মতামত

ভেনেজুয়েলা, তেল-আগ্রাসন এবং মনরো ডকট্রিনের পুনরুজ্জীবন

২০২৬ সালের ৩ জানুয়ারির ভোরে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাস যে দৃশ্যের মুখোমুখি হয়েছে, তা একবিংশ শতাব্দীর আন্তর্জাতিক রাজনীতির এক ভয়ংকর দৃষ্টান্ত। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পরিচালিত ব্যাপক সামরিক হামলায় যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার ও বিশেষ বাহিনী ব্যবহার করে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান নিকোলাস মাদুরোকে আটক করা হয়। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করে পুরো শহরকে অন্ধকারে ফেলে দেওয়া হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উক্তি—“It was dark and it was deadly”—এই আগ্রাসনের উন্মাদনার রাজনৈতিক দর্শনকে নগ্নভাবে প্রকাশ করে তোলে।

এই হামলাকে যদি বিচ্ছিন্ন কোনো সামরিক অভিযান হিসেবে দেখা হয়, তবে বড় ভুল করা হবে। এটি আসলে একবিংশ শতাব্দীর নতুন সাম্রাজ্যবাদের প্রতীক—যেখানে আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘ সনদ কিংবা রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব—সবকিছুকে পাশ কাটিয়ে শক্তির প্রদর্শনই চূড়ান্ত নীতি হয়ে উঠেছে।

ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ নতুন নয়। মাদক পাচার, দুর্নীতি ও গণতন্ত্র ধ্বংসের অভিযোগ তুলে রাষ্ট্রপ্রধানকে গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে। কিন্তু ইতিহাস বলে, সাম্রাজ্যবাদী হস্তক্ষেপের আগে এ ধরনের অভিযোগই নিয়মিত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ইরাকের ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্র’, লিবিয়ার ‘মানবাধিকার’ কিংবা পানামার ‘নার্কো-স্টেট’—সব ক্ষেত্রেই শেষ পর্যন্ত দেখা গেছে রাষ্ট্র ধ্বংস ও সম্পদ লুণ্ঠনের এক নির্মম অধ্যায়।

তাহলে প্রশ্ন ওঠে—পৃথিবীতে বহু রাষ্ট্র আছে, যাদের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ তোলা যায়। কিন্তু ভেনেজুয়েলাই কেন এত বড় আক্রমণের লক্ষ্য হলো?

এর উত্তর লুকিয়ে আছে তেলের বৈশ্বিক রাজনীতিতে। ভেনেজুয়েলা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রমাণিত তেল মজুদের অধিকারী। প্রয়াত প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজের নেতৃত্বে বলিভারীয় বিপ্লব এই তেলসম্পদের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল। এই সিদ্ধান্ত ভেনেজুয়েলার সাধারণ মানুষের জন্য যেমন আশীর্বাদ ছিল, তেমনি মার্কিন তেল করপোরেশন ও দেশীয় পুরোনো অভিজাত শ্রেণির জন্য ছিল বড় ধাক্কা।

বর্তমান সামরিক আগ্রাসন মূলত সেই অসমাপ্ত হিসাব মেটানোর চেষ্টা। এখানে গণতন্ত্র কিংবা মানবাধিকার আসল বিষয় নয়; আসল বিষয় হলো—কে তেলের নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং কে ‘বৈশ্বিক শক্তি’র শর্ত মেনে চলবে। এই বাস্তবতা ভেনেজুয়েলার সাধারণ মানুষ ভালো করেই বোঝে। হামলার পরপরই কারাকাসের রাস্তায় মানুষ জড়ো হয়ে বলেছে—এটি কোনো নির্দিষ্ট সরকারের বিরুদ্ধে নয়, এটি পুরো জাতির সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে আক্রমণ। তারা স্পষ্ট করেই বলেছে, এই যুদ্ধ ভেনেজুয়েলার জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে এবং করপোরেট পুঁজির পক্ষে। কিন্তু আন্তর্জাতিক করপোরেট মিডিয়ায় এই কণ্ঠস্বর প্রায় অনুপস্থিত।

