আইন-আদালত

মাকে লেখা আনাসের চিঠি: ‘স্বার্থপরের মতো ঘরে বসে থাকতে পারলাম না’

আওয়ামী লীগ সরকার পতনের এক দফা দাবিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ছিল ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। ওই কর্মসূচিতে সেদিনই আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। সেদিন এ কর্মসূচি সফল করতে রাজপথে থাকা ছয় আন্দোলনকারীকে রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকায় গুলি করে হত্যা করা হয়। এই ছয় শহীদের একজন হলো শাহরিয়ার খান আনাস। তখন তার বয়স ছিল ১৬ বছর ৯ মাস।

রাজধানীর গেন্ডারিয়ার আদর্শ একাডেমিতে বিজ্ঞান বিভাগের দশম শ্রেণিতে পড়ত আনাস। সে ভবিষ্যতে ইঞ্জিনিয়ার হতে চেয়েছিল। ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে যোগ দিতে সেদিন সকালে কাউকে কিছু না বলে গেন্ডারিয়ার বাসা থেকে বের হয় আনাস। বের হওয়ার আগে সে একটি চিঠি লিখে রেখে গিয়েছিল।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালে চানখাঁরপুলে ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বিচারে প্রমাণ হিসেবে আনাসের লেখা চিঠিটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ উপস্থাপন করে প্রসিকিউশন (রাষ্ট্রপক্ষ)। এ মামলার সোমবার (২৬ জানুয়ারি) রায় ঘোষণা করা হয়েছে।

আনাস তার চিঠিতে লিখেছিল, ‘মা, আমি মিছিলে যাচ্ছি। আমি নিজেকে আর আটকিয়ে রাখতে পারলাম না। সরি আব্বুজান। তোমার কথা অমান্য করে বের হলাম। স্বার্থপরের মতো ঘরে বসে থাকতে পারলাম না। আমাদের ভায়েরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কাফনের কাপড় মাথায় বেঁধে রাজপথে নেমে সংগ্রাম করে যাচ্ছে। অকাতরে নিজেদের জীবন বিসর্জন দিচ্ছে। একটি প্রতিবন্ধী কিশোর, ৭ বছরের বাচ্চা, ল্যাংড়া মানুষ যদি সংগ্রামে নামতে পারে, তাহলে আমি কেন বসে থাকবো। একদিন তো মরতে হবেই।’

আনাস তার চিঠিতে আরও লিখেছিল, ‘তাই মৃত্যুর ভয় করে স্বার্থপরের মতো ঘরে বসে না থেকে সংগ্রামে নেমে গুলি খেয়ে বীরের মতো মৃত্যুও অধিক শ্রেষ্ঠ। যে অন্যের জন্য নিজের জীবন বিলিয়ে দেয় সেই প্রকৃত মানুষ। আমি যদি বেঁচে না ফিরি তবে কষ্ট না পেয়ে গর্বিত হয়ো। জীবনের প্রতিটি ভুলের জন্য ক্ষমা চাই। আনাস।’

আনাস ছাড়াও সেদিন (২০২৪ সালের ৫ আগস্ট) চানখাঁরপুলে পুলিশের গুলিতে শহীদ হয়েছিল শেখ মাহদি হাসান জুনায়েদ, মো. ইয়াকুব, মো. রাকিব হাওলাদার, মো. ইসমামুল হক ও মানিক মিয়া শাহরিক।

এদিন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে রায় ঘোষণা করা হয়। ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ সোমবার (২৬ জানুয়ারি) এই রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার রায় পড়ে শোনান। রায়ে ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী ও রমনা অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপ-কমিশনার শাহ্ আলম মো. আখতারুল ইসলামকে মৃত্যুদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল। এই তিন আসামির সম্পদ জব্দের আদেশও দেওয়া হয়েছে রায়ে।

রায়ে ডিএমপির রমনা অঞ্চলের সাবেক সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ ইমরুলকে ছয় বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। শাহবাগ থানার সাবেক পরিদর্শক মো. আরশাদ হোসেনকে চার বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। সাবেক কনস্টেবল মো. সুজন হোসেন, ইমাজ হোসেন ও মো. নাসিরুল ইসলামকে তিন বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে রায়ে।

মামলার আসামিদের মধ্যে চারজন পলাতক। তারা হলেন হাবিবুর, সুদীপ, আখতারুল ও ইমরুল। গ্রেফতার আছেন আরশাদ, সুজন, ইমাজ ও নাসিরুল। চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর রায় সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। এর আগে গ্রেফতার হওয়া আসামিদের কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।

এফএইচ/এমআইএইচএস/