আন্তর্জাতিক

ইরানে সরকার পরিবর্তনে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে তাকিয়ে ইসরায়েল

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি বাড়ানো নিয়ে যখন বিশ্বজুড়ে জল্পনা তুঙ্গে, তখন আশ্চর্যজনকভাবে নীরব অবস্থান নিয়েছে ইসরায়েল। ইরানে সাম্প্রতিক সরকারবিরোধী বিক্ষোভের প্রতি সমর্থন জানানো ছাড়া দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু প্রকাশ্যে খুব কমই কথা বলেছেন, নীরব থেকেছে তার সরকারও।

বিশ্লেষকদের মতে, এই নীরবতাই আসলে ইসরায়েলের কৌশল। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থায় ২৫ বছর কাজ করা ড্যানি সিত্রিনোভিচ বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল সামরিক উপস্থিতি এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার আশঙ্কা নেতানিয়াহুর কাছে একটি ‘সুবর্ণ সুযোগ’। তার মতে, নেতানিয়াহু এই মুহূর্ত কোনোভাবেই হাতছাড়া করতে চান না।

ইসরায়েলের সাবেক সিগন্যাল গোয়েন্দা কর্মকর্তা আসাফ কোহেন বলেন, ইসরায়েল চায় এবার যুক্তরাষ্ট্রই নেতৃত্ব দিক। তার কথায়, যুক্তরাষ্ট্র শক্তিশালী, সামরিক সক্ষমতা বেশি এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে তাদের গ্রহণযোগ্যতাও অনেক বেশি। তাই ইসরায়েল ইচ্ছা করেই নীরব রয়েছে।

আরও পড়ুন>>যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি/ ইরানে সরকার পরিবর্তন কি অবশ্যম্ভাবী?দ্য গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণ/ ইরানের কাছে কী চায় যুক্তরাষ্ট্র?আল-জাজিরার বিশ্লেষণ/ ইরান ভেনেজুয়েলা নয় যে সহজে জিতবেন ট্রাম্পনির্বাচন পেছানোর জন্যই কি ট্রাম্পের এই ‘যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা’?

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নীরব সমন্বয়

ইসরায়েলের নীরবতার অর্থ এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ নেই। চলতি সপ্তাহে ইসরায়েলের সামরিক গোয়েন্দা প্রধান শ্লোমি বাইন্ডার ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ইসরায়েলি গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, বৈঠকে ইরানের সম্ভাব্য সামরিক লক্ষ্যবস্তু নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

ড্যানি সিত্রিনোভিচের দাবি, নেতানিয়াহু গোপনে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানে সরকার পরিবর্তনমূলক বড় ধরনের হামলার দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। তার মতে, মাসের শুরুতে নেতানিয়াহু যখন ট্রাম্পকে সামরিক পদক্ষেপে সংযত থাকতে বলেন, তখন আসলে তার আপত্তি ছিল—প্রস্তাবিত হামলাটি খুবই সীমিত।

এর আগেও নেতানিয়াহু ইরানিদের তাদের সরকারের বিরুদ্ধে ‘দাঁড়িয়ে যাওয়ার’ আহ্বান জানিয়েছিলেন। গত বছর ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি সেই বার্তা দেন।

ইসরায়েলের দৃষ্টিতে সম্ভাব্য লাভ

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বর্তমানে ইরানের বিরুদ্ধে সীমিত প্রতীকী হামলা থেকে শুরু করে পূর্ণমাত্রার সরকার পরিবর্তন—সব ধরনের বিকল্প বিবেচনা করছেন বলে জানা গেছে। একদিকে প্রকাশ্যে যেমন তিনি সামরিক হুমকি দিচ্ছেন, অন্যদিকে নতুন করে আলোচনার প্রস্তাবও দিচ্ছেন।

যদিও যুক্তরাষ্ট্রের অনেক মিত্র দেশ সতর্ক করে বলছে, ইরানের সরকার উৎখাতের চেষ্টা পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। তবে ইসরায়েলের ভেতরে অনেকে এটিকে নিরাপত্তার জন্য ইতিবাচক সুযোগ হিসেবে দেখছেন।

