বাংলাদেশে এখন অন্যায়ের প্রতিবাদ বা দেশ নিয়ে কথা বলার এখতিয়ার শুধু কয়েকটি রাজনৈতিক দলের পরিচয়ধারীদের জন্য। সাধারণ মানুষ ভীত সন্ত্রস্ত, চুপসে গেছে। তারা জানে, যার রাজনৈতিক পরিচয় নাই, তার দেশের নানা অনিয়ম, অন্যায় নিয়ে প্রতিবাদ তুলে ধরার উপায় নাই। যদি বক্তব্য কারো পছন্দ না হয়, তাহলে আওয়ামী দালাল বা দোসর ট্যাগ লেগে যেতে পারে। আর সেই ট্যাগের পরিণতি সম্পর্কেও মানুষ জানে।
শুধু অপমান, লাঞ্ছনা, গলা ধাক্কা নয়, এমনকি কয়েকজন ‘জনতা’র হাতে লাঠিপেটা হয়ে সাধের জীবনটা নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে। তাতেও কেউ কেউ হয়তো ভয় পেতো না, যদি ওই পিটিয়ে হত্যার কোনো বিচার পাওয়া যেতো। তার কোনো সম্ভাবনাই নাই। তাই সাধারণ মানুষ নীরব হয়ে গেছে। দাঁতে দাঁত কামড়ে সহ্য করছে। সহ্য করছে গ্যাসের অভাবে বাড়িতে বাড়িতে রান্না বন্ধ হয়ে যাওয়া। সহ্য করছে সবজির মৌসুমেও একমুঠো শাক চড়া দামে কেনা। সহ্য করছে চারদিকে অস্বাভাবিক মৃত্যু, বহু পণ্য আমদানিতে মন্থরগতি, ব্যবসায়ী পণ্য আমদানির এলসি খুলতে না পারার বিড়ম্বনা। আরো অনেক সহ্য করার কথা বলে শেষ করা যাবে না।
অবশ্য সহ্য না বলে ধৈর্য ধরছে বলা যায়। কেন এ ধৈর্য ধরা? দেশের রাজনৈতিক পরিচয়হীন মানুষরা আশা করছে, ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের মাধ্যমে একটি নির্বাচিত সরকার পাবে। কেমন নির্বাচন হবে সে সম্পর্কে মাথাব্যথা থাকলেও তাদের সবচেয়ে বড় চিন্তা, নির্বাচন হবে তো? কারা বা কোন দল নির্বাচিত হবে তার চেয়ে বড় আলোচনার বিষয়, নির্বাচন হবে তো? তারা চাচ্ছে একটি নির্বাচিত, স্বাভাবিক সরকার আসুক। যেনতেন একটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আসলেও সেই সরকারকে স্বাগত জানাবে। মনে হয় যেনতেন একটা নির্বাচন হলে তাদের সমস্ত মুশকিল আসান হয়ে যাবে!
কিন্তু তারপর? মানুষ ১২ ফেব্রুয়ারির পর যে স্বাভাবিক জীবনের স্বপ্ন দেখছে তার পূরণ হবে কি? পরবর্তী সরকার কী সহসাই সবকিছু স্বাভাবিক করে তুলতে পারবে? সচেতন মানুষ মাত্র জানেন, শুধু অর্থনৈতিক নয়, প্রশাসনিক ও সামাজিক বিরাট এক চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে আগামী সরকারের জন্য।
মনে রাখতে হবে, ইউনূস সরকারের যাবতীয় অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা, অর্থনৈতিক চাপ মানুষ সহ্য করলেও নির্বাচিত সরকারেরটা করবে না। কেন করবে না তার বহু কারণ। প্রথম কারণটি হল, সারাদেশের মানুষ ইউনূস সরকারকে আপদকালীন সরকার বলে ধরে নিয়েছিল। কবে নির্বাচিত সরকার আসবে তা প্রথম কয়েক মাস বোঝা না গেলেও পরে দেশবাসী বুঝতে পারে যে নির্বাচন একটি আসছে। কিন্তু পরবর্তী সরকারের মেয়াদটি হবে ধরে নিলাম ৪ বছরের(সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী)। এই দীর্ঘ সময় মানুষ দম বন্ধ করে কিছু সহ্য করতে চাইবে না। দ্বিতীয়ত তাদের পেছনে মদদ জোগাবে সরকারের সব প্রতিপক্ষ। তখন কি দেশে শান্তি ফিরে আসার অবস্থা থাকবে?
