দেশজুড়ে

লালমনিরহাটের ভোটের মাঠে ফের প্রতিশ্রুতির জোয়ার

একাত্তরের রণাঙ্গন পেরিয়ে স্বাধীন দেশে কেটে গেছে পাঁচ দশকেরও বেশি সময়। এই দীর্ঘ পরিক্রমায় জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে ১২ বার। প্রতিবারই ভোটের আগে লালমনিরহাটের সীমান্তঘেঁষা জনপদে উড়েছে উন্নয়নের রঙ্গিন ফানুস। কেউ স্বপ্ন দেখিয়েছেন রাজধানী ঢাকার আদলে আধুনিকায়নের, কেউবা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন শিল্পায়নের। কিন্তু নির্বাচনের পর রাজনৈতিক সমীকরণ আর কৌশলের বেড়াজালে বারবার আটকে গেছে এই জেলার ভাগ্য। উন্নয়নের স্বপ্ন এখানে যেন অনেকটাই মরীচিকা।

আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ফের সরগরম লালমনিরহাটের রাজনীতি। ২২ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া প্রচার-প্রচারণায় প্রার্থীরা দিচ্ছেন নতুন নতুন প্রতিশ্রুতি। তবে ভোটারদের মনে এবার কাজ করছে সতর্ক পর্যবেক্ষণ, তারা আর শুধুই মুখের কথায় বিশ্বাসী হতে চান না।

জেলায় মোট ভোটার সংখ্যা ১১ লাখ ৪৪ হাজার ৪৯৬ জন। তিনটি সংসদীয় আসনে বিভক্ত এই জেলায় লালমনিরহাট-১ (পাটগ্রাম ও হাতীবান্ধা), লালমনিরহাট-২ (কালীগঞ্জ ও আদিতমারী) এবং লালমনিরহাট-৩ (সদর) আসন নিয়ে গঠিত হয়েছে নির্বাচনি মাঠ। এই তিনটি আসন থেকেই অতীতে নির্বাচিতরা মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু ক্ষমতার কেন্দ্রে থেকেও জেলার কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন কতটা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন সাধারণ মানুষের।

জেলায় উন্নয়নের দৃশ্যমান কিছু কাঠামো থাকলেও তার সুফল থেকে বঞ্চিত সাধারণ মানুষ। এখানে রয়েছে একটি বিশ্ববিদ্যালয়, পাঁচটি সরকারি কলেজ, ২৫০ শয্যার হাসপাতাল এবং দুটি পৌরসভা। কিন্তু দীর্ঘদিনের পরিত্যক্ত বিমানবন্দর, নামমাত্র রেলওয়ে বিভাগ ও দেশের রাজস্ব আয়ের অন্যতম উৎস স্থলবন্দর থাকা সত্ত্বেও এর পূর্ণাঙ্গ সুবিধা পাচ্ছেন না জেলাবাসী।

উন্নয়নবঞ্চিত এই জনপদের মানুষের দীর্ঘশ্বাসের নাম- মহাসড়কের বেহাল দশা, তিস্তা নদীর গ্রাসে বসতভিটা হারানো মানুষের কান্না ও সীমান্তে বিরামহীন প্রাণহানি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বেকারত্ব, মাদকের ভয়াবহ বিস্তার এবং অনলাইন জুয়ার থাবা, যা যুবসমাজকে ঠেলে দিচ্ছে অন্ধকারের দিকে।

নির্বাচনি উত্তাপের মূল কেন্দ্রবিন্দু এখন লালমনিরহাট-৩ আসন (সদর)। প্রশাসনিক দপ্তরের কেন্দ্রবিন্দু এই আসনে ভোটার ৩ লাখেরও বেশি। এবারের নির্বাচনে এখানে ত্রিমুখী লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

বিএনপির সাবেক উপমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুল হাবিব দুলু লড়ছেন ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর জেলা আমির অ্যাডভোকেট আবু তাহের ‘দাঁড়িপাল্লা’ নিয়ে মাঠে রয়েছেন। এছাড়া জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীকে জাহিদ হাসান, ইসলামী আন্দোলনের হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী আমিনুল ইসলাম, কমিউনিস্ট পার্টির কাস্তে প্রতীকে প্রার্থী মধুসূদন মধু ও গণসংহতি আন্দোলনের মাথাল প্রতীকে দিপক কুমার রায় প্রতিদন্দ্বিতা করছেন।

মিশন মোড়ের ফলের দোকানদার রমজান আলীর কণ্ঠে ঝরে পড়লো দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও প্রত্যাশা। তিনি বলেন, বিগত সময়ে যারা এমপি-মন্ত্রী ছিলেন, তারা অনেকেই ছিলেন বহিরাগত। তারা ভোটের পর আর খবর রাখেননি। এবার স্থানীয় প্রার্থী অনেকেই আছেন। আমাদের আশা, যিনি মোগলহাট স্থলবন্দর ও বন্ধ বিমানবন্দর চালু করতে পারবেন ও সবকিছুর সংস্কার করবেন, তাকেই আমরা ভোট দেব।

একই সুর শোনা গেল পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ও সমাজসেবক শফিকুল ইসলাম মুকুলের কথায়। তিনি বলেন, প্রতিশ্রুতি তো সবাই দেয়, বাস্তবায়ন কেউ করে না। আমরা এমন একজন পরিচ্ছন্ন প্রার্থী খুঁজছি, যিনি দুর্নীতিমুক্ত থেকে সংসদে আমাদের কথা বলবেন। যার কথায় ও কাজে মিল পাবো, এবার রায় তার পক্ষেই যাবে।

নির্বাচনি ইশতেহারে প্রার্থীরা এবার বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর জোর দিচ্ছেন। ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকের প্রার্থী অ্যাডভোকেট আবু তাহের সীমান্ত হত্যা ও সার্বভৌমত্বের ওপর জোর দিয়ে বলেন, সংসদ সদস্য হলে আমি সীমান্তে পাখির মতো মানুষ মারা বন্ধ করতে কাজ করবো। ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক হবে দ্বিপাক্ষিক, প্রভু-গোলামের নয়। এছাড়াও মোগলহাট স্থলবন্দর, পরিত্যক্ত এয়ারপোর্ট ও তিস্তা সমস্যা সমাধানে আমরা কাজ করব।

তিনি আরও বলেন, চব্বিশের বিপ্লবে তরুণ-প্রবীণ যেভাবে জেগেছে, আমার বিশ্বাস জনগণ এবার ব্যালটে তার প্রতিফলন ঘটাবে।

অন্যদিকে ‘ধানের শীষ’ প্রতীকের প্রার্থী অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু গুরুত্ব দিচ্ছেন তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও কর্মসংস্থানের ওপর।

তিনি বলেন, জনগণের ভাবনা আর আমার ভাবনা এক। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন, বেকারত্ব দূরীকরণ ও রাষ্ট্র সংস্কারই আমার লক্ষ্য। জনগণের ম্যান্ডেট পেলে লালমনিরহাটকে একটি আলোকিত ও সমৃদ্ধ জেলায় রূপান্তর করব। ইনশাআল্লাহ, ১২ তারিখে ধানের শীষেরই বিজয় হবে।

মহসীন ইসলাম শাওন/এমএন/এএসএম