সরকারি ও বেসরকারি সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশে এরই মধ্যে তামাক নিয়ন্ত্রণে অনেক প্রাপ্তি যোগ হয়েছে। তামাক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সরকার বাজেটও বরাদ্দ করেছে। সম্প্রতি ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ অনুমোদিত হয়েছে যা তামাক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিকে আরও একধাপ এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্র তৈরি করেছে। তবে মাঠ পর্যায়ে এই অধ্যাদেশের কঠোর বাস্তবায়ন চেয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) রাজধানীর বিএমএ ভবনে ‘২০টি জেলার তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নে অবস্থা পর্যালোচনা ও করণীয়’ শীর্ষক একটি মতবিনিময় সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ তামাকবিরোধী জোট (বাটা) এবং ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ (ডব্লিউবিবি) ট্রাস্টের উদ্যোগে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে ২০টি জেলার তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নের চিত্র তুলে ধরা হয়। ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্টের নির্বাহী পরিচালক সাইফুদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে এবং ডব্লিউবিবি ট্রাস্টের হেড অব প্রোগ্রাম সৈয়দা অনন্যা রহমানের সঞ্চালনায় মতবিনিময় সভায় বক্তব্য দেন জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেলের মহাপরিচালক মো. আখতারউজ-জামান, বাংলাদেশ রেলওয়ের আইবিআরটিএফ প্রোজেক্টের কনসালটেন্ট হোসেন আলী খান্দকার, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের স্যানেটারি ইন্সপেক্টর মো. কামরুল হাসান, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক জামাল নাসের খান, ঢাকা সিভিল সার্জন অফিসের সিনিয়র শিক্ষা কর্মকর্তা শাহানা পারভীন, জুনিয়ার স্বাস্থ্য শিক্ষা কর্মকর্তা মাহবুবা জেসমিন, ঢাকা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আব্দুল মজিদ, স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক মো. বদরুদ্দোজা শুভ প্রমুখ। সভায় বিষয়ভিত্তিক একটি প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করেন ডব্লিউবিবি ট্রাস্টের নেটওয়ার্ক কর্মকর্তা আজিম খান।
ডব্লিউবিবি ট্রাস্ট ও বাটার যৌথ উদ্যোগে প্রণীত ‘জেলাভিত্তিক রিপোর্ট কার্ড’-এর তুলনামূলক বিশ্লেষণে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে আসে। গবেষণায় দেখা যায় অন্তর্ভুক্ত জেলাসমূহের মধ্যে সিরাজগঞ্জ জেলার সামগ্রিক বাস্তবায়ন পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে সন্তোষজনক বলে প্রতীয়মান হয়েছে। বিপরীতে, শেরপুর জেলার বাস্তবায়ন অবস্থা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ, যেখানে আইন প্রয়োগ, নিয়মিত মনিটরিং এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য দুর্বলতা চিহ্নিত হয়েছে।
‘জেলাভিত্তিক রিপোর্ট কার্ড’ এ আরও দেখা যায়, অধিকাংশ জেলাতেই তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নে দূর্বলতা রয়েছে। ৯টি জেলায় টাস্কফোর্স সভা নিয়মিত হয় না , ১২টি জেলায় তামাকজাত পণ্যের মোড়কে তিন মাস অন্তর স্বাস্থ্য সতর্কবাণী পরিবর্তনের নমুনা পাওয়া যায়নি এবং ১৪টি জেলা থেকে জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেলে কোনো প্রতিবেদন পাঠানোর তথ্য পাওয়া যায়নি। এছাড়াও ৬টি জেলায় পাবলিক প্লেসে নো-স্মোকিং সাইনেজ নেই, ১৭টি জেলায় গত তিন মাসে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কোনো জরিমানা করা হয়নি ও ১৮টি জেলায় অভিযোগ জানানোর কোনো ব্যবস্থাই নেই। ১০টি জেলায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের ১০০ মিটারের মধ্যে তামাকজাত দ্রব্য বিক্রি হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি।
সভায় বক্তারা বলেন, জেলা প্রশাসন, সিভিল সার্জন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসহ টাস্কফোর্স কমিটির সব সদস্যদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও সমন্বয় বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে লাইসেন্সিং ব্যবস্থা চালু, এমআরপি অনুযায়ী তামাক পণ্য বিক্রি নিশ্চিত করা এবং আইন লঙ্ঘনকারী কোম্পানির বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তারা। বক্তারা আরও বলেন, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশটি দ্রুত আইনে পরিণত করা এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, গবেষণা ও জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি জোরদার করা এখন সময়ের দাবি।
তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের সঙ্গে বেসরকারি সংস্থাসমূহকে আর্থিক অনুদান প্রদানের মাধ্যমে সম্পৃক্ত করা জরুরি বলে মনে করেন বক্তারা।
ইএইচটি/এমএমকে