সরকারি পেট্রোলিয়াম জ্বালানি খাতের সংস্কার শুরু করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী দেশে পেট্রোলিয়াম জ্বালানি আমদানি, পরিশোধন ও বিপণন নিয়ন্ত্রণকারী রাষ্ট্রীয় সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) আট প্রতিষ্ঠানকে কমিয়ে পাঁচটিতে নামানো হচ্ছে।
সূত্র জানায়, বিপিসির আট প্রতিষ্ঠানকে কাজের ধরন অনুযায়ী পাঁচটি কোম্পানিতে পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ নিতে গত ১১ জানুয়ারি বিপিসির চেয়ারম্যানকে চিঠি দিয়েছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। বিভাগের কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স-৩ শাখার উপ-সচিব মো. আহসান উদদিন মুরাদ স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়- বিপিসি ও এর আওতাধীন কোম্পানিগুলোর জনবল ও কর্মপরিধি যৌক্তিকীকরণ, সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাস ও প্রয়োজনীয় অন্য সংস্কারের লক্ষ্যে ২০২৫ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি গত ৮ ডিসেম্বর বিপিসি ও এর আওতাধীন কোম্পানিগুলোর সংস্কার সংক্রান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়।
এরপর গত ১০ ডিসেম্বর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টার সভাপতিত্বে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় কমিটির সুপারিশ আলোচনা করে বিপিসির আটটি কোম্পানিকে পাঁচটিতে কমিয়ে আনার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়।
সরকারের সংস্কার কর্মসূচিতে জ্বালানি বিভাগের সংস্কারের অংশ হিসেবে বিপিসির আট প্রতিষ্ঠানকে পাঁচটিকে কমিয়ে আনার বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ নিয়ে জ্বালানি বিভাগ থেকে আমরা একটি চিঠি পেয়েছি। এর মধ্যে তিন বিপণন কোম্পানিকে একীভূত করে দুটি করতে বলা হয়েছে।- বিপিসির সচিব শাহিনা সুলতানা
ওই চিঠির ভাষ্য অনুযায়ী- বিপিসি ও এর আওতাধীন কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম গতিশীল করার লক্ষ্যে বিদ্যমান সিস্টেম একীভূত করে বিপিসির আওতাধীন কোম্পানিগুলোকে ডাউনসাইজ করতে হবে। বিপিসি ও এর আওতাধীন কোম্পানিগুলোতে নতুন কোনো পদ সৃষ্টি কিংবা বিদ্যমান কোনো পদ বিলুপ্ত করা যাবে না, এছাড়া কোনো পদ উন্নীত করা যাবে না। বিপিসির আওতাধীন বিদ্যমান আটটি কোম্পানিকে কাজের ধরন অনুযায়ী পাঁচটি কোম্পানিতে পুনর্বিন্যাস করতে হবে।
বিপিসির নিয়ন্ত্রণে নিজস্ব সম্পূর্ণ মালিকানা ও অংশীদারত্বে আটটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- শতভাগ মালিকানার ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসি (ইআরএল), এলপি গ্যাস লিমিটেড (এলপিজিএল), ইস্টার্ন লুব্রিকেন্টস ব্লেন্ডার্স পিএলসি (ইএলবিএল), পেট্রোলিয়াম ট্রান্সমিশন কোম্পানি পিএলসি (পিটিসিপিএলসি), যৌথ অংশীদারে পদ্মা অয়েল কোম্পানি পিএলসি, মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড, যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড এবং ৫০ শতাংশের অংশীদারি প্রতিষ্ঠান স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল কোম্পানি লিমিটেড (এসএওসিএল)।
আরও পড়ুনজাহাজ থেকে ট্যাংকে যেতেই উধাও ১৪ কোটি টাকার জ্বালানি তেল১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারে কার ভাগে কত টাকা?২০৭০ কোটি টাকার আমানত নিয়ে ‘বেকায়দায়’ বিপিসিফার্নেস অয়েল নিয়ে বেকায়দায় বিপিসিঅভিজ্ঞতা নেই, তবুও ১৫ বছর এসপিএম অপারেশনে আগ্রহী শিপিং করপোরেশনকুমিল্লায় দেশের প্রথম স্বয়ংক্রিয় জ্বালানি বিপণন ডিপো বিপিসির
মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ইএলবিএল ও এসএওসিএলের বেসরকারি খাতের ৫০ শতাংশ শেয়ার কিনে কোম্পানি দুটিকে ইআরএলের সঙ্গে একীভূত করতে হবে। পাশাপাশি তিন বিপণন কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা, যমুনাকে একীভূত করে দুটি কোম্পানি গঠন করতে হবে।
সুপারিশ অনুযায়ী, বিপিসির দুই অঙ্গ প্রতিষ্ঠান যমুনা অয়েল কোম্পানি ও মেঘনা পেট্রোলিয়াম একীভূত হয়ে একটি প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলে জানা যায়।
বিপিসি ও অঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলোর বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয় জাগো নিউজের। একীভূত হওয়ার বিষয়ে বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা কথা বলতে রাজি হননি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, ‘বিপিসির প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বিপণন প্রতিষ্ঠানগুলোতে অপারেশনাল লাভের চেয়ে নন-অপারেশনাল খাতের আয়ের মাধ্যমে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা লাভ করছে। শ্রম আইনের দুর্বলতার সুযোগ কাজে লাগিয়ে সরকারি টাকায় ব্যাংকে স্থায়ী আমানত রেখে তা থেকে আয়ের টাকা ভাগাভাগি করা হচ্ছে।
ইআরএল শতভাগ রিফাইনারি, ইএলবিএল ও এসএওসিএল ব্লেন্ডিং প্ল্যান্টনির্ভর কোম্পানি হলেও ওই দুই প্রতিষ্ঠানকে কোনো নিয়ম-নীতিমালা না মেনে বিপণন প্রতিষ্ঠান বানানো হয়েছে। এখন সংস্কার কমিশন বিষয়টিগুলোর প্রতি দৃষ্টি দিয়েছেন। ইএলবিএল ও এসএওসিএল ইস্টার্ন রিফাইনারির সঙ্গে একীভূত হলে প্রতিষ্ঠান দুটির জনবলের চাকরির নিশ্চয়তা ও সুবিধা বাড়বে। আবার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যয়ও কমে আসবে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক কর্মকর্তা বলেন, ‘এসএওসিএলে দীর্ঘদিন বিপিসির নিয়ন্ত্রণ ছিল না। ৫০ শতাংশ-৫০ শতাংশ অংশীদার হওয়ার সুযোগে বাকি অর্ধেকের মালিক-পরিচালকরা বিপিসিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাতেন। ২০২০ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটিতে শত শত কোটি টাকা দুর্নীতি-আত্মসাৎ হয়েছে। ইতোমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক, কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি মামলাও করেছেন। এটি বেসরকারি অংশ কিনে সরকারি অংশ করার সিদ্ধান্ত ইতিবাচক। এতে দুর্নীতি কমে আসবে, স্বচ্ছতা বাড়বে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিপিসির সচিব সরকারের উপ-সচিব শাহিনা সুলতানা জাগো নিউজকে বলেন, ‘সরকারের সংস্কার কর্মসূচিতে জ্বালানি বিভাগের সংস্কারের অংশ হিসেবে বিপিসির আট প্রতিষ্ঠানকে পাঁচটিকে কমিয়ে আনার বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ নিয়ে জ্বালানি বিভাগ থেকে আমরা একটি চিঠি পেয়েছি। এর মধ্যে তিন বিপণন কোম্পানিকে একীভূত করে দুটি করতে বলা হয়েছে। কোন দুটিকে একীভূত করা হবে সে বিষয়ে পরিষ্কারভাবে কিছু বলা হয়নি।’
তিনি বলেন, ‘প্রতিষ্ঠান একীভূত করার বিষয়গুলো দীর্ঘ প্রক্রিয়া। কীভাবে প্রতিষ্ঠানগুলো একীভূত করা হবে, সে বিষয়ে আরও আলাপ-আলোচনা হবে। এতে অনেক সময়ের প্রয়োজন।’
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংশ্লিষ্ট আরেক কর্মকর্তা জাগো নিউজকে বলেন, ‘পদ্মা-মেঘনা-যমুনাকে একীভূত করে দুটি প্রতিষ্ঠান করার কথা বললেও মূলত মেঘনা-যমুনাকে একীভূত করার বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে এসব একীভূতকরণ প্রক্রিয়া খুবই জটিল।’
এমডিআইএইচ/এএসএ/জেআইএম