খেলাধুলা

সিদ্ধান্তহীনতা আর সংকট: বিশ্বকাপ থেকে কি ছিটকে যাচ্ছে বাংলাদেশ?

মাঠ ও মাঠের বাইরের ঘটনায় ঠাসা বিপিএলের ঢাকার শেষ পর্ব। তবে মাঠের চেয়ে মাঠের বাইরের ঘটনা, রটনাই বেশি সাড়া ফেলেছে। সিলেট পর্ব শেষে ঢাকা পর্ব শুরুর আগেই জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ও শীর্ষ তারকা তামিম ইকবালকে ফেসবুক পোস্টে অপমানসূচক কথা বলে হঠাৎ সাজানো বাগানকে তছনছ করেন বোর্ড পরিচালক নাজমুল ইসলাম।

বোর্ডের ভেতরে, বাইরে এবং গোটা দেশে নিন্দার ঝড় বয়ে যায়। প্রতিবাদে ক্রিকেটাররা তার পদত্যাগের দাবিতে একদিন খেলা থেকেও বিরত থাকেন। পরে নাজমুল ইসলামকে শোকজ করে এবং তিনি যে স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান, সেই অর্থ কমিটির চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরিয়ে ক্রিকেটারদের ঠান্ডা করার চেষ্টা করে বিসিবি।

দেরিতে হলেও ১৫ জানুয়ারি রাতে ক্রিকেটারদের সঙ্গে বোর্ড সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলসহ শীর্ষ কর্তারা বসে উত্তেজনা কমান। নাজমুল ইসলামকে পরিচালক পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার আলটিমেটাম দিয়েই মাঠে ফেরেন ক্রিকেটাররা। এরপর আজ নিয়ে তৃতীয় দিন হলো বিপিএলের খেলা চলছে।

এরই মধ্যে গরম খবর— ঢাকায় আসবেন আইসিসির কর্তা। সেখানেও বিপত্তি। প্রথমে ভিসা পাননি আইসিসির ইভেন্টস অ্যান্ড কর্পোরেট কমিউনিকেশন্স জেনারেল ম্যানেজার, ভারতীয় বংশোদ্ভূত গৌরব সাক্সেনা। পরে তিনি অনলাইনে মিটিংয়ে যোগ দেন। সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল, দুই সহ-সভাপতি ফারুক আহমেদ ও শাহাদাত হোসেন, সিনিয়র পরিচালক নাজমুল আবেদিন ফাহিম ও সিইও নিজামউদ্দীন চৌধুরী সুজনের গড়া বিসিবি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে আইসিসির বৈঠকে স্বশরীরে উপস্থিত ছিলেন আইসিসির আরেক কর্তা, ইন্টিগ্রিটি ইউনিটের জেনারেল ম্যানেজার অ্যান্ড্রু এফগ্রেভ।

কী হলো সেই মিটিংয়ে? মিটিং শেষে না আইসিসি কর্তা, না বিসিবির কেউ মুখ খুলেছেন! বোর্ড থেকে একটি প্রেস রিলিজ দিয়ে মিটিংয়ে কি ধরনের আলাপ হয়েছে, কেমন প্রস্তাব এসেছে, তা নিয়ে কী রকম আলোচনা-পর্যালোচনা হয়েছে—তা জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। খালি চোখে সবাই জেনেছেন, বুঝেছেন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ঠিক আগের জায়গায়ই আছে। মানে বাংলাদেশ ভারতে যাবে না। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেললে শ্রীলঙ্কার মাটিতেই খেলবে। পাশাপাশি বাংলাদেশি ভক্ত, গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার বিষয়ে উদ্বেগ এবং শঙ্কার কথাও নতুন করে জানানো হয়।

বিসিবি বাংলাদেশের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে। আইসিসি কর্তারা কী বলেছেন?

বিসিবি প্রেস রিলিজে কিছু মৌলিক বিষয়ের উল্লেখ আছে। বিকল্প দেশ ও ভেন্যু সংক্রান্ত বিষয়েও অনেক কথা উঠে এসেছে। বোর্ড থেকে জানানো হয়েছে, ভারতে না খেলে শ্রীলঙ্কার মাটিতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলার জন্য প্রয়োজনে গ্রুপ পরিবর্তন করে শ্রীলঙ্কায় যে যে গ্রুপের খেলা, সেখানে আয়োজনের কথাবার্তাও আলোচনা হয়েছে।

