুনি)। এবছর নাকি দুইডে (দুইটা) ভোট দিতে অইবো (হবে)। একটা সংসদ নির্বাচনের ভোট, আরেডা (আরেকটা) গণভোট। এহন কতা অইলো যে গণভোটটা কেন দেবো, দিলে কী অইবো আর না দিলে কী অইবো (হবে) সেটাই তো বুঝি না।’

বারোমারি মিশন গেট মোড়ে কথা হয় গারো সম্প্রদায়ের অন্তত ১৫ জনের সঙ্গে। তাদের ভাষ্য, ‘গণভোট হবে শুনেছি কিন্তু বিষয়টা কী, বুঝি না। সবাই এমপি ভোটের কথাই বলছে। গ্রামে গণভোট নিয়ে কেউ কিছু জানে না। আর এমপি ভোটের ব্যাপারেও কেবল একজন প্রার্থী এসেছিলেন।’

পোড়াগাও ইউনিয়নের পলাশিকুড়া গ্রামের কৃষক হুরমুজ আলী বলেন, ‘বাপুরে, মেম্বার-চেয়ারম্যান আর এমপি নির্বাচনের ভোট বুঝি। কিন্তু গণভোট তো বুঝি না। গ্রামে এখনো কোনো প্রচার দেখিনি। কেউ বিষয়টা বুঝালে বুঝতাম।’

শেরপুর আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নূর মোহাম্মদ দুলাল জাগো নিউজকে বলেন, ‘স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম গণভোট হয়েছিল শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে ১৯৭৭ সালে। দ্বিতীয় গণভোট হয় রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদের শাসনামলে ১৯৮৫ সালে। সবশেষ ১৯৯১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তবে এবারের গণভোট কিসের ভিত্তিতে হবে, তা জেলার ৫২টি ইউনিয়নে ব্যাপক প্রচারণার মাধ্যমে জনসাধারণের মাঝে তুলে ধরতে হবে।’

সম্মিলিত নাগরিক উদ্যোগের যুগ্ম আহ্বায়ক রেজাউল করিম জাগো নিউজকে বলেন, ‘দেশের চাবি আপনার হাতে’ স্লোগানে সাংবিধানিক গণভোটকে সামনে রেখে অন্তর্বর্তী সরকার ডিজিটাল বিলবোর্ড ও প্রচার-গাড়ির মাধ্যমে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তবে এই কার্যক্রম মূলত শহরকেন্দ্রিক। উপজেলা কিংবা গ্রামাঞ্চলে ভোটের গাড়ি বা মাইকিং কার্যত দেখা যায়নি। বিদ্যালয়, হাট-বাজারে ভ্রাম্যমাণ প্রচার-প্রচারণায় গণভোট বিষয়টি তুলে ধরতে হবে।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখ্য সমন্বয়ক মোর্শেদ জিতু জাগো নিউজকে বলেন, ‘গণভোটের বিষয়টি গ্রামাঞ্চলের মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে আমরা প্রচার-প্রচারণার কাজ করছি। এতে সবার আন্তরিকতা চাই।’

এ বিষয়ে জেলা তথ্য কর্মকর্তার কার্যালয়ে গেলে তাকে পাওয়া যায়নি। কার্যালয়ে থাকা লোকজন বলেন, ‘স্যার ডাক্তারের কাছে গেছেন’।

শেরপুর জেলা প্রশাসক তরফদার মাহমুদুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‌‘গণভোটের বিষয়টি গ্রামাঞ্চলের মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে আমরা প্রচার-প্রচারণার কাজ করছি। প্রতিদিনই প্রচারণা চলছে।’

এসআর/জেআইএম