বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ধারণ করে আছে কৃষি এবং গ্রামীণ জীবনধারার মূল স্রোতও প্রবাহিত হয় কৃষিতে, আর কৃষির প্রাণশক্তি তার শ্রমিকেরা। দেশের শ্রমশক্তির প্রায় ৪৫ শতাংশ মানুষ কৃষিকাজে যুক্ত, যা কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতির ভিত্তি। কিন্তু স্বাধীনতার ৫৪ বছর পেরিয়ে গেলেও এই বিপুল শ্রমশক্তির জন্য কোনো ন্যূনতম মজুরি কাঠামো তৈরি হয়নি। শিল্প ও সেবা খাতের ৪৭টি উপখাতে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হলেও কৃষি শ্রমিকেরা আজও সেই কাঠামোর বাইরে রয়ে গেছে। রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান উৎপাদনশীল খাত যখন এমনভাবে উপেক্ষিত থাকে, তখন সমাজ ও অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন থেকে যায়।
বাংলাদেশে কৃষি শ্রমিকদের প্রতি রাষ্ট্রের দীর্ঘ উপেক্ষার বাস্তবতা ফুটে ওঠে নিম্নতম মজুরি বোর্ডের সেই নিয়মে, যেখানে “শ্রমিক” শব্দটির সংজ্ঞা নির্ধারণের সময় কৃষি ও গৃহস্থালি শ্রমিকদের স্পষ্টভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। ফলে ফসল উৎপাদন, সংগ্রহ, পরিবহন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিটি কাজে যুক্ত লাখো মানুষের কোনো মৌলিক সুরক্ষা নিশ্চিত হয় না, অথচ দেশের কৃষি উৎপাদন তাদের নিরবচ্ছিন্ন শ্রমের উপরই দাঁড়িয়ে আছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা ও ন্যূনতম মজুরি কাঠামোর অনুপস্থিতি বহুদিন ধরেই কৃষিশ্রমিকদের মানবাধিকারকে আড়ালে ঢেকে রেখেছে। তাদের কাজ প্রতিদিনই নানা ঝুঁকিতে পরিপূর্ণ, যেমন বজ্রপাত, সাপের কামড়, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া, কীটনাশকের প্রভাব এবং আরও নানা অসুস্থতা, তবুও দুর্ঘটনা ঘটলে পরিবারকে অর্থনৈতিক সহায়তা দেওয়ার মতো কোনো কার্যকর নীতি এখনো গড়ে ওঠেনি। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা রক্ষায় তারা সরাসরি ভূমিকা রাখলেও শ্রমবাজারে তাদের অবস্থান সবচেয়ে অনিশ্চিত থেকে যায়। ন্যূনতম মজুরি কাঠামো না থাকায় মৌসুম অনুযায়ী, এলাকার ভিত্তিতে এবং এমনকি নারী ও পুরুষের মধ্যে যে মজুরি বৈষম্য দেখা যায়, তা আধুনিক শ্রমনীতির সঙ্গে সামান্যতমও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এভাবে নারী পুরুষের মজুরি বৈষম্যের গভীরতা ধরা পড়ে যখন দেখা যায় যে বাংলাদেশের কৃষিশ্রমে লিঙ্গভিত্তিক পার্থক্য প্রতিবেশী ভারত পাকিস্তান বা শ্রীলংকার তুলনায়ও বেশি এবং এই বাস্তবতাকে পরিসংখ্যান আরও স্পষ্ট করে তোলে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) জানায় পুরুষ কৃষি শ্রমিকের দৈনিক গড় মজুরি ৫৮৩ টাকা খাবার ছাড়া আর একই ধরনের কাজে নারী শ্রমিক পান মাত্র ৪২৫ টাকা। খাবারের সংখ্যা যোগ হলে মজুরি আরও কমে যায় তিন বেলা খাবারসহ একজন নারী শ্রমিক পান কেবল ৩৫৮ টাকা আর পুরুষ শ্রমিক পান ৪৮৭ টাকা। এ পার্থক্য কখনো কখনো ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে যা শুধু শ্রমনীতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বরং মৌলিক মানবাধিকারের বিরুদ্ধেও যায়। তাই এই বৈষম্য কমানোর বিষয়টি একটি নৈতিক দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং ন্যূনতম মজুরি কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা আরও সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের কৃষিশ্রমিকদের পরিস্থিতি দেখে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ ছাড়া অধিকাংশ উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশেই কৃষি শ্রমিকদের জন্য আইনগত ন্যূনতম মজুরি কাঠামো রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ভারতের উত্তরপ্রদেশে প্রাপ্তবয়স্ক কৃষি শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ২৫২ রুপি বা প্রায় ৩৪৪ টাকা। শ্রীলংকায় নতুন সংশোধন অনুযায়ী ন্যূনতম মাসিক মজুরি ২৭,০০০ রুপি, যা দৈনিক প্রায় ৪৩০ টাকা। নেপালে কৃষি শ্রমিকদের দৈনিক ন্যূনতম মজুরি ৫৪৬ টাকা এবং মিয়ানমারে দৈনিক মজুরি ৪৫৫ টাকা নির্ধারিত। ইন্দোনেশিয়ায় অঞ্চলভেদে ন্যূনতম মজুরি ৫৩৪ থেকে ৯০০ টাকার মধ্যে। চীনের সাংহাইয়ে কৃষি শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ১,৫১২ টাকা এবং গুয়াংজি অঞ্চলে ৯৭২ টাকা। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে কৃষি এবং অকৃষি উভয় খাতের শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম মজুরি কার্যকর। অর্থাৎ, অধিকাংশ দেশই কৃষি শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা এবং মানবাধিকারকে গুরুত্ব দিয়ে তাদের জন্য আইনগত সুরক্ষা নিশ্চিত করেছে। বাংলাদেশ সেই তালিকায় নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রম হিসেবে দেখা দেয়, যেখানে কৃষি শ্রমিকদের জন্য এখনো স্বীকৃত ন্যূনতম মজুরি কাঠামো নেই।
ন্যূনতম মজুরি কাঠামো কেন জরুরি তা বোঝা যায় যখন দেখা যায়, বাংলাদেশে কৃষি শ্রমিকদের আয় অনিশ্চিত হওয়ার কারণে তাদের জীবনযাত্রা অস্থির থাকে, ফলে টেকসই সঞ্চয় গড়ে ওঠে না, মৌসুমে কর্মসংস্থানের অভাব থাকে, শহরমুখী শ্রমপ্রবাহ বাড়ে এবং কৃষি উৎপাদনে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। স্থায়ী ন্যূনতম মজুরি কাঠামো থাকলে শ্রমিকরা পেশা পরিবর্তনের প্রয়োজন অনুভব করবেন না এবং বাজারমূল্য বিবেচনা করে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করলে গ্রামীণ অর্থনীতি স্থিতিশীল হবে। মৌসুমের সময় হঠাৎ শ্রমিকের চাহিদা বাড়লে মজুরি দ্বিগুণ হয়ে যায়, অন্যদিকে অফ-সিজনে শ্রমিকেরা অর্ধেক মজুরিতে কাজ করতে বাধ্য হন। এই ওঠানামা নিয়ন্ত্রণ করতে ন্যূনতম মজুরি কাঠামো কার্যকর। এছাড়া স্থায়ী মজুরি কাঠামো নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য সমান মজুরি নিশ্চিত করে, যা উন্নয়ন ও সমতার পথে বড় বৈষম্য দূর করে। একজন শ্রমিকের স্থায়ী আয় থাকলে পেশার প্রতি অনুরাগ বাড়ে, দক্ষতা উন্নয়নে আগ্রহ বৃদ্ধি পায় এবং দীর্ঘমেয়াদি কৃষিশ্রমে যুক্ত থাকার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। এভাবে ন্যূনতম মজুরি কাঠামো কৃষি উৎপাদনে সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। ২০১৮ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে কৃষক ও গ্রামীণ শ্রমজীবীদের অধিকার সুরক্ষায় ‘ইউএনড্রপ’ ঘোষণা গৃহীত হয়েছে এবং বাংলাদেশ এতে স্বাক্ষর করেছে, কিন্তু সাত বছর পরও বাস্তব উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এই আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার পূরণ করতেই ন্যূনতম মজুরি কাঠামো প্রণয়ন করা অপরিহার্য।
কৃষি শ্রমিকই বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু। তাদের ছাড়া কৃষি নেই, খাদ্য নেই, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নেই। অথচ রাষ্ট্রের নীতি-পরিকল্পনায় এ খাতের শ্রমিকেরা সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত। দীর্ঘদিনের এই অবহেলা দূর করতে হলে এখনই ন্যূনতম মজুরি কাঠামো প্রণয়ন করতে হবে, এটি আর বিলম্ব করার মতো কোনো বিষয় নয়। একটি ন্যায্য সমাজ, সমতা ভিত্তিক শ্রমবাজার, টেকসই কৃষি উৎপাদন এবং শক্তিশালী গ্রামীণ অর্থনীতি গড়তে হলে কৃষি শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।
কৃষি শ্রমিকদের পেশাগত ঝুঁকি ও অধিকার বোঝা যায় যখন দেখা যায়, কৃষি শ্রম সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজগুলোর মধ্যে একটি। কৃষিতে কর্মরত শ্রমিকরা নিয়মিত সাপের কামড়, বজ্রপাত, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট, কীটনাশকের বিষক্রিয়া এবং বিভিন্ন ক্যান্সারসহ নানা অসুস্থতার ঝুঁকির মুখোমুখি হন। তবুও দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাদের পরিবারকে কোনো ক্ষতিপূরণ বা স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার ব্যবস্থা নেই। যে-সব জেলা বা গ্রামে কৃষিশ্রমিক সংখ্যা