নানা শঙ্কা ও অভিযোগের মধ্যেই শুরু হলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাঠের মূল লড়াই। নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রায় দুই হাজার প্রার্থীকে প্রতীক বরাদ্দ দেওয়ার মধ্য দিয়ে বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণা।
আজ থেকে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাবেন প্রার্থীরা। এতে বাড়বে ব্যস্ততা। এ সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার চ্যালেঞ্জও থাকবে।
তবে পুলিশ, র্যাব ও একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারা বলছেন, ভোটের মাঠের পরিবেশ স্থিতিশীল রাখতে প্রস্তুত আছেন তারা। এমনকি যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতাও রয়েছে বলে জানিয়েছে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
পুলিশ জানিয়েছে, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার রোধে জোরালো অভিযান চালানোর পাশাপাশি কারাগার থেকে বের হওয়া সন্ত্রাসীদেরও নজরদারিতে রাখা হয়েছে। সেইসঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে এবং বিভিন্ন দিক-নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। ভোটের ক্ষেত্রে হুমকি হতে পারে-এমন ব্যক্তিদের ওপর নজর রাখতে এবং ক্ষেত্রবিশেষে তাদের আইনের আওতায় আনতে সব জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) ও মহানগর পুলিশ কমিশনারদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, নির্বাচন ঘিরে পুলিশসহ প্রায় ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। এর মধ্যে পুলিশের প্রায় দেড় লাখ সদস্য এবং আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ৫ লাখ ৫৫ হাজার ৯৫৮ সদস্য মোতায়েন থাকবেন। এছাড়া বিজিবির ৩৭ হাজার ৪৫৩, সশস্ত্র বাহিনীর প্রায় এক লাখ, র্যাবের প্রায় ৮ হাজার, নৌবাহিনীর ৫ হাজার, কোস্ট গার্ডের ৩ হাজার ৫০০ এবং ফায়ার সার্ভিসের ১৩ হাজার সদস্য নির্বাচনি দায়িত্ব পালন করবেন। এছাড়া নজরদারিতে থাকছে ড্রোন, যার ব্যবহার ইতোমধ্যে পুলিশসহ অন্যান্য বাহিনী শুরু করেছে।
নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনৈতিক সহিংসতা প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা জানান, নির্বাচন এলেই রাজনৈতিক সহিংসতা বাড়ে-অতীত অভিজ্ঞতায় তা দেখা গেছে। তবে এবার যেন এমন কিছু না ঘটে, সেজন্য পুলিশসহ অন্য বাহিনীগুলো খুবই সতর্ক। আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ এখন সর্বোচ্চ সচেষ্ট।
প্রচারে মানতে হবে যেসব বিধি
প্রচারের সময় কী করা যাবে, আর কী করা যাবে না-সে বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে নির্বাচনি আচরণবিধিতে। প্রথমবারের মতো পোস্টার ব্যবহার পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে অপচনশীল দ্রব্য দিয়ে ব্যানার, লিফলেট ও ফেস্টুন তৈরি করা যাবে না। পলিথিন বা প্লাস্টিক ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। লিফলেট, হ্যান্ডবিল, ফেস্টুন ও ব্যানারে নিজের প্রতীক ও ছবি ছাড়া অন্য কারও ছবি ব্যবহার করা যাবে না।
তবে কোনো প্রার্থী নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল থেকে মনোনীত হলে তিনি তার বর্তমান দলীয় প্রধানের ছবি ব্যবহার করতে পারবেন, যা অবশ্যই পোর্ট্রেট হতে হবে।
এবার প্রথমবারের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে প্রার্থী বা তার নির্বাচনি এজেন্ট কিংবা প্রার্থীর পক্ষে অন্য কেউ প্রচার চালাতে পারবেন। তবে শর্ত হলো প্রচারণা শুরুর আগে সংশ্লিষ্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নাম, অ্যাকাউন্ট আইডি, ই-মেইলসহ শনাক্তকরণ তথ্য রিটার্নিং অফিসারের কাছে জমা দিতে হবে। অসৎ উদ্দেশ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করা যাবে না।
নির্বাচনি স্বার্থে ধর্মীয় বা জাতিগত অনুভূতির অপব্যবহার করা যাবে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্বাচনসংক্রান্ত যে কোনো কনটেন্ট প্রকাশ বা শেয়ারের আগে তার সত্যতা যাচাই করতে হবে। ভোটারদের বিভ্রান্ত করা, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে কোনো প্রার্থী বা ব্যক্তির চরিত্রহনন বা সুনাম ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর, পক্ষপাতমূলক, বিদ্বেষপূর্ণ, অশ্লীল বা মানহানিকর তথ্য তৈরি, প্রকাশ বা প্রচার করা নিষিদ্ধ।
এছাড়া, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিদেশে জনসভা বা প্রচারণা; সংসদীয় আসনে ২০টির বেশি বিলবোর্ড ব্যবহার; নির্বাচনের দিন ও প্রচারকালীন ড্রোন ব্যবহার করা যাবে না। অন্যদিকে, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা কোনো প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনি প্রচারে অংশ নিতে পারবেন না।
নিরাপত্তার বিষয়ে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম জানান, প্রচারণা চলাকালে পুলিশের ব্যস্ততা স্বাভাবিকভাবে বাড়বে। সংঘাত ও সংঘর্ষ যেন না ঘটে সে ব্যাপারে এখন আরও বেশি সতর্ক পুলিশ। নজরদারি ও পুলিশের কার্যক্রম আরও বেশি দৃশ্যমান হবে।
প্রথমবারের মতো নির্বাচন উপলক্ষে পুলিশ সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রায় দেড় লাখ পুলিশ সদস্য এবার নির্বাচনের মাঠে দায়িত্ব পালন করছে।
র্যাব মহাপরিচালক অতিরিক্ত আইজিপি এ কে এম শহিদুর রহমান জানান, সর্বোচ্চ সতর্ক থাকবে র্যাবের সদস্যরা। যে কোনো অপতথ্যের ব্যাপারে সতর্ক করতে র্যাবের সাইবার টিম কাজ করছে। নির্বাচনি মাঠে কীভাবে র্যাব সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
টিটি/এমআরএম