প্রায় অর্ধশতাব্দী পর ফের চাঁদে মানুষ পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহেই শুরু হতে পারে নাসার মানববাহী চন্দ্রাভিযান ‘আর্টেমিস-২’।
শনিবার (১৭ জানুয়ারি) উৎক্ষেপণের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে নাসা তাদের বিশাল স্পেস লঞ্চ সিস্টেম (এসএলএস) রকেট এবং ওরিয়ন স্পেস ক্যাপসুলকে ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টারের ভেহিকল অ্যাসেম্বলি বিল্ডিং (ভিএবি) থেকে উৎক্ষেপণ মঞ্চে নিয়ে আসে।
প্রায় ১০ দিনব্যাপী এই মিশনের মাধ্যমে আর্টেমিস–২ এর নভোচারীরা ইতিহাসে আগের যে কোনো মানুষের তুলনায় মহাকাশের আরও গভীরে পৌঁছাতে পারবেন। এই অভিযান ভবিষ্যতে আবার চাঁদের বুকে মানুষের অবতরণের পথ তৈরি করবে, যা শেষবার ঘটেছিল ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে ‘মিশন অ্যাপোলো’র সময়।
কবে উড়াল দেবে আর্টেমিস-২?
সব কিছু ঠিক থাকলে সবচেয়ে আগাম উৎক্ষেপণ তারিখ হতে পারে শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি)। তবে শুধু রকেট প্রস্তুত থাকলেই হবে না, চাঁদের অবস্থানও উৎক্ষেপণের জন্য উপযুক্ত হতে হবে।
শনিবার (১৭ জানুয়ারি) স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ৪১ মিনিটে কেনেডি স্পেস সেন্টারের প্যাড ৩৯বি-তে রকেটটি পৌঁছায়। বিশাল মহাকাশযান বহন করে নিয়ে যায় ‘ক্রলার-ট্রান্সপোর্টার’ নামের এক দানবীয় বাহন। এর সর্বোচ্চ গতি ছিল ঘণ্টায় মাত্র ১ দশমিক ৩ কিলোমিটার (০.৮২ মাইল)! কচ্ছপগতির এই দৃশ্য সরাসরি উপভোগ করেছেন অসংখ্য মানুষ।
জানুয়ারির শেষ দিকে নাসা ‘ওয়েট ড্রেস রিহার্সাল’ নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা চালাবে, যা মূলত উৎক্ষেপণের আগে রকেটে জ্বালানি ভরে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম। কোনো সমস্যা দেখা দিলে অতিরিক্ত কাজ করা হতে পারে।
সম্ভাব্য উৎক্ষেপণ তারিখগুলো হলো-
ফেব্রুয়ারি: ৬, ৭, ৮, ১০ ও ১১
মার্চ: ৬, ৭, ৮, ৯ ও ১১
এপ্রিল: ১, ৩, ৪, ৫ ও ৬
কারা থাকছেন আর্টেমিস-২-এর ক্রুতে?
