মানুষ স্বাভাবিকভাবেই আরাম ভালোবাসে। যে খাবার খেতে ভালো লাগে, যে ঘুম আরামদায়ক, যে পরিবেশ পরিচিত—সেগুলোর দিকেই আমাদের ঝোঁক বেশি। কিন্তু জীবনের অদ্ভুত সত্য হলো, যা আমাদের সবচেয়ে বেশি আরাম দেয়, সেটাই অনেক সময় আমাদের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে। কমফোর্ট জোন ঠিক সেই জায়গা, যেখানে সবকিছু নিরাপদ, পরিচিত এবং পূর্বানুমেয় মনে হয়, কিন্তু ধীরে ধীরে সেটাই আমাদের সম্ভাবনা, স্বপ্ন আর সাফল্যের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
কমফোর্ট জোন মানে শুধু নরম বিছানায় শুয়ে থাকা বা কম পরিশ্রম করা নয়। কমফোর্ট জোন হলো একটি মানসিক অবস্থা, যেখানে মানুষ নতুন কিছু শুরু করতে ভয় পায়, চ্যালেঞ্জ এড়িয়ে চলে এবং নিজের সীমার বাইরে যেতে চায় না। সেখানে থাকলে মনে হয় জীবন বেশ ভালোই চলছে। কোনো বড় ঝামেলা নেই, চাপ নেই, ঝুঁকি নেই। কিন্তু একটু গভীরে তাকালে বোঝা যায়, এই আরামের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে স্থবিরতা, আলস্য আর অপূর্ণতার বীজ।
আমরা অনেকেই এমন কাজ পছন্দ করি যেগুলো করতে ভালো লাগে, যদিও সেগুলো শরীর বা ভবিষ্যতের জন্য ভালো নাও হতে পারে। আবার এমন অনেক কাজ আছে যেগুলো করতে কষ্ট হয়, কিন্তু সেগুলোই আমাদের জীবনকে গড়ে তোলে। পড়াশোনা, নিয়মিত পরিশ্রম, শৃঙ্খলা, নিজের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া—এসব কখনোই আরামদায়ক নয়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এগুলোই সাফল্য এনে দেয়। কমফোর্ট জোন আমাদের এই কঠিন কিন্তু প্রয়োজনীয় কাজগুলো থেকে দূরে সরিয়ে রাখে।
যখন একজন মানুষ দিনের পর দিন একই রুটিনে আটকে থাকে, একই জায়গায়, একই চিন্তায় ঘুরপাক খায়, তখন সে ধীরে ধীরে নিজের মধ্যেকার সম্ভাবনাগুলো হারাতে থাকে। নতুন কিছু শেখার আগ্রহ কমে যায়, কৌতূহল মরে যায়, সাহস ফুরিয়ে আসে। তখন মনে হয়, “এখন নয়, পরে করব”, “আজ না, কাল শুরু করব।” এই ‘পরে’ আর ‘কাল’-এর ফাঁদেই জীবনের অনেক মূল্যবান সময় নষ্ট হয়ে যায়।
কমফোর্ট জোনের সবচেয়ে বড় মিথ্যা হলো—এটা নাকি সুখ দেয়। বাস্তবে এটা সুখ নয়, এটা এক ধরনের আরামদায়ক বিভ্রম। মানুষ ভাবে সে খুব ভালো আছে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে জানে কিছু একটা নেই, কিছু একটা অসম্পূর্ণ। কারণ প্রকৃত সুখ আসে অগ্রগতির মাধ্যমে, নিজেকে অতিক্রম করার মাধ্যমে, নতুন কিছু অর্জনের আনন্দ থেকে। আর সেসব কখনোই কমফোর্ট জোনে বসে পাওয়া যায় না।
তবে এটা মনে করা ভুল হবে যে কমফোর্ট জোন মানেই সব সময় খারাপ। এই জোনের ভেতরেও মানুষ পড়তে পারে, চিন্তা করতে পারে, পরিকল্পনা করতে পারে, আইডিয়া তৈরি করতে পারে। এটা বিশ্রামের জায়গা, প্রস্তুতির জায়গা। সমস্যা তখনই, যখন এই জায়গাটাই স্থায়ী ঠিকানা হয়ে যায়। যখন মানুষ আর এখান থেকে বের হতে চায় না, তখনই বিপদ শুরু হয়।
