শিক্ষা

বিদায়বেলায় ২৪ প্রকৌশলীকে পদোন্নতির তোড়জোড়, কোটি টাকার ‘বাণিজ্য’

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে ও পরে একের পর এক নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতি দিচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তফসিলের একদিন আগে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে নজিরবিহীন পদোন্নতি ও পদায়নের ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে মন্ত্রণালয়। তাতেও থামেনি বদলি-পদোন্নতির তোড়জোড়।

এবার শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ২৪ উপ-সহকারী প্রকৌশলীকে পদোন্নতি দিয়ে সহকারী প্রকৌশলী করতে মরিয়া শিক্ষা মন্ত্রণালয়। পদোন্নতির সব কাজ শেষ করে এ বিষয়ে আদেশ (জিও) জারি করেছে মন্ত্রণালয়। এখন সেটি অনুমোদনের জন্য নির্বাচন কমিশনে (ইসি) চিঠি পাঠিয়ে চলছে জোর তদবির।

অভিযোগ উঠেছে—বিদায়বেলায় শিক্ষা উপদেষ্টাসহ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে এসব নিয়োগ-পদোন্নতি দিয়ে যাচ্ছেন। খোদ সাবেক শিক্ষা উপদেষ্টা ও বর্তমান পরিকল্পনা উপদেষ্টা অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ চৌধুরীও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পদোন্নতি-বদলি বাণিজ্য নিয়ে মুখ খুলেছেন। তাতেও কর্ণপাত করছেন না বর্তমান উপদেষ্টাসহ কর্মকর্তারা।

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্র জানায়, পদ ফাঁকা না থাকার পরও চলতি দায়িত্বে পদোন্নতি দিতে শিক্ষা মন্ত্রণায়ের উন্নয়ন শাখা গত ২৫ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশনে (ইসি) চিঠি পাঠিয়েছে। এরপর থেকে এ নিয়ে নির্বাচন কমিশনে ধরনা দিচ্ছেন শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রকৌশলীরা। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ মুহূর্তে এটিকে সুযোগ হিসেবে দেখছেন তারা।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, তফসিল ঘোষণার ঠিক একদিন আগে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ব্যাপক বদলি ও পদোন্নতি দিয়েছে, যা নিয়ে তীব্র সমালোচনা তৈরি হয়। কিন্তু তফসিল ঘোষণার পরও থেমে নেই পদোন্নতি ও বদলি বাণিজ্যের সিন্ডিকেট। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দুই শাখার যুগ্মসচিব এ পদোন্নতি কার্যক্রমে সরাসরি প্রভাব রাখছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাগো নিউজকে বলেন, ‘২৪ জন উপ-সহকারী প্রকৌশলীকে ‘সহকারী প্রকৌশলী’ পদে পদোন্নতি দিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দিক থেকে সব কাজ শেষ করেছে। এখন এটি নির্বাচন কমিশনে পাঠানো হয়েছে। কমিশন অনুমোদন দিলে পদোন্নতি কার্যকর হবে। এমন শর্তসাপেক্ষ পদোন্নতির চিঠি ইস্যু করাতেও গড়ে পাঁচ লাখ টাকা করে বাণিজ্য করেছেন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। সবমিলিয়ে এ পদোন্নতি চিঠি দিয়ে কোটি টাকার বাণিজ্য করেছেন পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখার কর্মকর্তারা।’

পদোন্নতির চিঠিতে বলা হচ্ছে ‘ফাঁকা’, মাঠপর্যায়ে ভিন্ন চিত্রগত ২৫ জানুয়ারি শিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি আদেশ জারি করে। তাতে সই করেছেন উপসচিব শাহিনা পারভীন। চিঠিতে বলা হয়েছে, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ২৪ জন উপসহকারী প্রকৌশলীকে (সিভিল) সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) পদে চলতি দায়িত্ব প্রদানপূর্বক পদায়ন প্রদানের জন্য অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

সেখানে বলা হয়, মাঠপর্যায়ে ২৪টি সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) পদ শূন্য রয়েছে। এসব পদের মধ্যে জ্যেষ্ঠতা অনুযায়ী ২৪ জন উপসহকারী প্রকৌশলীকে (সিভিল) চলতি দায়িত্ব প্রদানপূর্বক বদলি/পদায়নের অনুমতি প্রদানের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।

