আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি শুরু হতে যাচ্ছে আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দশম আসর। ইউরোপ, আমেরিকা ও আফ্রিকার অনেক দেশে ক্রিকেট তুলনামূলকভাবে কম জনপ্রিয় হলেও, ব্রিটিশ সাম্রাজ্য থেকে বেরিয়ে আসা দেশগুলোতে ক্রিকেট বেশ জনপ্রিয়। বিশেষ করে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল কয়েকটি দেশে খেলাটি রীতিমতো আবেগের বিষয়।
আসন্ন আসরটি যৌথভাবে আয়োজত করতে যাচ্ছে ভারত ও শ্রীলঙ্কা। যেখানে অংশ নিতে যাচ্ছে ২০টি দল। এর মধ্যে রয়েছে ১৪৫ কোটি জনসংখ্যার ভারত ২৪ কোটির পাকিস্তান ও প্রায় ২০ কোটি জনসংখ্যার বাংলাদেশ। এসকল দেশে দেশে ক্রিকেট প্রায় ধর্মের মতোই দেখা হয়।
এছাড়াও অংশ নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, নেদারল্যান্ডস, নামিবিয়া, অস্ট্রেলিয়া, শ্রীলঙ্কা, আয়ারল্যান্ড, জিম্বাবুয়ে, ওমান, ইংল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, নেপাল, ইতালি, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, কানাডা, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও আফগানিস্তান।
এই অঞ্চলে প্রায়ই ক্রিকেটের ওপর রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব পড়ে। কেননা, দেশগুলোতে ক্রিকেটকে জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক হিসেবেও দেখা হয়। বিশেষ করে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশকে ঘিরে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একাধিক ঘটনায় ক্রিকেট জাতীয় বিরোধের মঞ্চে পরিণত হয়েছে। এবারের বিশ্বকাপ শুরুর আগেও তেমনই এক নতুন সংকট দেখা দিয়েছে। বেশিরভাগই তা ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে হয়ে থাকলেও এবার তা বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে।
২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনে বাংলাদেশে শেখ হাসিনার সরকারের পতন হলে এই রাজনৈতিক উত্তেজনার পটভূমি তৈরি হয়। দেশ ছেড়ে তিনি আশ্রয় নেন ভারতে। পরে গেল বছরের নভেম্বরে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এই ঘটনার পর থেকেই বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকে।
এসবের মাঝেই ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিসিআই) এক নজিরবিহীন সিদ্ধান্তে পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে হয়ে যায়। উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের আন্দোলনের মুখে ‘নিরাপত্তাজনিত কারণ’ দেখিয়ে আইপিএলে কলকাতা নাইট রাইডার্সের স্কোয়াড থেকে বাদ দেওয়া হয় মোস্তাফিজুর রহমানকে। তবে আইপিএল কিংবা ফ্র্যাঞ্চাইজিটি থেকে স্পষ্ট করা হয়নি, কী ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে তাকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার ঘটনায় অসন্তোষ দেখা দেয় বাংলাদেশের ক্রিকেটাঙ্গনে। প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশ ক্রিকেট (বিসিবি) বোর্ড জানায়, যদি একজন (মোস্তাফিজুর রহমান) খেলোয়াড়ের নিরাপত্তা ভারত দিতে না পারে তাহলে পুরো দল, সাংবাদিক ও দর্শকরাও ঝুঁকির মধ্যেই থাকবে। সে কারণে ভারতে মাটিতে বিশ্বকাপ না খেলার সিদ্ধান্ত নিয়ে চিঠি পাঠায় আইসিসিতে। সহ-আয়োজক শ্রীলঙ্কায় খেলার দাবিও জানানো হয় সেই চিঠিতে। তবে আইসিসি সেই প্রস্তাব নাকচ করে দেয়।
আইসিসি বিসিবির প্রস্তাব নাকচ করে দেওয়ায় বাংলাদেশের এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলা হচ্ছে না বললেই চলে। আইসিসির সিদ্ধান্তের পর বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল বলেন, ‘আমরা আইসিসির সঙ্গে যোগাযোগ চালিয়ে যাব। আমরা বিশ্বকাপে খেলতে চাই, কিন্তু ভারতে গিয়ে খেলব না। এই সিদ্ধান্তে আমরা অনড়।’
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল অভিযোগ করেন, আইসিসি মাত্র ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়ে বাংলাদেশকে সিদ্ধান্ত মেনে নিতে বলেছে। তিনি বলেন, ‘এভাবে কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা ২৪ ঘণ্টার সময় বেঁধে দিতে পারে না। আমাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই।’
তিনি ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডকে সরকারের ‘একটি সম্প্রসারিত বাহু’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘যখন তারা একজন খেলোয়াড়ের নিরাপত্তাই নিশ্চিত করতে পারে না, তখন পুরো বাংলাদেশ দল, সাংবাদিক ও দর্শকদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা কীভাবে দেবে?।’
বাংলাদেশ শুধু কূটনৈতিক প্রতিবাদ করেই থেমে থাকেনি। ইতোমধ্যে নিষিদ্ধ করা হয়েছে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) টিভি সম্প্রচার। ফলে প্রায় ২০ কোটি দর্শক হারিয়েছে টুর্নামেন্টটি। পাশাপাশি বিশ্বকাপের ক্ষেত্রেও এই নিষেধাজ্ঞা বাড়ানোর হুমকি দিয়েছে বাংলাদেশ।
শেষ পর্যন্ত যদি বাংলাদেশ বিশ্বকাপে অংশ না নেয়, তাহলে তাদের জায়গায় স্কটল্যান্ড সুযোগ পাবে। তবে দর্শকসংখ্যা ও বাজারমূল্যের দিক থেকে স্কটল্যান্ড বাংলাদেশের সমান নয়। তাছাড়া স্কটল্যান্ডে বিশ্বকাপ আয়োজন হলে তা দেশটির জনপ্রিয় সিক্স নেশনস রাগবি টুর্নামেন্টের সঙ্গে সময়সূচির সংঘাতে পড়বে, যা নতুন জটিলতা তৈরি করতে পারে।
আইএন