জীবনে উন্নতি, ব্যক্তিত্বের বিকাশ আর আত্ম-আবিষ্কারের জন্য কমফোর্ট জোন ভাঙা অত্যন্ত জরুরি। নতুন চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলে মানুষ নিজের শক্তি, দুর্বলতা, ভয় আর সক্ষমতাকে চিনতে পারে। ব্যর্থতার সম্ভাবনা থাকে, কিন্তু সেই ব্যর্থতাই মানুষকে শেখায়। যারা ব্যর্থতাকে ভয় পেয়ে পেছনে সরে যায়, তারা কখনোই নিজের আসল ক্ষমতা জানতে পারে না।
কমফোর্ট জোনের বাইরে গেলে দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায়। নতুন মানুষ, নতুন পরিবেশ, নতুন অভিজ্ঞতা মানুষের চিন্তার পরিধি বাড়িয়ে দেয়। তখন জীবনের সম্ভাবনার দরজাগুলো খুলে যেতে শুরু করে, যেগুলো আগে চোখেই পড়েনি। আসলে সম্ভাবনা সবসময়ই থাকে, কিন্তু কমফোর্ট জোনে থাকলে সেগুলো দেখার দৃষ্টিই তৈরি হয় না।
ক্যারিয়ার, সম্পর্ক, ব্যক্তিগত উন্নতি—সব ক্ষেত্রেই কমফোর্ট জোন ভাঙা দরকার। হয়তো পরিচিত চাকরি ছেড়ে নতুন সুযোগ নেওয়া ভয়ংকর মনে হয়, হয়তো নতুন স্কিল শেখা কঠিন লাগে, হয়তো নিজের দুর্বলতার মুখোমুখি হওয়া অস্বস্তিকর। কিন্তু এই অস্বস্তির মধ্যেই লুকিয়ে থাকে উন্নতির বীজ। যে মানুষ এই অস্বস্তিকে গ্রহণ করতে শেখে, সে ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়ে ওঠে—মানসিকভাবে, আত্মবিশ্বাসে, চিন্তায়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কমফোর্ট জোন ভাঙা মানেই হঠাৎ করে সবকিছু উল্টে ফেলা নয়। এটা একটি প্রক্রিয়া। ছোট ছোট পদক্ষেপে নিজের সীমা একটু একটু করে বাড়ানোই আসল কৌশল। আজ যা একটু কঠিন, কাল সেটা স্বাভাবিক হয়ে যাবে। তারপর আরও বড় চ্যালেঞ্জ নেওয়ার সাহস আসবে।
শেষ পর্যন্ত কমফোর্ট জোন ভাঙার আসল উদ্দেশ্য হলো নিজেকে আবিষ্কার করা। মানুষ নিজের সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি শেখে তখনই, যখন সে অজানার দিকে পা বাড়ায়। নিজের ভয়, সীমাবদ্ধতা আর সক্ষমতার মুখোমুখি হলে মানুষ নতুন এক নিজেকে খুঁজে পায়। আর সেই নতুন মানুষটি আগের চেয়ে বেশি সচেতন, বেশি সাহসী এবং বেশি সক্ষম।
জীবন খুব ছোট, কিন্তু সম্ভাবনা অসীম। এই সম্ভাবনাকে সত্যি করতে হলে আরামের ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসতেই হবে। কমফোর্ট জোন হয়তো নিরাপদ, কিন্তু সেখানে ভবিষ্যৎ নেই। ভবিষ্যৎ আছে সেই অচেনা পথে, যেখানে ভয় আছে, কষ্ট আছে, কিন্তু আছে শেখার সুযোগ, বেড়ে ওঠার সুযোগ এবং নিজের সেরা সংস্করণ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা।
লেখক: দ্য আর্ট অফ কর্পোরেট ফাইন্যান্স ম্যানেজমেন্ট, যা সাকসেস ব্লু প্রিন্ট, আমি কি এক কাপ কফিও খাব না ইত্যাদি বইয়ের লেখক, ফাইন্যান্স এন্ড বিজনেস মেন্টর।
এইচআর/এমএস