আরও পড়ুনশিক্ষা প্রকৌশলের ১১ কর্মকর্তাকে পদোন্নতি-পদায়নশিক্ষা ক্যাডারে ২৭০৬ কর্মকর্তার পদোন্নতি

যদিও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাঠপর্যায়ে এখনো ২৪টি সহকারী প্রকৌশলী পদ খালি নেই। এসময়ে এক শ্রেণির কর্মকর্তারা সুযোগ নিতেই এমন উদ্যোগ নিয়েছেন। সেখানে পদ শূন্য থাকার মিথ্যা তথ্য দেওয়া হয়েছে।

যাদের পদোন্নতি দিতে তোড়জোড়চিঠিতে রংপুর জেলা নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ের উপ-সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) মো. রওশন আলী, নরসিংদী নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ের মশফিকুর রহমান, জামালপুরের মো. নাছিমুল আলম, ঢাকা মেট্রোর মোছা. মনিরা বেগম, রংপুর সার্কেলের নাসরিন আক্তার, নীলফামারীর মো. ময়নুল ইসলাম, ঢাকা প্রধান কার্যালয়ের মো. আসাদুজ্জামান, প্রধান কার্যালয়ের এ টি এম মাহমুদুল হোসেন, সাতক্ষীরার আসাদুজ্জামান খান, রাজশাহীর মো. মাহবুবুর আলমের নাম রয়েছে।

পদোন্নতির আদেশে নাম রয়েছে ঢাকা প্রধান কার্যালয়ের উজ্জল কুমার রায়, বগুড়া জেলার মো. আব্দুল আউয়াল, ঢাকা মেট্রোর তাছলিমা সুলতানা, জামালপুরের মো. নুরুল ইসলাম, প্রধান কার্যালয়ের মো. রেজাউল হক, চাঁদপুর জেলার স্বপন কুমার সাহা, ঢাকা মেট্রোর এনামুল হক, ঢাকা সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর কার্যালয়ের মুহাম্মদ বাবুল আহম্মদ।

তালিকায় আরও রয়েছেন- ময়মনসিংহ সার্কেলের মো. হাদিদুল ইসলাম, যশোরের মো. রফিকুজ্জামান, ময়মনসিংহের সৈয়দ তারেক জহিরুল হক, যশোরের কেশবপুরের মো. কামাল হোসেন, ঢাকা প্রধান কার্যালায়ের মো. আবু সাইদ আকন্দ ও ঢাকা মেট্রোর শাকিল আহমেদ।

পদোন্নতি বাণিজ্য নিয়ে যা বলছেন সংশ্লিষ্টরাপদোন্নতির তালিকায় না থাকাদের একজন ঢাকা প্রধান কার্যালয়ের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. আবু সাইদ আকন্দ। মন্ত্রণালয়ের আদেশে নির্বাচন কমিশন অনুমোদন দিলে তিনি সহকারী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি পাবেন।

জানতে চাইলে আবু সাইদ আকন্দ জাগো নিউজকে বলেন, ‘পদোন্নতির জন্য আমরা দীর্ঘদিন ধরেই চেষ্টা করছি। তালিকায় অনেকেই রয়েছেন, যারা দীর্ঘদিনেও পদোন্নতি পান না। প্রশাসন আমাদের অধিকার নিয়ে ছেলেখেলা করেছে। এখন তারা একটি চিঠি ইস্যু করেছে, যা ইসিতে আটকে আছে।’

পদোন্নতিতে কোটি টাকা বাণিজ্যের বিষয়টিও অস্বীকার করেন তিনি। এ প্রসঙ্গে সাইদ আকন্দ বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনে পদোন্নতির জিও আটকে আছে। আমরা সেটি অনুমোদনের চেষ্টা করছি।’ এখানে কোনো আর্থিক লেনদেন হয়নি বলে দাবি করেন আবু সাইদ আকন্দ।

পদোন্নতিতে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মীর্জা মোহাম্মদ আলী রেজা বলেন, ‘আমি পরিকল্পনা শাখার যুগ্মসচিব। শিক্ষা প্রকৌশল উন্নয়ন শাখা দেখভাল করে। যে প্রভাবের অভিযোগ করা হচ্ছে, তাতে আমার সম্পৃক্ততা নেই। এটি করার সুযোগও নেই।’

এএএইচ/এমকেআর