ভেনেজুয়েলা প্রশ্নে গ্লোবাল সাউথের ভূমিকাও হতাশাজনক। এই হামলার কয়েক ঘণ্টা আগেই প্রেসিডেন্ট মাদুরো চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বিশেষ দূত চিউ শিয়াওচির সঙ্গে বৈঠক করেন। তারা ভেনেজুয়েলা ও চীনের মধ্যে চলমান ৬০০টি যৌথ প্রকল্প এবং ৭০ বিলিয়ন ডলারের চীনা বিনিয়োগ নিয়েও আলোচনা করেন।যদিও চীন এই আগ্রাসনের নিন্দা জানিয়েছে, কিন্তু বাস্তব প্রতিরোধ গড়ে তোলার সক্ষমতা বা রাজনৈতিক উদ্যোগ—দুটোই সীমিত। অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব থাকা সত্ত্বেও সামরিক বা কৌশলগতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ‘হাইপার-ইম্পেরিয়ালিজম’ ঠেকানো আজও গ্লোবাল সাউথের সাধ্যের বাইরে।

লাতিন আমেরিকার ভেতরের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। একসময় সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক ঐক্যের কথা বলা ৩৩টি দেশের আঞ্চলিক রাজনৈতিক জোট ‘সেলাক’ (CELAC—Community of Latin American and Caribbean States) আজ মার্কিন আগ্রাসনের নিন্দা জানাতেও ব্যর্থ। আর্জেন্টিনা, ইকুয়েডরসহ একাধিক দেশ প্রকাশ্যে বা নীরবে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে সমর্থন করেছে। ‘পিংক টাইড’ (বামপন্থি ধারা)-এর জায়গায় ডানপন্থী, মার্কিনপন্থী ‘অ্যাংরি টাইড’-এর উত্থান লাতিন আমেরিকার রাজনৈতিক ভারসাম্য বদলে দিয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটেই ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে মনরো ডকট্রিন পুনরুজ্জীবনের ঘোষণা দিয়েছেন। উল্লেখ্য, ১৮২৩ সালের ২ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেমস মনরো কংগ্রেসে তাঁর বার্ষিক ভাষণে যে নীতির ঘোষণা দেন, সেটিই ইতিহাসে মনরো ডকট্রিন (Monroe Doctrine) নামে পরিচিত। এই নীতির মূল কথাটি ছিল—ইউরোপীয় দেশগুলো (স্পেন, ব্রিটেন, ফ্রান্স প্রভৃতি) লাতিন আমেরিকা কিংবা পশ্চিম গোলার্ধে উপনিবেশ গড়তে পারবে না। অর্থাৎ লাতিন আমেরিকার দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাববলয়ের মধ্যেই থাকবে।

ভেনেজুয়েলায় আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে সেই পুরোনো সাম্রাজ্যবাদী ধারণাকে আবারও শক্ত হাতে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। এটি কেবল ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে নয়, গোটা অঞ্চলের স্বাধীন উন্নয়নচিন্তা, গণতন্ত্র কিংবা সমাজতান্ত্রিক ধারার বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ও মানবিক আইন অমান্য করে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবস্থান।

লাতিন আমেরিকার স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম প্রধান নেতা সিমন বলিভারের রাজনৈতিক দর্শন—‘সার্বভৌমত্ব, সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধিতা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও আঞ্চলিক ঐক্য’-এর ভিত্তিতে উনিশ শতকের যে স্বাধীনতা সংগ্রাম, তা আধুনিক রূপ পায় একবিংশ শতকে। লাতিন আমেরিকার জনগণের প্রাণের এই বলিভারীয় দর্শন ও রাজনীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতেই আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের নির্লজ্জ পদক্ষেপ হলো ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট এবং তাঁর স্ত্রীকে রাতে অন্ধকারে ধরে নিয়ে যাওয়া। এই ধরে নেওয়ার পথটি সুগম করে দিয়েছিলেন মাদুরোর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিয়োসদাদো কাবেলো। মাদুরোকে বন্দি করতে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানের কয়েক মাস আগেই দেশটির এই মন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করছিল ট্রাম্প প্রশাসন। অভিযানের পরও এই যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।

তাই সার্বভৌমত্বকে কেবল জাতীয় স্লোগান হিসেবে দেখলে চলবে না। যে কোনো দেশেই এটি রক্ষার জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সচেতনতা, প্রকৃত দেশপ্রেম, শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং বৈশ্বিক ক্ষমতার বাস্তবতা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা। ভেনেজুয়েলার আকাশে যে বোমা পড়েছে, তা কেবল একটি দেশের ওপর নয়—তা পড়েছে গ্লোবাল সাউথের আত্মবিশ্বাসের ওপর।

এই আঘাত থেকে শিক্ষা না নিলে, ভবিষ্যতে সেই অন্ধকার কার আকাশে নেমে আসবে—তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন।

লেখক: বৃটেনপ্রবাসী কলামিস্ট।

এইচআর/এমএস