চার সদস্যের এই মিশনে নেতৃত্ব দেবেন নাসার কমান্ডার রিড উইসম্যান। পাইলট হিসেবে থাকবেন ভিক্টর গ্লোভার। মিশন স্পেশালিস্ট হিসেবে থাকছেন ক্রিস্টিনা কখ। এছাড়া কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির নভোচারী জেরেমি হ্যানসেনও মিশন স্পেশালিস্ট হিসেবে অংশ নেবেন।
পৃথিবীর কক্ষপথে পৌঁছানোর পর নভোচারীরা ওরিয়ন মহাকাশযানের নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা পরীক্ষা করবেন। ভবিষ্যতে চাঁদে অবতরণের প্রস্তুতি হিসেবে তারা হাতে নিয়েই ক্যাপসুল চালানো, দিকনির্দেশনা ও অবস্থান নির্ধারণের অনুশীলন করবেন।
এরপর তারা চাঁদের অনেক দূরে, কয়েক হাজার কিলোমিটার অতিক্রম করে যাবে। সেখানে ওরিয়নের জীবনধারণ ব্যবস্থা, চালনা, বিদ্যুৎ ও ন্যাভিগেশন সিস্টেম পরীক্ষা করা হবে।
নভোচারীরা চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরীক্ষার অংশ হিসেবেও কাজ করবেন এবং গভীর মহাকাশ থেকে তথ্য ও ছবি পাঠাবেন।
ওজনশূন্য পরিবেশে তারা ছোট একটি কেবিনে কাজ করবেন। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের তুলনায় বিকিরণের মাত্রা বেশি হলেও তা নিরাপদ সীমার মধ্যেই থাকবে।
পৃথিবীতে ফেরার সময় নভোচারীদের বায়ুমণ্ডল পেরোনোর সময় ঝাঁকুনিপূর্ণ অভিজ্ঞতা হবে। পরে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলের কাছে প্রশান্ত মহাসাগরে ক্যাপসুল অবতরণ করবে।
আর্টেমিস-২ কি চাঁদে অবতরণ করবে?
না। এই মিশনে চাঁদে অবতরণ করা হবে না। এটি আর্টেমিস-৩ মিশনের মাধ্যমে চাঁদে মানুষের অবতরণের প্রস্তুতি হিসেবে কাজ করবে।
নাসার ভাষ্য অনুযায়ী, আর্টেমিস-৩-এর উৎক্ষেপণ ২০২৭ সালের আগে হবে না। তবে বিশেষজ্ঞদের ধারণা, বাস্তবে ২০২৮ সালের আগে এটি সম্ভব নয়।
শেষ কবে মানুষ চাঁদে গিয়েছিল?
সবশেষ মানববাহী চন্দ্রাভিযান ছিল অ্যাপোলো-১৭। এটি ১৯৭২ সালের ডিসেম্বরে চাঁদে অবতরণ করে ও একই মাসে পৃথিবীতে ফিরে আসে।
এ পর্যন্ত মোট ২৪ জন নভোচারী চাঁদে গেছেন, যাদের মধ্যে ১২ জন চাঁদের পৃষ্ঠে হাঁটেন। এদের সবাই মিশন অ্যাপোলোর অংশ ছিলেন। এই ২৪ জনের মধ্যে বর্তমানে জীবিত আছেন মাত্র পাঁচজন।
যুক্তরাষ্ট্র প্রথম চাঁদে গিয়েছিল মূলত সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ভূরাজনৈতিক ও প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার লক্ষ্যে। সেই লক্ষ্য অর্জনের পর রাজনৈতিক আগ্রহ, জনসমর্থন ও অর্থায়ন কমে যায়।
‘মিশন আর্টেমিস’ মূলত দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নিয়ে মানুষকে আবার চাঁদে ফেরানোর উদ্যোগ, যেখানে নতুন প্রযুক্তি ও বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
অন্য দেশগুলোর পরিকল্পনা কী?
২০৩০-এর দশকে আরও কয়েকটি দেশ মানুষকে চাঁদে পাঠানোর পরিকল্পনা করছে। ইউরোপীয় নভোচারীরা ভবিষ্যতের আর্টেমিস মিশনে যোগ দেবেন ও জাপানও এতে অংশ নেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করেছে।
চীন নিজস্ব মহাকাশযান তৈরি করছে ও ২০৩০ সালের মধ্যে চাঁদের দক্ষিণ মেরুর কাছে প্রথম অবতরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
রাশিয়াও ২০৩০ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে চাঁদে নভোচারী পাঠানো ও একটি ছোট ঘাঁটি তৈরির কথা বলছে। অন্যদিকে, ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ২০৪০ সালের মধ্যে মানুষকে চাঁদে পাঠানোর লক্ষ্য ঘোষণা করেছে।
সূত্র: বিবিসি
এসএএইচ