ধর্ম

আল্লামা শিবলী নোমানীর (রহ.) বৈপ্লবিক চিন্তা ও প্রভাব

মুফতি ইফতেখারুল হক হাসনাইন

উনিশ শতকের শেষভাগে উপমহাদেশের মুসলমানরা এক কঠিন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছিল। রাজনৈতিক ক্ষমতা হারানোর পর তারা নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়: একদিকে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রবল চাপ, অন্যদিকে পুরনো মাদ্রাসাভিত্তিক জ্ঞানব্যবস্থার ভাঙন। এই দ্বিমুখী সংকটের ভেতর কিছু আলেম চেষ্টা করেছিলেন ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মধ্যে সেতুবন্ধন গড়ে তুলতে। তাদের মধ্যে আল্লামা শিবলী নোমানী এক উজ্জ্বল নাম।

শিবলী নোমানী জন্মগ্রহণ করেন ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে, আজমগড় জেলার বন্দৌল গ্রামে। তিনি শিওরাজ সিং-এর বংশধর ছিলেন যিনি পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করে সিরাজ উদ্দিন নাম ধারণ করেন। তার বংশধররা রোতারাহ নামে পরিচিতি লাভ করে। তার বাবা হাবিবুল্লাহ একজন জমিদার ও উকিল ছিলেন।

ছয় বছর বয়সে গ্রামের পাঠশালায় তার শিক্ষার হাতেখড়ি হয়। কোরআন ও ফার্সি কিতাব পড়ার পর তিনি জৌনপুরের মাদ্রাসায়ে হানাফিয়ায় কিছুদিন পড়াশোনা করেছেন। এরপর তিনি ভর্তি হন আজমগড় শহরের পূর্ব দিকে ঘুসি নামক গ্রামে অবস্থিত মাদ্রাসা নাসেরুল উলুমে। এখানে পড়াশোনার সমাপ্তির পর তার বাবা তাকে মাদ্রাসা চশমায়ে রহমত, গাজীপুরে পাঠিয়ে দেন। পরবর্তীতে তার বাবা ও অন্যান্য প্রভাবশালী ব্যক্তির সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত হয় মাদ্রাসায়ে আরাবিয়া আজমগড়। তিনি এই মাদ্রাসায় চলে আসেন। এই মাদ্রাসায় শিক্ষাকালীন সময়ে তিনি গবেষণায় মনোযোগ দেন এবং ফার্সি ভাষা ও সাহিত্যে ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। এরপর তিনি রামপুর সফর করেন এবং এরশাদ হোসেন মুজাদ্দেদির কাছে ফিকহ ও উসুলে ফিকহের শিক্ষা অর্জন করেন। এরপর তিনি লাহোর গমন করে ওরিয়েন্টাল কলেজের অধ্যাপক ফয়জুল হাসান সাহারানপুরির কাছে আরবি সাহিত্যে ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। সর্বশেষ তিনি আহমদ আলী সাহারানপুরির নিকট হাদিস অধ্যয়ন করেছেন।

শিবলী নোমানীর (রহ.) চিন্তায় এক বৈপ্লবিক মোড় আসে তাঁর মধ্যপ্রাচ্য সফরের মাধ্যমে। মিসরে অবস্থানকালে তিনি আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থা, পাঠপদ্ধতি এবং গবেষণামুখী সংস্কৃতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। এই অভিজ্ঞতা তাঁর মধ্যে মুসলিম শিক্ষা সংস্কারের একটি সুসংহত ধারণা গড়ে তোলে, যা পরবর্তীতে তাঁর লেখালেখি ও একাডেমি প্রতিষ্ঠার কর্মকাণ্ডে প্রতিফলিত হয়। (মাকালাতে শিবলী, সফরনামায়ে রূম ওয়া মিসর)

উপমহাদেশে ইসলামের ইতিহাসচর্চাকে আধুনিক গবেষণাপদ্ধতির সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে শিবলী নোমানীর (রহ.) অবদান অনস্বীকার্য। তার রচিত সিরাতুন নোমান ইমাম আবু হানিফার (রহ.) জীবনীকে কেবল প্রশংসামূলক বর্ণনায় সীমাবদ্ধ না রেখে ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ ও সূত্রনির্ভর আলোচনার পর্যায়ে উন্নীত করেছে। একইভাবে আল-ফারুক গ্রন্থে হজরত ওমরের (রা.) শাসনব্যবস্থাকে আধুনিক প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

এই গ্রন্থগুলোতে শিবলী নোমানী (রহ.) আরবি মূল উৎস— যেমন তাবারি, ইবন সা‘দ ও বালাযুরির রচনার ওপর নির্ভর করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি উপমহাদেশীয় পাঠকদের সামনে ইসলামের ইতিহাসচর্চায় একটি নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেন।

শিবলী নোমানীর (রহ.) সবচেয়ে স্থায়ী ও গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো আজমগড়ে দারুল মুসান্নিফিন (শিবলী একাডেমি) প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা। যদিও তার ইন্তেকালের পর প্রতিষ্ঠানটি পূর্ণতা লাভ করে, তবুও এর রূপরেখা ও উদ্দেশ্য ছিল তারই চিন্তার ফসল। তার শিষ্য সৈয়দ সুলায়মান নদভী (রহ.) এই উদ্যোগকে বাস্তব রূপ দেন এবং উপমহাদেশে গবেষণাধর্মী ইসলামি রচনার একটি শক্ত ভিত্তি গড়ে তোলেন। (হায়াতে শিবলী, সুলাইমান নদভী)

আল্লামা শিবলী নোমানী (রহ.) ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে ইন্তেকাল করেন। তার জীবনকাল তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত হলেও প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী ও দীর্ঘস্থায়ী। তিনি উপমহাদেশের মুসলিম চিন্তায় একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন, যেখানে ঐতিহ্যের প্রতি আনুগত্য ও আধুনিক গবেষণার শৃঙ্খলা একে অপরের বিরোধী নয়, বরং পরিপূরক।

ওএফএফ