নির্বাচিত সরকারকে বলা হয় গণতান্ত্রিক সরকার। পরবর্তী নির্বাচিত সরকার ইচ্ছা করলেই ব্যবসায়িদের আমদানি রপ্তানি বন্ধ করে রাখতে পারবে না। বাণিজ্য একজন মানুষের সাংবিধানিক অধিকার। সেই অধিকার নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে এমনকি বিদেশি রপ্তানিকারকরাও সরকারকে ‘নিপীড়নমূলক সরকার’ আখ্যা দিয়ে দিবে। আর যখনই আমদানি বাড়বে তখনই দেশ থেকে বৈদেশিক মুদ্রা বের হতে থাকবে। ফলে ডলার পাউন্ডের দাম আর নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে না।
ব্যাংকের সুদহার বেশি হওয়ায় বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে। সরকারের কাছে উপায় কী সুদহার কমানোর তা অর্থনীতিবিদরা ভালো বলতে পারবেন। তবে সাধারণ জ্ঞানে বুঝতে পারি, সেটি সহসা সম্ভব নয়। অনেক কারণের মধ্যে একটি হল উচ্চমূল্যস্ফীতিতে সঞ্চয়কারীদের মূলধন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাই আমানতকারীদের ধরে রাখতে ব্যাংকের উচ্চ সুদ আর কমানো যায় না। আমানতকারীরা নিরুৎসাহিত হলে ব্যাংকগুলো তারল্য সংকটে পড়বে। অন্যদিকে উচ্চ সুদহার থাকলে বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হয়। বিনিয়োগ না হলে নতুন কর্মসংস্থান থমকে যায়। এটি একধরনের চেইন সমস্যা। কীভাবে সামলাবে পরবর্তী সরকার?
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও পরবর্তী সরকারকে নতুন করে ঝালাই করতে হবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক, তৈরি হবে যুক্তরাষ্ট্র, চিন, পাকিস্তান, সৌদি আরব, তুরস্কের মত দেশগুলির সঙ্গে নতুন হিসাব নিকাশ। বিশ্ব পরিস্থিতি যা, তাতে কূটনৈতিক সম্পর্কে ভারসাম্য বজায় রাখা এক দুরূহ কাজ হয়ে দাঁড়াবে। তবুও দেখা যাক নির্বাচন হয় কিনা, হলে স্বচ্ছ হয় কিনা। সেটা হলেও পরবর্তী সরকার শপথ গ্রহণ করে কোন পথে নিয়ে যেতে চেষ্টা করে দেশকে।
দ্বিতীয় বিষয়টি প্রশাসনিক। বাংলাদেশে প্রশাসনের পোস্টিং প্রমোশন নিয়ে রয়েছে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার নিজেদের মত করে প্রশাসন সাজিয়েছে। চিরাচরিত নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী সরকার চাইবে নিজেদের মত করে প্রশাসন সাজাতে। ধরা যাক একটি জেলায় বর্তমান সরকার একজন জেলা প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছেন। পরবর্তী সরকার এসে তাকে সরিয়ে নিজেদের অনুগত বা বিশ্বস্ত একজনকে সেখানে বসিয়ে বর্তমানের জেলা প্রশাসককে উপ-সচিব হিসাবে মন্ত্রণালয়ে ফিরিয়ে আনল। এই ক্ষেত্রে তৈরি হবে অসন্তোষ। এই প্রক্রিয়ায় সরকার ১০ জন নিজের পছন্দের লোককে পোস্টিং করতে গিয়ে ৯০ জনের অসন্তোষের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