ইসরায়েলের ধারণা, তেহরানে সরকার পরিবর্তন হলে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি এবং ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের আশঙ্কা অনেকটাই কমে যাবে। একই সঙ্গে, হিজবুল্লাহসহ ইরানসমর্থিত আঞ্চলিক মিলিশিয়াগুলোর শক্তিও দুর্বল হবে। ইসরায়েলের আলমা গবেষণা ইনস্টিটিউটের মতে, শুধু লেবানন সীমান্তেই হিজবুল্লাহর হাতে এখনো প্রায় ২৫ হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট রয়েছে।

তবে ইসরায়েলের কিছু আইনপ্রণেতা মনে করেন, সীমিত হামলা বা নতুন কোনো চুক্তি উল্টো ঝুঁকি বাড়াতে পারে, কারণ তাতে বর্তমান ইরানি সরকার টিকে যাবে। বিরোধী দল ইয়েশ আতিদের সংসদ সদস্য মোশে তুর-পাজ বলেন, ‘পূর্ণমাত্রার অশুভ শক্তির মোকাবিলা কখনো সীমিতভাবে করা যায় না।’

প্রতিশোধের আশঙ্কা ও ঝুঁকি

গত বছর ১২ দিনের যুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনায় হামলা চালালে পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরান শত শত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। এর কিছু ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এড়িয়ে তেল আবিবের আবাসিক এলাকায় আঘাত হানে, এতে অন্তত ২৮ জন নিহত হন।

বিশ্লেষকদের মতে, সেই সংঘর্ষ থেকে ইরান শিক্ষা নিয়েছে এবং কৌশল বদলেছে। বর্তমানে তারা আবার ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত গড়ে তুলছে। সম্প্রতি ইরানের সর্বোচ্চ নেতার এক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে তেল আবিবে ‘তাৎক্ষণিক ও নজিরবিহীন’ জবাব দেওয়া হবে।

ড্যানি সিত্রিনোভিচ বলেন, নেতানিয়াহুর ভয় হলো—ইসরায়েল আবারও বড় ধরনের হামলার শিকার হবে, কিন্তু ইরানে সরকার পরিবর্তন হবে না। তার মতে, ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি বন্ধ করতে হলে সরকার পরিবর্তন জরুরি, আর তা কেবল যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমেই সম্ভব।

সুযোগ না ঝুঁকি?

বিশ্লেষকদের মতে, ১২ দিনের যুদ্ধের পর ইরানের সামরিক প্রতিরক্ষা দুর্বল, আঞ্চলিক প্রভাব খর্ব হয়েছে এবং দেশের ভেতরে সরকারবিরোধী আন্দোলন চলছে—এই পরিস্থিতি অনেকের চোখে একবার আসা সুযোগ। আসাফ কোহেন বলেন, ‘ইরান এখন সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায়। অনেকেই মনে করেন, এখন না করলে আর কখনো করা যাবে না।’

তবে ঝুঁকিও কম নয়। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির চারপাশে সামরিক ও ধর্মীয় জোটে বড় কোনো ফাটল নেই। বিরোধী আন্দোলনও বিভক্ত। সরকার পতন হলে কে ক্ষমতায় আসবে, তা অনিশ্চিত। গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা শুধু ইরানের জন্য নয়, পুরো অঞ্চলের জন্যই ভয়াবহ হতে পারে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নেতানিয়াহু এ বছর নির্বাচনের মুখে রয়েছেন। হামাসের হামলার পর ‘নিরাপত্তার প্রতীক’ হিসেবে নিজের ভাবমূর্তি ফেরাতে তিনি মরিয়া। ইরানে সরকার পরিবর্তন বা খামেনির হত্যাকাণ্ড তার জন্য বড় রাজনৈতিক সাফল্য হতে পারে, আবার বড় ঝুঁকিও।

সিত্রিনোভিচের ভাষায়, ‘এটি এক ধরনের হিসাব করা জুয়া। নেতানিয়াহু পরদিন কী হবে, তা নিয়ে খুব একটা চিন্তিত নন। তার লক্ষ্য—ট্রাম্পের সঙ্গে দাঁড়িয়ে দেখানো যে তিনি ইরানি সরকার ধ্বংস করেছেন। যদি নিশ্চিত হন যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি যাবে, তবে এই ঝুঁকি নিতে তিনি প্রস্তুত।’

তবে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর, আর এটাই ইসরায়েলের জন্য সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা।

সূত্র: বিবিসিকেএএ/