মতামত

রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি

রমজান মানেই সংযম, সহমর্মিতা এবং আত্মশুদ্ধি। কিন্তু বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে রমজান এখন আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। রোজা আসার মাসখানেক আগেই বাজারের আগাম উত্তাপ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের নাভিশ্বাস তুলে দিচ্ছে। এবারের রমজান আরও বেশি চ্যালেঞ্জিং, কারণ জাতীয় নির্বাচনের নির্ধারিত তারিখের ঠিক এক সপ্তাহের মাথায় রমজান শুরু হতে যাচ্ছে। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে উপলব্ধি করা যায়- একটি দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পরপরই ধর্মীয় গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত ও বড় উৎসবের এই সন্ধিক্ষণটি বাজার সিন্ডিকেটের জন্য এক সুবর্ণ সুযোগ হয়ে দাঁড়াবে। যখন মানুষের স্বস্তিতে থাকার কথা, তখন বাজারের অস্থিতিশীলতা তাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলবে।

বিশ্বের যে কোনো উন্নত বা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, রোজা বা বড় কোনো ধর্মীয় উৎসব উপলক্ষে ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম কমিয়ে দেন। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে শুরু করে ইউরোপ-আমেরিকায়ও মুসলিম ক্রেতাদের জন্য বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়। সেখানে ব্যবসায়ীরা একে পুণ্য অর্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখেন। কিন্তু আমাদের দেশে চিত্রটি ঠিক উল্টো। এখানে ব্যবসায়ীরা রমজান দেখেন রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার সুযোগ হিসেবে। বৈশ্বিক এই নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অভাবই আমাদের বাজার ব্যবস্থা বিষিয়ে তুলছে। এই ব্যবসায়িক অনৈতিকতা কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, বরং একটি গভীর সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়।

নির্বাচনি বছরগুলোতে সরবরাহ চেইন কিছুটা বিঘ্নিত হয়। রাজনৈতিক ডামাডোলের সুযোগে অসাধু মজুতদাররা পণ্য আটকে রেখে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে। গণমাধ্যমের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাজারে এখনই চাল, ভোজ্যতেল ও চিনির দামে অস্থিরতা শুরু হয়েছে। নির্বাচনের ঠিক পরপরই রমজান শুরু হওয়ায় প্রশাসনের নজরদারি যখন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার দিকে বেশি থাকবে, সেই সুযোগটিই নিচ্ছে সিন্ডিকেট। এখনই যদি কঠোর প্রস্তুতি গ্রহণ না করা হয়, তবে রোজার প্রথম সপ্তাহেই মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সীমার বাইরে চলে যাবে। তৈরি হবে অস্থিরতা।

এমনিতেই বিগত বছরগুলো থেকেই একজন সাধারণ দিনমজুর বা নিম্ন-বেতনভোগী চাকরিজীবীর জন্য ডাল-ভাতের সংস্থান করাই এখন দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাজারের প্রতিটি পণ্যের গায়ে আগুনের আঁচ। রোজায় ন্যূনতম ইফতার বা সেহরির প্রয়োজন, তার খরচ জোগাতে যেন কোটি মানুষকে হিমশিম খেতে না হয়, সেদিকে এখন থেকেই দৃষ্টি দেওয়া জরুরি।

ক্রয়ক্ষমতার নাগালের বাইরে চলে যাওয়া নিত্যপণ্য কেবল পেটে টান দেয় না, বরং মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক স্থিতিশীলতাকেও নষ্ট করে। যখন একজন বাবা তার সন্তানের মুখে ইফতারের সময়  ন্যূনতম ফল বা পুষ্টিকর খাবার তুলে দিতে পারেন না, তখন সেই ক্ষোভ ও হতাশা রাষ্ট্রের ব্যবস্থার ওপর মানুষের অনাস্থা তৈরি করে।

বাংলাদেশের বাজার ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় অভিশাপের নাম হলো ‘সিন্ডিকেট’। গুটিকয়েক বড় আমদানিকারক ও পাইকারি ব্যবসায়ী পুরো দেশের ১৭ কোটি মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা জিম্মি করে রেখেছে। রমজান আসার আগেই তারা কৃত্রিম সংকট তৈরির এক সুনিপুণ খেলা শুরু করে। যখন বাজারে কোনো পণ্যের চাহিদা বাড়ে, তখনই রহস্যজনকভাবে সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়। চাল, ডাল, চিনি ও ভোজ্যতেলের মতো নিত্যপণ্যের মজুত পর্যাপ্ত থাকা সত্ত্বেও কেন দাম বাড়ে? উত্তরটি সহজ—অধিক মুনাফার লোভ। এই অদৃশ্য সিন্ডিকেট চক্রটি এতটাই শক্তিশালী যে, অনেক সময় রাষ্ট্রকেও তাদের কাছে অসহায় মনে হয়।

প্রতি বছর রোজা আসার আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বড় বড় প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু বাস্তবে তাদের অভিযানগুলো কেবল খুচরা বিক্রেতা বা ছোট দোকানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। যারা মূল হোতা, যারা বড় বড় গুদামে হাজার হাজার টন পণ্য মজুত করে রাখে, তাদের কেশাগ্রও কেউ স্পর্শ করতে পারে না। বাজার তদারকি যদি কেবল ফটোসেশন আর সামান্য জরিমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে অসাধু ব্যবসায়ীরা কোনোদিনও শোধরাবে না। এখন থেকে নজরদারির পাশাপাশি নির্বাচনের পরপরই যদি টাস্কফোর্স গঠন করে বড় গুদামগুলোতে অভিযান চালানো না হয়, তবে এই রমজান হবে সাধারণ মানুষের জন্য এক দীর্ঘশ্বাসের মাস।

