গণভোট ও সাধারণ নির্বাচনের কাউন্টডাউন শুরু হয়েছে। সাধারণত এই সময় প্রার্থীরা অনানুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনি কাজ করে থাকেন। যা কখনো কখনো আচরণবিধিকেও লঙ্ঘন করে থাকে। কিন্তু এবছর এখনও সেই উত্তাপ ছড়ায়নি। আচরণবিধি লংঘন করে প্রচার চালানোর অভিযোগে নির্বাচন কমিশন খুবই কম প্রার্থীকে সতর্ক করেছে।
যতটা নির্বাচনি উত্তাপ এই সময় থাকার কথা ছিলো তেমনটা না হলেও এই নির্বাচন বিভিন্ন কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ কেমন একটা অনিশ্চয়তা এখনও চোখের সামনে। বিশেষ করে গণভোট বিষয়টি রীতিমতো ধোঁয়াশাচ্ছন্নই বলা যায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গণভোট বিষয়ে নেতিবাচক প্রচারণা ব্যাপকতর মনে হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এই জোয়ারে ইন্ধন জোগাচ্ছে-রাজনৈতিক দলগুলোর ভাবনা-চিন্তা ও সিদ্ধান্তহীনতা।
রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, গণভোট বিষয়টিকে একটি পক্ষ অপরিহার্য মনে করলেও আরেকটি পক্ষ স্পষ্টতই উপেক্ষা করছে।এই উপেক্ষার মাত্রা এতটাই জোরালো যে প্রতিপক্ষ বলতে পারছে-আসলে তারা গণভোটে ‘না’-কে বেছে নিয়েছে। এই প্রসঙ্গে জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের বক্তব্য স্মরণ করা যেতে পারে।তিনি কারো নাম উল্লেখ না করলেও বোঝা যায় প্রশ্নটি বিএনপিকে লক্ষ্য করেই তিনি করেছেন। ১৩ জানুয়ারি ঢাকায় একটি অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন,‘গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে সব রাজনৈতিক দলের অবস্থান নেয়া দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।...তবে আমরা দেখতে পাচ্ছি একটা বিশেষ দল ‘না’ এর পক্ষে কথা তুলছে।...‘না’-এর পক্ষে যারা কথা বলছেন,তারা আসলে কী বার্তা দিতে চান তা স্পষ্ট নয়।’
নাহিদ ইসলামের বক্তব্য তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিছক সমালোচনার জন্য করেছেন এমনটা বলা যায় না। আবার নাহিদ ইসলামদের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী এনসিপির পথেই বিএনপি চলবে এরও কি সুষ্ঠু পরিবেশ তারা তৈরি করেছে?প্রশ্ন আসতেই পারে একটি সফল অভ্যুত্থানে সহযোগী হওয়ার পরও বিএনপির সঙ্গে তাদের এই দূরত্ব তৈরির কারণ কি? এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা হতে পারে। সেদিকে না গিয়ে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহকেই উপজীব্য করতে চাই।
গণভোট বিষয়ে বিএনপির অবস্থানটা আসলে কি? ভুলে যাওয়ার কথা নয়, একসময় বিএনপি গণভোটকে নিরুৎসাহিত করেছিলো। তাদের ভাষ্য ছিলো পার্লামেন্ট হচ্ছে সার্বভৌম,সেখানেই সিদ্ধান্ত হবে-সংস্কার কীভাবে হবে। তাদের কথা ছিলো,রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ইশতিহারে নিজ পরিকল্পনা তুলে ধরবে এবং সেই অনুযায়ী জনমতের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ হবে সংবিধান সংশোধন বা সংস্কারের বিষয়টি।
এক সময় সরকারের উদ্যোগে সংস্কার কমিশনগুলো প্রস্তাব উত্থাপন করলে সেখানে বিএনপিরও অংশগ্রহণ ছিলো। তারা নোট অব ডিসেন্টসহ জুলাই সনদে স্বাক্ষরও করে। পরবর্তীকালে সরকার জুলাই সনদ ঘোষণাকালে নোট অব ডিসেন্টগুলো মুছে দেয়। আসলে সেখান থেকে গণভোট প্রসঙ্গটি ঘোলাটে হতে থাকে।জুলাই অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বড় বিভাজন এই সনদ নিয়েই। তারপরও বিএনপি গণভোটের বিপক্ষে কিছু বলেনি। যদিও জুলাই সনদ নিয়ে তাদের সমালোচনা চলছিলো। নতুন নতুন ইস্যু তৈরি হওয়ার কারণে প্রসঙ্গটি চাপা পড়েও যায় একসময়। এমনকি তফশিল ঘোষণার পরও জোরালো বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছিল না।
