এক সময়ের ব্রহ্মপুত্র নদে খরস্রোত বহমান ছিল। সেই নদই আজ যেন মৃত। গাইবান্ধা সদর ও ফুলছড়ি উপজেলার বিভিন্ন স্থানে নদীর বুকে পলি জমে জেগে উঠেছে ডুবোচর ও বিস্তীর্ণ বালুচর। নদে পানি না থাকায় থমকে গেছে নৌযান চলাচল। ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের মাইলের পর মাইল পথ পায়ে হেঁটে কিংবা ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে।
কৃষিনির্ভর উত্তরের জনপদ গাইবান্ধার ব্রহ্মপুত্র নদ পানিশূন্য বালুচরগুলো এখন মরুভূমির মতো ধুধু প্রান্তর। চরাঞ্চলের মানুষকে দীর্ঘ সময় ধরে পথ পাড়ি দিয়ে যেতে হচ্ছে এক চর থেকে আরেক চরে। আবার কোথাও কোথাও আট থেকে ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত হেঁটে পার হতে হচ্ছে নদীর বুক। এক সময় যেখানে ঢেউয়ের গর্জনে কেঁপে উঠত তীর, সেখানে এখন শুধু বালু আর বালু।
বছরের প্রায় অর্ধেক সময় ব্রহ্মপুত্র নদ শুকনো থাকে। এতে যোগাযোগ ব্যবস্থায় ভয়াবহ বিপর্যয়ে চরাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। নৌপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরাঞ্চলে উৎপাদিত ধান, ভুট্টা, সবজি ও পাট জেলার চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও তা অচল হয়ে পড়েছে। এতে কৃষকরা পড়েছেন বিপাকে।
জানা গেছে, গাইবান্ধায় ১৬৫টি চর-দ্বীপচর রয়েছে। এসব চরে প্রায় চার লাখের বেশি মানুষের বসবাস। তাদের একমাত্র আয়ের উৎস কৃষি। এছাড়াও বালাশী-বাহাদুরাবাদ ঘাট দিয়ে উত্তরের অন্তত ১০ জেলার মানুষ যাতায়াত করে। বর্তমান পরিস্থিতি তাদের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে।
চরাঞ্চলের স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি। প্রতিদিন চরের আট হাজারের বেশি শিক্ষার্থীকে খোলা বালুচর পাড়ি দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে হচ্ছে। ঘন কুয়াশা, প্রচণ্ড শীত, রোদ কিংবা বর্ষায় এই যাত্রা হয়ে উঠছে ঝুঁকিপূর্ণ। চরাঞ্চলে কোনো স্বাস্থ্য কেন্দ্র বা হাসপাতাল না থাকায় অসুস্থ রোগী, নারী ও শিশুদের জন্য পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নাব্য সংকটের কারণে নদের বিভিন্ন স্থানে ডুবোচর জেগে ওঠায় নৌকা চলাচল ব্যাহত হচ্ছে, ফলে অতিরিক্ত সময় ও খরচ ব্যয় করতে হচ্ছে।
ফুলছড়ি চরের কৃষক নবিজল ইসলাম বলেন, আগে নৌকায় আধা ঘণ্টায় পার হতাম। এখন বছরের অর্ধেক সময় হেঁটে যাওয়া-আসা করতে হয়। বাচ্চা আর অসুস্থ মানুষ নিয়ে চলাচল করা খুবই কষ্টের।
আরেক কৃষক আমজাদ হোসেন বলেন, চরাঞ্চলের মানুষদের কষ্টের শেষ নাই। বর্ষা মৌসুমে চারদিকে পানি আর পানি। শুকনো মৌসুমে বালু আর বালু। ফসলের ভরা মৌসুমে এখানে যাতায়াতের অবস্থা একেবারেই খারাপ। এজন্য আমরা কষ্ট করেও ফসলের সঠিক দাম পাই না।
চরের মুদি দোকানি ফয়জুল হক ও আহম্মদ আলী বলেন, ‘এহানে কোনো যানবহন নাই, অটো নাই, ভ্যান নাই, যাওয়ার অনেক কষ্ট। বর্ষার সময় পানির কষ্ট, শুকনোর সময় যাতায়াতের কষ্ট। হামার কপালটাই এমন!’
চর কাবিলপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সায়েম মিয়া বলেন, এখন শুকনো মৌসুম, নদে পানিও নাই নৌকাও নাই। তাই পায়ে হেঁটেই স্কুলে যেতে হয়। এতে কষ্টও হয়।
গাবগাছি চরের রাজু শেখ বলেন, নাব্য সংকট নিরসনে দ্রুত খনন দরকার। শুধু নামমাত্র কাজ করলে হবে না। নদী বাঁচলে চরবাসী বাঁচবে।
এ বিষয়ে গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম বলেন, উজানে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়া, নদীভাঙন এবং বর্ষাকালে পলিমাটি জমে যাওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে ব্রহ্মপুত্র নদে নাব্য সংকট দেখা দিচ্ছে। নদে ড্রেজিং করে নৌপথ সচল রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে নদীর বিশাল এলাকাজুড়ে এই সংকট নিরসন বেশ চ্যালেঞ্জিং বলে মনে করেন তিনি।
আনোয়ার আল শামীম/এফএ/জেআইএম