নিত্যপণ্যের তালিকায় বর্তমানে সবচেয়ে বড় অস্থিরতার নাম এলপিজি বা সিলিন্ডার গ্যাস। সাধারণ মানুষ যখন চাল-ডালের দাম নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে, তখন মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে গ্যাসের এই তুঘলকি কাণ্ড। বিইআরসি প্রতি সিলিন্ডার গ্যাসের দাম ১২ কেজি ১,৩০৬ টাকা (গত ডিসেম্বর ২০২৫-এ এটি ছিল ১,২৫৩ টাকা) নির্ধারণ করে দিলেও মাঠপর্যায়ে এটি ২০০০ থেকে ২৫০০ টাকা, এমনকি মফস্বলে ৩০০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। সরবরাহ সংকটের অজুহাত দিয়ে খুচরা ও পাইকারি বিক্রেতারা সিন্ডিকেট করে সাধারণ মানুষের পকেট কাটছে।

রমজানে ইফতারের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো খেজুর। অথচ বিগত বছরগুলোতে খেজুর নিয়েও বিস্তর অভিযোগ। এই পবিত্র মাস সামনে রেখে খেজুরের বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি করা হয়, তা রীতিমতো অমানবিক। গত এক বছরে খেজুরের দাম প্রকারভেদে ৫০ শতাংশ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকার খেজুরকে বিলাসবহুল পণ্য হিসেবে গণ্য করে উচ্চ হারে শুল্ক আরোপ করার অজুহাত দিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা যায়, আমদানি করা খেজুরের বিশাল মজুত গুদামগুলোতে পড়ে আছে। রোজা শুরু হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম আরও বাড়ানোর পাঁয়তারা চলছে। ইফতারি থেকে খেজুর বাদ দেওয়ার উপক্রম হয়েছে কোটি মানুষের।

নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের শেষ ভরসার জায়গা হলো টিসিবি। কিন্তু টিসিবির বর্তমান সরবরাহ ব্যবস্থা চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে যে পণ্য দেওয়া হয়, তা অনেক সময় নিম্নমানের হয় এবং লাইনে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেকে পণ্য পান না। গ্রাম পর্যায়ে টিসিবির কার্যক্রম এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছাতে পারেনি। আসন্ন রমজানে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার নাগালের মধ্যে খাদ্যদ্রব্য পৌঁছে দিতে হলে টিসিবির ট্রাকের সংখ্যা এবং চাল, ডাল, তেল ও চিনির পাশাপাশি খেজুর ও সিলিন্ডার গ্যাসের সুলভ মূল্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

নির্বাচনের নির্ধারিত তারিখের ঠিক এক সপ্তাহের মাথায় রমজান শুরু হওয়ায় সরকারের সামনে এটি এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। নবনির্বাচিত বা পুনর্বিন্যস্ত সরকারকে প্রথমেই প্রমাণ করতে হবে তারা জনগণের পালস বোজেন। বাজারের এই অস্থিরতা যদি নির্বাচনের পরপরই দমন করা না যায়, তবে জনমনে এক ধরনের দীর্ঘস্থায়ী অসন্তোষ তৈরি হবে। নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস থেকে মুক্তি দিতে হলে কেবল মুখে আশ্বাস নয়, বরং দৃশ্যমান অ্যাকশন প্রয়োজন।

জাতীয় নির্বাচনের পরবর্তীসময়ে স্থিতিশীলতা ফেরাতে সরকার নিম্নোক্ত পদক্ষেপ নিলে সফল হতে পারে। যেমন- ১. পাইকারি বাজার ও কোল্ড স্টোরেজগুলোতে নিয়মিত গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো। ২. কৃত্রিম সংকট তৈরি করলে আমদানিকারকদের লাইসেন্স বাতিল করা। ৩. টিসিবির মাধ্যমে সুলভ মূল্যের পণ্যের সরবরাহ কয়েক গুণ বৃদ্ধি করা। ৪. বিইআরসি নির্ধারিত মূল্যে সিলিন্ডার গ্যাস বিক্রি নিশ্চিত করতে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ। ৫. আমদানিকারকদের এলসি সুবিধা দেওয়া থেকে শুরু করে শুল্ক সমন্বয় করা।

পরিশেষে বলা যায়- দ্রব্যমূল্যের আগুন যদি নিয়ন্ত্রণে আনার বা রাখার যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তবে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হবে। মানুষ কেবল উন্নয়ন চায় না, তারা শান্তিতে দু’বেলা দু’মুঠো খেয়ে বেঁচে থাকতে চায়। আমরা চাই একটি স্বস্তির রমজান, যেখানে প্রতিটি মানুষ ন্যূনতম ইফতার ও সেহরি সম্মানের সাথে গ্রহণ করতে পারবে। ব্যবসায়ীদের শুভবুদ্ধির উদয় হোক এবং প্রশাসন তাদের দায়িত্ব পালনে কঠোর হোক—এটাই ১৭ কোটি মানুষের প্রত্যাশা।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।farukkht@yahoo.com

এইচআর/এমএস