আইসিসি কর্তারা কী বলেছেন? তাদের কথাবার্তা কেমন ছিল? বিসিবির প্রেস রিলিজে একটা প্রচ্ছন্ন ধারণা দেওয়া হয়েছে। সবাই জেনেছেন, ‘আইসিসির দুই কর্তা অ্যান্ড্রু এফগ্রেভ ও গৌরব সাক্সেনাও ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বাংলাদেশকে ভারতেই বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়ার কথা বলেছেন এবং ভারতে খেলতে যাওয়ার পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন।’

কিন্তু সেটাই কি শেষ? তার বাইরে কি কিছু হয়নি? গৌরব সাক্সেনা আর অ্যান্ড্রু এফগ্রেভের আচরণ, কথাবার্তা, শারীরিক অভিব্যক্তি কেমন ছিল? তাদের কথাবার্তার সারমর্মই বা কী ছিল? তারা কি এমন কোনো কথা বলেছেন বা তাদের আচরণ ও কথাবার্তায় কি এমন কোনো আভাস ছিল, যার মাঝে ঈষৎ আশার আলো দেখা যায়?

শনিবার বিসিবি প্রতিনিধি দলের একজন সদস্যও তা খোলাসা করেননি। বিসিবির প্রেস রিলিজেও কিন্তু সরাসরি তেমন কোনো আভাস ছিল না।

কালকের আলোচনার পর সত্যিই কি বাংলাদেশের আর কোনো আশা আছে? মানে শ্রীলঙ্কায় গিয়ে বিশ্বকাপ টি-টোয়েন্টি খেলার সম্ভাবনা কি আছে? তা কিন্তু খানিকটা ধোঁয়াশাই থেকে গেছে।

অনেকেই ধরে নিয়েছেন যে, আইসিসি কর্মকর্তারা যখন বাংলাদেশের ক্রিকেট কর্তাদের কাছে নেতিবাচক কথা বলে যাননি, মানে সরাসরি না-বোধক কথা ওঠেনি—তাহলে তো আশা করাই যায়। গতকাল শনিবারের ওই সভায় যোগ দেওয়া বিসিবির একজন শীর্ষ কর্তাও এ বিষয়ে মুখ খোলেননি।

জাগো নিউজের পক্ষ থেকে বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল, সহ-সভাপতি ফারুক আহমেদ ও পরিচালক নাজমুল আবেদিন ফাহিমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল; কিন্তু তারা কেউই এ বিষয়ে কোনো কথা বলেননি। আভাস-ইঙ্গিতও দেননি।

তবে বোর্ডের খুব কাছের একটি সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশের শ্রীলঙ্কা গিয়ে খেলার সম্ভাবনাও প্রায় শূন্য। আলোচনা ভেস্তে না গেলেও বিষয়টা এমন এক পর্যায়ে থেমে গেছে, যেখান থেকে আশার আলো আসলে কম।

সবার মুখ বন্ধ থাকলেও বোর্ডের অভ্যন্তরে প্রাণচাঞ্চল্য কমে গেছে। কর্মকর্তারা মুখে স্বীকার না করলেও মনে মনে ধরেই নিয়েছেন— এবার আর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলা হচ্ছে না।

খুব নির্ভরযোগ্য সূত্রের খবর, বিসিবি তাকিয়ে আছে আইসিসি প্রেসিডেন্ট জয় শাহ’র দিকে। তিনি নিজে যদি পুরো প্রক্রিয়া পাল্টে বাংলাদেশকে শ্রীলঙ্কার মাটিতে খেলার সুযোগ করে দেওয়ার উদ্যোগ নেন, তাহলে হতে পারে। কারণ এটা পরিষ্কার— এখন বাংলাদেশ যে গ্রুপে (সি) আছে, সেই গ্রুপ পাল্টে ‘ডি’ গ্রুপে খেলা আয়োজন করতে হলে দুই গ্রুপের আট দেশের ক্রিকেট বোর্ডের সম্মতি লাগবে।

তাদের সঙ্গে কথা বলে দাবার ‘ক্যাস্টলিং’-এর মতো গ্রুপ ও দেশ পাল্টে খেলা আয়োজন করে বাংলাদেশকে ‘সি’ গ্রুপে নিয়ে যেতে হলে আইসিসি প্রধানের আনুকূল্য, সহযোগিতা ও সহায়তা খুব জরুরি। জয় শাহ উদ্যোগী ও উদ্যমী হলেই কেবল বাংলাদেশের এবারের বিশ্বকাপ খেলা হবে। অন্যথায় নয়।

এআরবি/আইএইচএস