এজন্যই বলি, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সরকারগুলো এক ধরনের বোকা। তারা বরাবরই দলীয় স্বল্পসংখ্যক মানুষের স্বার্থ দেখতে গিয়ে বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে প্রতিপক্ষের দিকে ঠেলে দেয়। দ্বিতীয়ত, দুর্নীতিমুক্ত আমলাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা না গেলে সরকার সাধারণ মানুষের কাছে হেয় প্রতিপন্ন হবে অচিরেই। অথচ যে দুর্নীতির সংস্কৃতি চালু আছে তা থেকে বে হওয়া অন্তত বাংলাদেশের কোনো সরকারের দ্বারা সম্ভব নয়।
দেশে বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখা এক অসম্ভব কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পারবে পরবর্তী সরকার বাজারের সিন্ডিকেট ভাঙতে? যারাই ক্ষমতায় আসুক, তাদের জন্য এটা যে প্রায় অসম্ভব তা আমরা অনুমান করতে পারি।
আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলা সরকারের জন্য আরো একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে নিশ্চিত। ২০২৪ এর আন্দোলনের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে। এমনকি নিজেদের গায়ে গুলি রিসিভ করেও তারা অপরাধীর গায়ে গুলি ছুড়তে পারছে না। নতুন সরকার এসে কঠোর হতে পারবে না শেখ হাসিনা সরকারের পরিণতির কথা ভেবে। অথচ বাংলাদেশের মত একটি অপরাধপ্রবণ দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ক্ষেত্রবিশেষ কঠোর হওয়ার কোনো বিকল্প নাই। জটিল হিসাবে সাধারণ মানুষ যাবে না। তারা পরবর্তী সরকারের কাছে নিশ্চিন্তে রাস্তায় চলার নিশ্চয়তা চাইবে, চাঁদাবাজহীন ব্যবসা চাইবে। কাজটি কতটা কঠিন পরের সরকারের জন্য তা এখন চিন্তা করতেও কষ্ট হয়।
ড. ইউনূস সরকারের পে কমিশন নতুন পে স্কেলের চূড়ান্ত সুপারিশ জমা দিয়েছে ২১ জানুয়ারি, ২০২৫। বলা যায় গলায় ঘণ্টা বেঁধে দিয়ে গেল। সরকারি কর্মচারী কর্মকর্তাদের দীর্ঘদিনের দাবি এই পে স্কেল। এটি চূড়ান্ত হলে আগামী জুলাই মাস থেকে সরকারকে বাড়তি প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকা গুণতে হবে। এই পে স্কেলের ব্যত্যয় ঘটানোর উপায় থাকবে না পরবর্তী সরকারের জন্য। ২৪ লাখ সরকারি কর্মচারীকে অসন্তোষের মধ্যে রেখে সরকার পরিচালনা দুরূহ হয়ে পড়বে। আবার পে কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে গেলে যে অর্থের প্রয়োজন হবে তা জোগাতে হিমশিম খেতে হবে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও পরবর্তী সরকারকে নতুন করে ঝালাই করতে হবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক, তৈরি হবে যুক্তরাষ্ট্র, চিন, পাকিস্তান, সৌদি আরব, তুরস্কের মত দেশগুলির সঙ্গে নতুন হিসাব নিকাশ। বিশ্ব পরিস্থিতি যা, তাতে কূটনৈতিক সম্পর্কে ভারসাম্য বজায় রাখা এক দুরূহ কাজ হয়ে দাঁড়াবে। তবুও দেখা যাক নির্বাচন হয় কিনা, হলে স্বচ্ছ হয় কিনা। সেটা হলেও পরবর্তী সরকার শপথ গ্রহণ করে কোন পথে নিয়ে যেতে চেষ্টা করে দেশকে।
লেখক: সাংবাদিক, আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক।
এইচআর/জেআইএম