বিনোদন

পাকিস্তানে জন্ম, বাংলাদেশই হলো নায়ক জাভেদের শেষ ঠিকানা

সোনালি সময়ের জনপ্রিয় নায়ক ইলিয়াস জাভেদ আর নেই। আজ সোমবার সকালে এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই ঢালিউড যেন মুহূর্তেই নিস্তব্ধ হয়ে গেল। মৃদু রোদের রাজত্ব ফিকে করে শোকের কুয়াশা নেমে এলো চলচ্চিত্রপাড়ায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিণত হলো শোকবইয়ে। সহকর্মী, ভক্ত, অনুরাগীরা স্মরণ করতে লাগলেন এক রাজপুত্রসম নায়কের নাম।

ইলিয়াস জাভেদ, নামটি শুনলেই চোখে ভেসে ওঠে আভিজাত্য, পরিপাটি পোশাক, আত্মবিশ্বাসী দৃষ্টি। পর্দায় তিনি ছিলেন রাজকুমারের মতো। কিন্তু সেই ঝলমলে উপস্থিতির আড়ালে ছিল এক নিঃসঙ্গ যাত্রার গল্প। নায়ক হওয়ার স্বপ্নে জন্মভূমি, মা-বাবা, ভাই-বোন ছেড়ে অচেনা দেশে পাড়ি জমানো এক তরুণের গল্পেরও নায়ক জাভেদ।

১৯৪৪ সালে পাকিস্তানের পেশোয়ারে জন্ম তার। আসল নাম রাজা মোহাম্মদ ইলিয়াস। বাবা চৌধুরী মোহাম্মদ আফজাল চাইতেন ছেলে ব্যবসা করুক। কিন্তু ইলিয়াসের মন পড়ে ছিল সিনেমায়। সেই টানই একসময় তাকে পরিবারের অমতে ঘর ছাড়তে বাধ্য করে। পেশোয়ার থেকে পাঞ্জাব হয়ে তার জীবনে আসেন নাচের গুরু সাধু মহারাজ। তিনি তাকে নিয়ে আসেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে। সালটা ১৯৬২।

ঢাকায় এসে উঠেছিলেন এক বোনের বাসায়, পুরান ঢাকার সিদ্দিক বাজার এলাকায়। রাজপুত্রের মতো চেহারার সেই তরুণকে পাড়া-মহল্লার মানুষ আপন করে নিয়েছিল। কেউ স্নেহে জড়িয়ে ধরতেন, কেউ ডাকতেন ‘ছেলে’। এই চেহারা, এই উপস্থিতিই একদিন তাকে পৌঁছে দেয় সিনেমার দরজায়।আরও পড়ুনশেষবার এফডিসিতে নায়ক জাভেদ, শ্রদ্ধা নায়ক-খলনায়কদেরএক গ্লাসে দুধপান করে নায়ক আলমগীরের ভাই হয়েছিলেন জাভেদ

১৯৬৪ সালে ‘নয়া জিন্দেগি’ ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ পেলেও ছবিটি মুক্তি পায়নি। কিন্তু ভাগ্য থেমে থাকেনি। ১৯৬৬ সালে ‘পায়েল’ সিনেমায় নায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। সহশিল্পী ছিলেন শাবানা ও রাজ্জাক। ছবিটি মুক্তির পর দর্শক বুঝে নেয় নতুন এক নায়ক এসেছে।

জাভেদ অভিনীত ছবির মধ্যে মালকা বানু, পায়েল (উর্দু) বিজলী, বাঘিনী, অনেক দিন আগে, জোশ, বসন্ত মালতী, সওদাগর, চন্দন দ্বীপের রাজকন্যা, রাজবধু, শিষ মহল, রক্তের বন্দী,মর্জিনা, মহুয়া সুন্দরী, কাল নাগিনী, সতী নারী, ওয়ারীশ, রাজিয়া সুলতানা, আলীবাবা ৪০ চোর, মধু মালতী অন্যতম।

জাভেদ অভিনীত উল্লেখ্যযোগ্য কিছু গানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মালকা বানুর দেশেরে (মালকা বানু), আমি এক মাস্তানা (বিজলী), চুপি চুপি বলো কেউ জেনে যাবে (নিশান), ওরে ও বাঁশীওয়ালা (নরম গরম), এই নিশি রাইতে (নরম গরম), একটি রাতের গল্প তুমি (মর্জিনা), আমি তো প্রেমে পড়েছি (শিষ মহল), আমি তিসমার খান (অনেক দিন আগে), ও আমার মরমীয়া সওদাগর), নূপুর বাজে না ছমছম (মহুয়া সুন্দরী), তুমি আমার প্রেমের মাস্টার (বসন্ত মালতী), ও বন্ধুরে ও প্রাণ বন্ধুরে (বসন্ত মালতী), সাক্ষী থেকো বাঁকা চাঁদ (মহুয়া সুন্দরী), বে দরদী বুঝলিনারে (জোশ) ও সোহাগ চাঁদ বদনী( চন্দন দ্বীপের রাজকন্যা) ইত্যাদি।

জনপ্রিয়তার শিখরে উঠতে উঠতে জাভেদ বুঝেছিলেন, এই দেশের মাটির সঙ্গে তার আত্মার এক অদ্ভুত সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছে। এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, বাবা-মা, ভাইবোনদের কথা মনে পড়ত ঠিকই, কিন্তু এই দেশ, এই মানুষের টান তাকে আর ফেরাতে পারেনি। কোনো আফসোসও ছিল না।

ভাইদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। দেখা হয়েছিল মায়ের সঙ্গেও। এক সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করে বলেছিলেন, ভাইয়েরা ফোনে যোগাযোগ করে। মৃত্যুর কয়েক বছর আগে বাংলাদেশে এসে দেখে গেছে দুই ভাইয়ের দুই ছেলে। মায়ের কথা মনে পড়তো। দেখা হয়েছিল অনেক আগে। একটা যৌথ প্রযোজনার ছবি করতে পাকিস্তান গিয়েছিলেন। একফাঁকে মায়ের সঙ্গে দেখা করে এসেছিলেন। সেই দেখাই শেষ দেখা।

পাকিস্তানে জন্ম নেওয়া সেই মানুষটি আজ শেষ নিঃশ্বাস ফেললেন বাংলাদেশের মাটিতে। দেশ ছেড়েছিলেন সিনেমার টানে, মরলেন বাংলাদেশি হয়ে। ভালোবাসা, স্মৃতি আর অসংখ্য দর্শকের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়ে তার অনন্তলোকের এই যাত্রা চিরপ্রশান্তির হোক।

 

এলআইএ