‘বাঁশ’ শুনলেই কি খাবারের কথা মনে আসে? বরং আমাদের ভাষায় ‘বাঁশ খাওয়া’ মানেই বিপদে পড়া। অথচ সেই বাঁশই পুষ্টিবিদদের চোখে হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য আশীর্বাদ হয়ে উঠছে। বাঁশের গোড়ার ভেতরে লুকিয়ে থাকা কচি অংশ ‘কোঁড়’, যা বিশ্বজুড়ে পরিচিত ব্যাম্বু শুট নামে। সঠিকভাবে রান্না করলে হতে পারে হার্টের সবচেয়ে ভালো বন্ধু।
কম ক্যালোরি, বেশি ফাইবার, ক্ষতিকর কোলেস্টেরল কমানোর ক্ষমতা আর রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের গুণে ধীরে ধীরে ‘সুপারফুড’-এর তালিকায় জায়গা করে নিচ্ছে এই খাবার। তবে একটু ভুল হলেই উপকারের বদলে ডেকে আনতে পারে বিপদ। তাই বাঁশ খাওয়ার আগে জানা জরুরি তার গুণাগুণের সঙ্গে সঠিক রান্নার নিয়মও।
এশিয়ার বহু দেশে বহু শতাব্দী ধরেই কোঁড় খাওয়ার চল আছে। উত্তর-পূর্ব ভারত, পাহাড়ি অঞ্চল, চিন, জাপান, কোরিয়া সব জায়গাতেই এটি নিয়মিত রান্নাঘরের অংশ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, সঠিকভাবে রান্না করলে বাঁশের কোঁড় হতে পারে সত্যিকারের ‘সুপারফুড’। আবার সামান্য ভুলে এই খাবারই হয়ে উঠতে পারে বিপজ্জনক।
কেন হঠাৎ গুরুত্ব পাচ্ছে বাঁশের কোঁড়?ক্যামব্রিজের অ্যাংলিয়া রাস্কিন ইউনিভার্সিটির জনস্বাস্থ্য বিষয়ের অধ্যাপক লি স্মিথ সাম্প্রতিক গবেষণায় বাঁশের কোঁড়কে স্বাস্থ্যকর খাবার হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, দীর্ঘদিন ধরে এশিয়ায় বাঁশের কোঁড় খাওয়া হলেও, এখন বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের খাদ্যতালিকায় এটি জায়গা করে নেওয়ার যোগ্য। তবে শর্ত একটাই, সঠিক রান্না।
এই বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কলকাতার পুষ্টিবিদ অনন্যা ভৌমিক জানান, রান্নার নিয়ম না মানলে বাঁশের কোঁড় শরীরে ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।
আরও পড়ুন: মাসিক ও হরমোনের সমস্যায় সচেতনতা জরুরি শীতে চোখের সমস্যায় কখন বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হবেন? যাদের মসুর ডাল এড়িয়ে চলাই ভালো বাঁশের কোঁড়ের পুষ্টিগুণবাঁশের কোঁড়ে ক্যালোরির পরিমাণ খুবই কম। প্রতি ১০০ গ্রামে মাত্র ২৫–৩০ কিলোক্যালোরি। অথচ পুষ্টির দিক থেকে এটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এর মধ্যে রয়েছে-
উচ্চ মাত্রার ডায়েটারি ফাইবার উদ্ভিজ্জ প্রোটিন ভিটামিন বি কমপ্লেক্স ও ভিটামিন ই পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ও আয়রন শক্তিশালী অ্যান্টি-অক্সিড্যান্টএ ছাড়া এতে থাকে পলিফেনল, ফ্ল্যাভোনয়েড, ফেনোলিক অ্যাসিড ও ফাইটোস্টেরলের মতো বায়ো-অ্যাক্টিভ উপাদান, যা শরীরকে ভিতর থেকে সুরক্ষা দেয়। ফ্যাট প্রায় নেই বললেই চলে, তাই ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকা মানুষের জন্য এটি আদর্শ খাবার।
বাঁশ শরীরের যেসব উপকারে আসেহজম শক্তিশালী করে: কোঁড়ে থাকা ফাইবার অন্ত্রের কার্যক্ষমতা বাড়ায়। নিয়মিত খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য কমে, পেট পরিষ্কার থাকে এবং হজম সহজ হয়। এটি প্রিবায়োটিকের মতো কাজ করে, ফলে উপকারী অন্ত্রের ব্যাক্টেরিয়া সক্রিয় থাকে।
ওজন কমাতে সাহায্য করে: কম ক্যালোরি ও বেশি ফাইবারের কারণে কোঁড় দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখে। ফলে অপ্রয়োজনীয় খাবার খাওয়ার প্রবণতা কমে এবং ধীরে ধীরে ওজন নিয়ন্ত্রণে আসে।
হৃদ্যন্ত্র সুস্থ রাখে: কোঁড়ে থাকা পটাশিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। ক্ষতিকর কোলেস্টেরল ও ফ্যাট কম থাকায় হৃদ্যন্ত্রের উপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে না। নিয়মিত ও পরিমিত খেলে হার্টের স্বাস্থ্যে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখে: কোঁড়ের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স কম। ফলে এটি খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বেড়ে যায় না। ডায়াবিটিস রোগীরাও চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে এটি খেতে পারেন।
প্রদাহ কমাতে সহায়ক: অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট সমৃদ্ধ হওয়ায় কোঁড় শরীরের প্রদাহ ও অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমাতে সাহায্য করে। দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহজনিত সমস্যায় এটি উপকারী ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে সাবধান! কেন ভুল রান্নায় বিপদ?পুষ্টিবিদ অনন্যা ভৌমিক জানান, বাঁশের কোঁড়ে ট্যাক্সিফাইলিন নামের একটি যৌগ থাকে, যা শরীরে গিয়ে সায়ানাইড তৈরি করতে পারে। কাঁচা বা অর্ধসিদ্ধ কোঁড় খেলে দেখা দিতে পারে-
বমি ভাব জিভে তীব্র তেতো স্বাদ মাথা ধরা ও মাথাব্যথা পেটব্যথা শ্বাসকষ্ট নিম্ন রক্তচাপ ও দুর্বলতা এমনকি অতিরিক্ত পরিমাণে কাঁচা কোঁড় খেলে খিঁচুনি, ফুসফুসের ক্ষতি এমনকি হৃদ্যন্ত্র বিকল হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
বাঁশের কোঁড় খাওয়ার আগে অবশ্যই এই ধাপগুলি মানতে হবে-
কোঁড়ের খোসা সম্পূর্ণভাবে ছাড়াতে হবে, ছোট ছোট টুকরো করে কাটতে হবে, ভালো করে সেদ্ধ করতে হবে, সেদ্ধ করার পানি ফেলে দিতে হবে, এরপর সেই টুকরো রান্নায় ব্যবহার করা যাবে। অনেকে আবার সেদ্ধ করার পর কোঁড় কিছু সময় ভিজিয়ে রাখেন বা ফারমেন্ট করে নেন, এতে ক্ষতিকর উপাদান আরও কমে।
ভুল ধারণার কারণে যাকে আমরা ‘বিপদের প্রতীক’ ভাবি, সেই বাঁশের কোঁড়ই হতে পারে সুস্থ জীবনের সহায়ক। সামান্য সচেতনতা আর সঠিক রান্নার নিয়ম মেনে চললে এই খাবার নিঃসন্দেহে জায়গা করে নিতে পারে স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকায়, একেবারে ‘সুপারফুড’ হিসেবে।
তথ্যসূত্র: হেলথলাইন, ইউরেন, আনন্দবাজার
জেএস/