ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পোস্টারবিহীন হওয়ায় ভরা মৌসুমেও তাদের মুখে হতাশার ছাপ। বিগত দিনগুলোতে এমন সময় ছাপাখানায় নির্ঘুম রাত পার করতে দেখা গেছে মালিক শ্রমিকদের। কিন্তু এবার ঘটেছে তার ব্যতিক্রম, দেশে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে পোস্টারবিহীন নির্বাচন। ফলে নির্বাচন বিধিমালা অনুযায়ী পোস্টার ছাপার ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় ছাপাখানার মালিক শ্রমিকদের ওপর নেমে এসেছে বিষাদের ছায়া।
বুধবার (২৮ জানুয়ারি) দুপুরে নগরীর ফকির বাড়ি রোডস্থ নিউ আর্ট প্রেসে গিয়ে দেখা যায়, ৫-৭ জন শ্রমিক ছাপাখানায় বসে অলস সময় পার করছেন। পাশে বসা ছাপাখানার মালিকও পত্রিকা পড়ে অলস সময় কাটাচ্ছেন।
মালিক শ্রমিকদের সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, অনেক ছাপাখানায় লাখ লাখ টাকার কাগজ-কালি ক্রয়সহ সব মেশিন প্রস্তুত করে রেখেছিল। হঠাৎ নির্বাচন কমিশনের এমন সিদ্ধান্তে সবার মাথায় বাজ পড়ার মতো অবস্থা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বরিশালে প্রায় ৬০টি ছাপাখানা রয়েছে। জাতীয় নির্বাচন আসলে এসব ছাপাখানায় ২৪ ঘণ্টা ব্যস্ত সময় পার করতেন মালিক শ্রমিকরা। কিন্তু এ বছর পোস্টার ছাপার ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে না বলে জানিয়েছেন ছাপাখানার মালিকরা।
নিউ আর্ট প্রেসের মালিক খলিলুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, এবার পোস্টারবিহীন নির্বাচন হওয়ার কারণে ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়েছেন তিনি। তাছাড়া নির্বাচনের কারণে অন্যান্য বই খাতা ছাপার কাজও বন্ধ রয়েছে। ফলে শ্রমিকদের বসিয়ে বসিয়ে বেতন দিতে হচ্ছে। এ অবস্থায় চলতে থাকলে ছাপাখানা বন্ধের উপক্রম হবে।
তিনি আরও বলেন, এমন সময় লাখ লাখ পিস পোস্টারের অর্ডার পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কী থেকে কী হয়ে গেল! এখন শুধু ভিজিটিং কার্ড ও রসিদ ছাপার ছোটোখাটো কাজ হয়। এ কাজ দিয়ে তো একটি ছাপাখানা চালিয়ে রাখা সম্ভব নয়। নির্বাচনে পোস্টার ছাপার ওপর নিষেধাজ্ঞা একটি ভুল সিদ্ধান্ত কমিশনের।
কারণ এ পেশার সঙ্গে শুধু ছাপাখানার মালিক শ্রমিক জড়িত নয়, এর সঙ্গে কাগজ, রং ও যন্ত্রাংশের কাজ করা লোকজনও জড়িত।
নিউ আর্ট প্রেসের শ্রমিক শাহিন বলেন, আগে এমন সময় দিনরাত কাজ চলতো। ২৪ ঘণ্টা পোস্টার ছাপিয়ে ক্লান্ত হলেও বেশি টাকা হাতে পাওয়ার পর সব ক্লান্তি দূর হয়ে যেত। কিন্তু এখন কাজ না থাকায় অনেকে অন্য পেশায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
মানহা অফসেট প্রেসের শ্রমিক ছাব্বির বলেন, আগে নির্বাচনকালীন সময়ে খাওয়া দাওয়া গোসল করার সময় পেতাম না। এখন কাজ না থাকায় শুয়ে বসে সময় পাড় করতে হচ্ছে। এ অবস্থায় মালিক কতদিন বেতন দিয়ে রাখবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।
বরিশাল ছাপাখানা মালিক সমিতির সভাপতি সুলতান মাহমুদ জাগো নিউজকে বলেন, ছাপাখানাগুলো আসলে পোস্টারকেন্দ্রিক, পোস্টার ছাপানোর অর্ডার না পেলে এ ব্যবসা টিকিয়ে রাখা দায়। আগে নির্বাচনকালীন সময়ে সকল খরচ দিয়ে ৫-৭ লাখ টাকা আয় হতো। আর এখন লাভ তো দূরের কথা ব্যাংক লোন নিয়ে শ্রমিকদের বসিয়ে বসিয়ে বেতন দিতে হচ্ছে। শুধু ভিজিটিং কার্ড ও রসিদ ছাপিয়ে তো এ ব্যবসা টিকিয়ে রাখা যাবে না। তাছাড়া ডিজিটালাইজেশনের যুগে এখন প্রচার প্রচারণা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এরও একটা প্রভাব এ ছাপাখানার ওপর পড়েছে। তার ওপর নির্বাচনে পোস্টার ছাপানো বন্ধের সিদ্ধান্ত এ সেক্টরকে ক্ষতির মুখে ফেলছে।
সুলতান মাহমুদ আরও বলেন, নিয়মিত সরকারের ভ্যাট, ট্যাক্স, কর্মচারীর বেতন, লেবার খরচ, প্রিন্টিং খরচ, দোকান ও গোডাউন ভাড়া এখন ছাপাখানার মালিকদের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থায় ব্যবসায়ীদের সুবিধা-অসুবিধার কথা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত ছিল। সরকারের উচিত এখন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীর পাশে দাঁড়ানো।
শাওন খান/আরএইচ/জেআইএম