বেশি, সেখানে উন্নত হাসপাতালের অভাব প্রকট। এই অসমতার কারণে অনেক শ্রমিক বাধ্য হয়ে কৃষি পেশা ছেড়ে অন্য কাজে চলে যাচ্ছেন, যা দেশের খাদ্য উৎপাদন ও গ্রামীণ অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা সৃষ্টি করছে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ থেকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের কী পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। তাদের বিশ্লেষণে বোঝা যায় এই সমস্যার কার্যকর সমাধানের পথ কোন দিকে প্রসারিত। এসব নির্দেশনা অনুযায়ী জরুরি কয়েকটি উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারলে কৃষি শ্রমিকদের জীবনমান উন্নত হবে এবং দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তাও আরও মজবুত হবে। প্রথমত, কৃষি শ্রমিকদের আইনগতভাবে শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলে তারা মজুরি কাঠামো, শ্রম অধিকার, শ্রমিক নিরাপত্তা এবং দুর্ঘটনা ক্ষতিপূরণের মতো মৌলিক সুবিধা পাবে, যা তাদের জীবনের নিরাপত্তা এবং সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করবে। দ্বিতীয়ত, ন্যূনতম মজুরি কাঠামো নির্ধারণ অপরিহার্য, যেখানে চালভিত্তিক বেতন ব্যবস্থার পরিবর্তে বর্তমান বাজারমূল্য, অঞ্চলভেদ এবং কাজভেদ অনুযায়ী ন্যূনতম বেতন নির্ধারণ করা হবে। এটি শুধু কৃষি শ্রমিকদের আয়কে স্থিতিশীল করবে না, বরং গ্রামীণ অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, যুবকদের কৃষিশ্রমে আগ্রহ এবং খাদ্য উৎপাদনের ধারাবাহিকতাও নিশ্চিত করবে।
তৃতীয়ত, স্বাস্থ্যসেবায় বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে কৃষকদের জন্য বিশেষায়িত হাসপাতাল এবং চিকিৎসা সুবিধা পেয়ে শ্রমিকরা নিরাপদে কাজ করতে পারেন এবং দুর্ঘটনা বা অসুস্থতার ক্ষেত্রে পরিবার আর্থিক ও চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত না হয়। চতুর্থত, শিক্ষায় অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি, যাতে কৃষক এবং কৃষিশ্রমিকদের সন্তানরা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য কৃষি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পারেন এবং এই শিক্ষাগত সুযোগ তাদের গ্রাম থেকে শহরে চলে যাওয়া কমাবে। ন্যূনতম মজুরি কাঠামো না থাকলে কৃষিতে শ্রমসংকট বৃদ্ধি পায়, উৎপাদন খরচ অস্বাভাবিকভাবে ওঠানামা করে, যুবকদের আগ্রহ কমে, গ্রামীণ দারিদ্র্য বাড়ে, শহরে ভাসমান মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং দেশের খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হয়। বর্তমানে বাংলাদেশের কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, বাজারবৈচিত্র্য ও রপ্তানি সম্ভাবনার মধ্য দিয়ে নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে, কিন্তু কৃষিশ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত না হলে এই অগ্রগতি অচিরেই ধীরগতির হয়ে পড়বে এবং দেশের খাদ্য ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বিপন্ন হবে।
কৃষি শ্রমিকই বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু। তাদের ছাড়া কৃষি নেই, খাদ্য নেই, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নেই। অথচ রাষ্ট্রের নীতি-পরিকল্পনায় এ খাতের শ্রমিকেরা সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত। দীর্ঘদিনের এই অবহেলা দূর করতে হলে এখনই ন্যূনতম মজুরি কাঠামো প্রণয়ন করতে হবে, এটি আর বিলম্ব করার মতো কোনো বিষয় নয়। একটি ন্যায্য সমাজ, সমতা ভিত্তিক শ্রমবাজার, টেকসই কৃষি উৎপাদন এবং শক্তিশালী গ্রামীণ অর্থনীতি গড়তে হলে কৃষি শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। তারা আমাদের খাদ্যের জোগানদাতা এবং তাদের প্রাপ্য অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের নৈতিক দায়িত্ব।
লেখক: কৃষিবিদ, প্রাবন্ধিক ও চেয়ারম্যান, ডিআরপি ফাউন্ডেশন। rssarker69@gmail.com
এইচআর/জেআইএম