আইন-আদালত

হাইকোর্টের বেঞ্চ বদলের আবেদন খারিজ, শুনানি মুলতবি

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে বন্দর কর্তৃপক্ষের চুক্তিসম্পর্কিত চলমান প্রক্রিয়া নিয়ে করা রিট হাইকোর্টের অন্য কোনো বেঞ্চে বদলি (ট্রান্সফার) চেয়ে প্রধান বিচারপতির কাছে করা আবেদন খারিজ করা হয়েছে। এ তথ্য হাইকোর্টকে অবহিত করেছেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার অনীক আর হক।

বুধবার (২১ জানুয়ারি) বিচারপতি জাফর আহমেদের একক বেঞ্চের আদেশে এ তথ্য উল্লেখ করা হয়। এদিন আদালতে রিটকারীর পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন, আহসানুল করিম ও সৈয়দ মামুন মাহবুব এবং আইনজীবী মো. আনোয়ার হোসেন উপস্থিত ছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার অনীক আর হক।

হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চের বিভক্ত রায়ের পর হাইকোর্টের বিচারপতি জাফর আহমেদের একক বেঞ্চে ওই রিটের শুনানি চলছিল। এ বেঞ্চ থেকে বিষয়টি (রিট) প্রত্যাহারের প্রার্থনা খারিজ করে আদেশ দিয়েছেন একক বেঞ্চ।

আদেশে বলা হয়, প্রধান বিচারপতি বিষয়টি এ বেঞ্চে (একক বেঞ্চ) পাঠিয়েছেন এবং আবেদনকারীর বেঞ্চ ট্রান্সফার (স্থানান্তর) আবেদন খারিজ হয়েছে, যা অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেলের মাধ্যমে আদালত অবগত হয়েছেন। প্রধান বিচারপতির নির্দেশ উপেক্ষা করতে আদালত অপারগ এবং এ বেঞ্চ থেকে বিষয়টি প্রত্যাহারের প্রার্থনা খারিজ করা হলো।

নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনায় বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চুক্তি–সম্পর্কিত চলমান প্রক্রিয়া নিয়ে করা রিটের ওপর গত বছরের ৪ ডিসেম্বর হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ দ্বিধা বিভক্ত রায় হয়। এরপর প্রধান বিচারপতি গত ১৫ ডিসেম্বর রিটটি নিষ্পত্তির জন্য হাইকোর্টের বিচারপতি জাফর আহমেদের একক বেঞ্চে পাঠান। এ বেঞ্চে শুনানি শুরু হয়। গত ৫ ও ৮ জানুয়ারি শুনানি হয়। এরপর ১৩ জানুয়ারি শুনানি নিয়ে আদালত পরবর্তী শুনানির জন্য গত ২০ জানুয়ারি দিন ঠিক করেন। এরপর গত মঙ্গলবার রিটটি কার্যতালিকায় ওঠে। তারই ধারাবাহিকতায় বুধবার সেটি শুনানি হয়।

রিট আবেদন দায়েরকারী আইনজীবী মো. আনোয়ার হোসেন আদালতকে জানান, রিট আবেদনকারী বাংলাদেশ যুব অর্থনীতিবিদ ফোরামের পক্ষে সংগঠনটির সভাপতি মির্জা ওয়ালিদ হোসাইন মামলাটি (রিট) ট্রান্সফার (বদলি) করে অন্য কোর্টে দেওয়ার জন্য প্রধান বিচারপতির কাছে আবেদন করেছেন। বিষয়টি জানানোর পর আদালত এক দিনের জন্য শুনানি মুলতবি করেন।

আগের ধারাবাহিকতায় রিটটি আদালতের কার্যতালিকায় এক নম্বর ক্রমিকে ছিল। ক্রম অনুসারে বিষয়টি উঠলে রিট আবেদনকারীর পক্ষে তিনজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আদালতের প্রতি বিনয় ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে উল্লেখ করেন যে রিট আবেদনকারীর এই বেঞ্চের প্রতি আস্থা নেই। অন্যদিকে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক আদালতকে জানান, আবেদনকারীর আবেদন (বেঞ্চ বদল) প্রধান বিচারপতি খারিজ করে দিয়েছেন।

নিজে নোয়াখালী–১ আসনের প্রার্থী উল্লেখ করে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত শুনানি মুলতবির আরজি জানান রিট আবেদনকারীর জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন। এই প্রার্থনা খারিজ হয়েছে।

হাইকোর্টের আদেশ আপিল বিভাগে চ্যালেঞ্জ করবেন উল্লেখ করে দুই দিনের জন্য শুনানি মুলতবির প্রার্থনা করেন রিট আবেদনকারীর অপর জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সৈয়দ মামুন মাহবুব। এই প্রার্থনা আংশিক মঞ্জুর করে একদিন ( বুধবার) শুনানি মুলতবি করেছেন আদালত।

এর আগে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনায় ২০১৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) কর্তৃপক্ষের সমঝোতা স্মারক হয়। এই প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়াকে কেন্দ্র করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের এই কোম্পানির সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চুক্তি–সম্পর্কিত চলমান প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে বাংলাদেশ যুব অর্থনীতিবিদ ফোরামের পক্ষে সংগঠনটির সভাপতি মির্জা ওয়ালিদ হোসাইন গত বছর ওই রিট করেন। রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে গত বছরের ৩০ জুলাই হাইকোর্ট রুল দেন। রুলের ওপর শুনানি শেষে গত ৪ ডিসেম্বর হাইকোর্টের বিচারপতি ফাতেমা নজীব ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চে বিভক্ত রায় হয়।

২০১৫ সালের সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) আইন ও ২০১৭ সালের জিটুজির নির্দেশিকা লঙ্ঘন করে এনসিটি পরিচালনায় বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চুক্তির চলমান প্রক্রিয়া আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করেন বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি ফাতেমা নজীব। এর সঙ্গে একমত নন উল্লেখ করে বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ার রিট আবেদন (রুল ডিসচার্জ) খারিজ করে রায় দেন। এরপর প্রধান বিচারপতি বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য বিচারপতি জাফর আহমেদের নেতৃত্বাধীন একক হাইকোর্ট বেঞ্চে পাঠান।

চালু এই টার্মিনালটি বিদেশিদের হাতে ছেড়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয় বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারির আওতায় জিটুজি ভিত্তিতে টার্মিনালটি ছেড়ে দেওয়ার এই প্রক্রিয়া এগিয়ে নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। এ নিয়ে রাজনৈতিক সংগঠন, পেশাজীবী ও শ্রমিকেরা আন্দোলন কর্মসূচি পালন করেন।

২০০৭ সালে বন্দর কর্তৃপক্ষ এই টার্মিনাল নির্মাণ করে। টার্মিনালটি নির্মাণ ও যন্ত্রপাতি সংযোজনে বন্দর কর্তৃপক্ষ ধাপে ধাপে মোট ২ হাজার ৭১২ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। বর্তমানে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনা করছে নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠান চিটাগং ড্রাইডক লিমিটেড। বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার আগপর্যন্ত চিটাগং ড্রাইডক লিমিটেডের এই টার্মিনাল পরিচালনা করার কথা রয়েছে।

এফএইচ/এমএএইচ/এমএস