‘যদি তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয় সেটা কি আসলেই যৌক্তিক কোনো রায় হয়েছে বলে আপনারা মনে করেন? আমি তো মনে করি না। কারণ আমি আমার সন্তান হারাইছি। সব প্রমাণ সাবমিট করার পরও যদি তার (আসামির) তিন বছরের রায় হয়, ভবিষ্যতে মানুষ আরও ইয়া হবে, যে কী হবে? মারবো, তিন বছরের সাজা হবে, তারপর শেষ।’
জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালে রাজধানীর চানখাঁরপুলে ছয়জনকে হত্যার অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সোমবার (২৬ জানুয়ারি) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে রায় ঘোষণার পর এক প্রতিক্রিয়ায় এসব কথা বলেন নিহত শাহরিয়ার খান আনাসের মা সানজিদা খান দিপ্তী।
তিনি কান্নায় ভেঙে পড়ে আরও বলেন, ‘আর যারা নাই (পলাতক তিন আসামি) তাদের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। যারা আছে তাদের তিন বছরের সাজা। আমি এই রায়কে কোনো কিছু মনে করি না। এই সাজাতে আমাদের শহীদ পরিবারের সঙ্গে বৈষম্য করা হয়েছে।’
এই মা অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তী সরকার থাকা অবস্থায়ও তারা ইনসাফ পাননি। তাদের জীবনের কোনো নিরাপত্তাও নেই।
শিক্ষার্থী আনাসের মা সানজিদার মতো অন্য নিহতদের স্বজনরাও এ রায় নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তারা বলেন, চানখাঁরপুলে শুয়ে-বসে টার্গেট শ্যুট করে হত্যাযজ্ঞ চালানো আসামি কনস্টেবল মো. সুজন হোসেনকে মাত্র তিন বছরের সাজা দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। এ মামলায় কমান্ড রেসপন্সিবিলিটি দেখিয়ে সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তা তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড দিলেও সরাসরি হত্যাযজ্ঞ চালানো সুজনের মতো একাধিক পুলিশ সদস্যকে মাত্র তিন থেকে চার বছরের সাজা দেওয়া হয়েছে। এখানে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত তিন আসামিই পলাতক।
আনাসের বাবা সাহরিয়া খান তাদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ‘প্রকাশ্যে সারা বাংলাদেশের মানুষ দেখা সত্ত্বেও একজন খুনিকে সাধারণ তিন বছরের সাজা দেওয়া হয়েছে, যেখানে বছর হয় আইনি অনুযায়ী নয় মাসে। তো এখন আপনারাই বলেন যে এটা কি কোনো সাজা হলো?’
আনাসের নানা বলেন, ‘আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাই। এই রায়কে আমরা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করছি।’
নিহত মো. ইয়াকুবের মা রহিমা আক্তার ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, ‘এটা তো কোনো রায়ই হয়নি। তিন বছর পর ওরা বাইর হয়ে যাবে। তাদের তো সাহস বাইরা গেছে। তখন আমরাই তো নিজের জান লইয়া ঘুরতে পারবো না।’
গণঅভ্যুত্থানের সময় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট চানখাঁরপুল এলাকায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আজ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল রায় ঘোষণা করেন। প্যানেলের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার রায় পড়ে শোনান। রায়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী ও রমনা অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপ-কমিশনার শাহ আলম মো. আখতারুল ইসলামকে মৃত্যুদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল। সেই সঙ্গে তিন আসামির সম্পদ জব্দের আদেশ দেওয়া হয়।
এছাড়া ডিএমপির রমনা অঞ্চলের সাবেক সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ ইমরুলকে ছয় বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে শাহবাগ থানার সাবেক পরিদর্শক মো. আরশাদ হোসেনকে চার এবং সাবেক কনস্টেবল মো. সুজন হোসেন, ইমাজ হোসেন ও মো. নাসিরুল ইসলামকে তিন বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
মামলার আসামিদের মধ্যে চারজন পলাতক। তারা হলেন হাবিবুর, সুদীপ, আখতারুল ও ইমরুল। গ্রেফতার আছেন আরশাদ, সুজন, ইমাজ ও নাসিরুল।
চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে রায় ঘোষণা সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। এর আগে গ্রেফতার আসামিদের কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
এফএইচ/একিউএফ