এমন পরিস্থিতিতে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেছেন,‘সংস্কার প্রশ্নে ‘না’ বলার কোনো কারণ আছে বলে আমি মনে করি না’। কিন্তু একইসঙ্গে তিনি আবারও মনে করিয়ে দিয়েছেন,২০১৬ ও ২০২৩ সালে বিএনপি ৩১ দফা ঘোষণায় সংস্কার বিষয়ে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে।তাঁর এই বক্তব্যে আবারও ধোঁয়াশা তৈরি হয়। অন্তত জুলাই সনদের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট প্রত্যাশীদের সামনে ৩১দফা দেয়ালের মতো দাঁড়ায় এসে। প্রশ্ন আসে বিএনপি কি জুলাই সনদে ‘না’ এবং ৩১ দফায় ‘হাঁ’ বলতে চাইছে? এতদিন সভাসমাবেশে তারা ৩১দফাকে প্রাধান্য দিয়ে বলছিলো। কিন্তু সর্বশেষ তথ্যমতে রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতে সভাসমাবেশের বক্তব্যকে প্রাধান্য দিয়ে নির্বাচনি ইশতেহার প্রস্তুত করছে তারা।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হলে এবং সংসদ নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হলে তারা গণভোটের রায়কে পাশ কাটাতে চাইলে খুব একটা বেগ পেতে হবে না। কারণ তারা ৩১দফা ভিত্তিক গণরায়ও পাবে যেখানে জুলাই সনদ অন্তর্ভুক্ত থাকলেও নোট অব ডিসেন্ট অংশটুকুও আইনি ভিত্তি পেয়ে যাবে। এমতাবস্থায় বিএনপি ও তাদের জোটসঙ্গীদের ছাড়া বাকি সবাই এই গণভোট পরবর্তী পরিস্থিতিকে গণঅসন্তোষের দিকে নিয়ে যেতে চাইবে। যে কারণে গণভোট কিংবা সংসদ নির্বাচন হলেই রাজনৈতিক হতাশামুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি হবে আগাম বলা সম্ভব নয়।
এমন পরিস্থিতিতে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটে ভোটারদের আহ্বান জানানোর ক্ষেত্রে বিএনপির ভূমিকা আরও অস্পষ্ট হয়ে যায়। বিশেষ করে দলটির মহাসচিবের ১৩ তারিখে ঠাকুরগাঁওয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে বলা বক্তব্য থেকে। তিনি সেখানে বলেন,‘আমাদের ৩১ দফার বাইরে নতুন কোনো সংস্কার নেই’।শুধু তাই নয় এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলাম যেখানে বলেছেন,গণভোটের ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালানো সব দলের দায়িত্ব, সেখানে মির্জা ফখরুল ইসলাম স্পষ্ট বলেছেন ‘গণভোটের প্রচারের দায়িত্ব বিএনপির নয়’। এখন প্রশ্ন হচ্ছে-৩১ দফার বাইরে কোনো সংস্কারে তারা রাজি নয় এমনকি তারা প্রচারেও উৎসাহী নয়,তাহলে কি এটাই মনে করা যায় না, বিএনপি গণভোট বিষয়েই নিরুৎসাহী? তারমধ্যে যেটুকু না বললেই নয় সেটুকু বলার মাধ্যমে এগিয়ে যেতে চায় তারা? মহাসচিবের বক্তব্যকেই আবার উল্লেখ করতে হয়-অর্থাৎ গণভোটে ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’ ভোটের বিষয় জনগণই নির্ধারণ করবে। আর এই বার্তা কি কর্মীদের ‘না’ ভোটের পক্ষে যেতে নির্দেশনা দেবে না?
এই পর্যন্ত আলোচনায় মনে হতে পারে বিএনপি বুঝি ‘না’ ভোটের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বিএনপি স্থায়ী কমিটির দুই সদস্য যথাক্রমে নজরুল ইসলাম খান ও সালাহউদ্দীন আহমেদ যখন হ্যাঁ ভোটের পক্ষে কথা বলেন তখন অস্পষ্টতা কি গাঢ় হয় না? তাহলে ধরেই নেয়া যায়-গণভোটের মূল বিষয়ে এখনও সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগছেন তারা। এতে করে ভোটাররা সুষ্ঠু দিকনির্দেশনার অভাবে পড়বে না? এমনও হতে পারে কর্মীদের কেউ ‘হ্যাঁ’ কিংবা কেউ ‘ না’ ভোটের পক্ষে কাজ করবে।
কর্মীরা যদি গণভোটের পক্ষে প্রচারণা না চালায় তাহলে জনগণ অন্ধকারেই থেকে যাবে। অন্যদিকে ভোটারদের মানসিকতার বিষয়টি অবশ্যই আমলে আনতে হবে। জাগো নিউজ-এর ১৩ জানুয়ারি প্রকাশিত একটি সংবাদ দ্রষ্টব্য। সংবাদের শিরোনাম-‘বরগুনার বেশিরভাগ মানুষ জানে না গণভোট কী’। উল্লেখ্য যে আরও দশটা জায়গায় যদি খোঁজ নেয়া হয় তাহলে সবখানেই বরগুনার মতো ফল পাওয়া যাবে। আসলে এটি গোটা দেশেরই চিত্র।
এমন ধোঁয়াশার মধ্যে গণভোট অনুষ্ঠানের পর ফল যাই হোক কোনোটাই আগামী দিনের রাজনীতিকে সরলপথে পরিচালনা করবে এমন ভাবার কারণ নেই। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হলে এবং সংসদ নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হলে তারা গণভোটের রায়কে পাশ কাটাতে চাইলে খুব একটা বেগ পেতে হবে না। কারণ তারা ৩১দফা ভিত্তিক গণরায়ও পাবে যেখানে জুলাই সনদ অন্তর্ভুক্ত থাকলেও নোট অব ডিসেন্ট অংশটুকুও আইনি ভিত্তি পেয়ে যাবে। এমতাবস্থায় বিএনপি ও তাদের জোটসঙ্গীদের ছাড়া বাকি সবাই এই গণভোট পরবর্তী পরিস্থিতিকে গণঅসন্তোষের দিকে নিয়ে যেতে চাইবে। যে কারণে গণভোট কিংবা সংসদ নির্বাচন হলেই রাজনৈতিক হতাশামুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি হবে আগাম বলা সম্ভব নয়।
লেখক : সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক।
এইচআর/জেআইএম