নারায়ণগঞ্জে আবারও নতুন করে আখ চাষের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। একসময় আখের গুড়ের জন্য নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের বড় বিনাইরচর ও ছোট বিনাইরচর বিখ্যাত হলেও কালের বিবর্তনে এ ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে বসেছিলো। তবে গত কয়েক বছর ধরে এখানকার বাসিন্দারা আবারও তাদের আদি পেশায় ফিরে এসেছেন। সেই সঙ্গে আগের তুলনায় কম হলেও তাদের জমিতে আখ চাষ শুরু করেছেন।
আখ চাষ করে আবার জমিতেই রস জ্বাল দিয়ে তৈরি করছেন ঐতিহ্যবাহী ও স্বাস্থ্যকর আখের গুড়। যা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে স্বাস্থ্যকর আখের গুড় তৈরির পাশাপাশি কৃষকেরাও দেখছেন লাভের মুখ। একইভবে আড়াইহাজারের পাশাপাশি রূপগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় আখ চাষ করা হচ্ছে।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আড়াইহাজারের গোপন্দি, মনোহরদি, ফজুরকান্দি বড় বিনারচর ও ছোট বিনারচর এলাকার কৃষকেরা আখ চাষ করছেন। পাশাপাশি রূপগঞ্জের জাঙ্গীর, দাউদপুর, ভোলাব ও হাটাবো এলাকায়ও চাষ করা হয়। এটি তাদের আদি পেশা। আগে দাদা-বাবারা আখ চাষ করতেন। এখন তারা চাষ করছেন।
উন্নত বীজ, আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ কারিগরের অভাবে কয়েক বছর তাদের এ চাষ বন্ধ থাকলেও আবার নতুন করে শুরু করেছেন। আখের চারা রোপণ থেকে শুরু করে প্রতি মণ গুড় তৈরিতে খরচ হয় সাড়ে ৩ হাজার টাকা। সেই গুড় প্রতি মণ বিক্রি করা যায় ৮ হাজার টাকা। বর্তমানে তারা আখ চাষ করে সফলতার মুখ দেখছেন।
আখ চাষি শহীদুল্লাহ বলেন, ‘আমি এ বছর ৪৫ শতাংশ জমিতে আখ চাষ করেছি। একসময় বাংলাদেশের মধ্যে সবচেয়ে সেরা আখের গুড় তৈরি হতো আড়াইহাজার উপজেলায়। এটা আমাদের ঐতিহ্যবাহী পেশা। বাপ-দাদার আমল থেকেই এটা চাষ করে আসছি।’
আড়াইহাজারের সফর আলী কলেজের শিক্ষার্থী আব্দুর রহিম। তিনি পড়াশোনার পাশাপাশি বাবার কাজে সহযোগিতা করেন। আব্দুর রহিম বলেন, ‘আখ চাষে ভালো লাভ হয়। প্রতি বছরই এ সময়টাতে আমাদের ব্যস্ত সময় পার করতে হয়। এখান থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গুড় নিয়ে যায়।’
তবে আখ চাষে শঙ্কা প্রকাশ করে আব্দুল মোমেন বলেন, ‘আমাদের এখানে প্রতি বছর কমপক্ষে প্রায় দেড় কোটি টাকার গুড় ওঠে। সেই সাথে আখ চাষে প্রচুর খরচও আছে। একসময় হয়তো আখ চাষ থাকবে না। কারণ এখন শিল্পায়নের যুগ চলছে। দিন দিন কৃষিজমি কমে যাচ্ছে। জমিতে বাড়ি-ঘর, শিল্প-কারখানায় ভরে যাবে।’
কৃষক আব্দুল হালিম বলেন, ‘আমার আগে বাবা আখ চাষ করতেন। তার আগে দাদা করতেন। এভাবেই আখ চাষ ও গুড় তৈরি করা শিখেছি। আমরা আখ চাষ করে লাভবান হচ্ছি। এখানে উন্নতমানের গুড় তৈরি হয়। কোনো ভেজালের সুযোগ নেই। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে লোকজন এসে গুড় নিয়ে যায়।’
রূপগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আফরোজা সুলতানা বলেন, ‘আখ উৎপাদনে বিঘাপ্রতি ৫০-৬০ হাজার টাকা খরচ হয়। বিক্রি হয় ১ থেকে সোয়া লাখ টাকা। পাশাপাশি তারা যদি মিশ্র পদ্ধতিতে অর্থাৎ আখের সঙ্গে অন্য সবজি চাষ করেন, তাতেও লাভবান হয়ে থাকেন।’
আড়াইহাজার উপজেলা কৃষি অফিসার মো. রাসেল মিয়া বলেন, ‘আড়াইহাজারে আখের চাষ ভালো হচ্ছে। তারা মিশ্রিমালা জাতের আখ চাষ করেন। এটি উৎপাদনের জন্য ভালো। আমরা চেষ্টা করছি আরও উন্নতমানের আখের চাষ করানোর জন্য। তবে শেয়ালের উপদ্রবের কারণে সেটা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একসময় আখের চাষ কমে গিয়েছিলো। এখন আবার বাড়তে শুরু করছে। এ বছর ১২০ একর জমিতে চাষ করা হয়েছে।’
নারায়ণগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আ. জা. মু. আহসান শহীদ সরকার বলেন, ‘অন্য বছরের তুলনায় এ বছর আখ চাষ বাড়ছে। এ বছর ১৩৬ হেক্টর জমিতে চাষ করা হয়েছে। গত বছর থেকে এ বছর এরিয়া বাড়ছে। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ ও আড়াইহাজার উপজেলায় বেশি আখ চাষ করা হয়।’
মোবাশ্বির শ্রাবণ/এসইউ