রাজনীতি

গ্যাস-পানির সংকট থাকা বাড্ডাবাসী চান ‘ত্রাণকর্তা’

রাজধানীর বাড্ডার সাতারকুল উত্তরপাড়া এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকেন কামরুন নাহার। স্বামী ও দুই ছেলে নিয়ে তার সংসার। প্রায় ১৩ বছর ধরে তারা এ এলাকার বাসিন্দা। কামরুন নাহার যেখানে থাকেন, সেখানে লাইনের (তিতাস) গ্যাসের তীব্র সংকট। রোজ সকাল ১০টার পর গ্যাস আসে, সন্ধ্যার আগেই আবার চাপ কমে যায়। চুলা আর জ্বলে না, ভাত-তরকারি রান্নাও হয় না।

গ্যাসের মতো ওয়াসার পানিরও একই অবস্থা। বাড়িওয়ালা রাতভর মোটর চালালেও পাইপে পানি মেলে না। ট্যাংকিতে পানি তুলতে না পারায় দিনের অধিকাংশ সময় পানি পান না ভাড়াটিয়ারা। খাবার পানি কিনতেও বাসা থেকে প্রায় ৮০০ মিটার দূরে ওয়াসার পাম্পে যেতে হয়।

গ্যাস-পানির এমন সংকটে অতিষ্ঠ কামরুন নাহারের নজর আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। তার মতে, যে প্রার্থী জিতলে গ্যাস ও পানির সমস্যার সমাধান হবে, সেই প্রার্থীকে ভোট দেবে বাড্ডা এলাকার ভোটাররা।

কামরুন নাহারের ভাষ্য, ‘ভোটে কেডায় কেডা খাঁড়াইছে, কিচ্ছু জানি নে গো বাই (ভাই)। যে ব্যাডায় গ্যাস ভালো করে দিতে পারবো, হেরেই ভোট দিমু গা। পানির মোটা পাইপ আমাগো ঘর পর্যন্ত আইনা দিতে হইবো। এ কাজ যে পাইরবো, হেরেই ভোট দিমু।’

শুধু কামরুন নাহার নন, এ এলাকার অধিকাংশ বাসিন্দা গ্যাস-পানির সংকট নিরসনে ত্রাণকর্তা খুঁজছেন। নির্বাচনে কে, কি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন এবং কার পক্ষে এসব সমস্যা নিরসন করা সম্ভব, তার খোঁজে এখন এলাকার বাসিন্দারা। বিশেষ করে নারী ভোটাররা এ নিয়ে সব প্রার্থীর কাছে স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি চাইছেন।

রাজধানীর বাড্ডা, ভাটারা, রামপুরা ও হাতিরঝিল থানার একাংশ নিয়ে ঢাকা-১১ আসন। আসনটিতে মোট ভোটার চার লাখ ৩৯ হাজার ৭৮ জন। এর মধ্যে নারী দুই লাখ ২২ হাজার ৮৭৭ এবং নারী দুই লাখ ১৬ হাজার ১৯৮ জন। এছাড়া তিনজন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন।

আসনটির সবচেয়ে বেশি ভোটার বাড্ডা (উত্তরবাড্ডা, মধ্যবাড্ডা, দক্ষিণবাড্ডা ও মেরুলবাড্ডা) এলাকায়। এ এলাকার ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে মোটা দাগে কয়েকটি সমস্যার কথা জানা যায়। সেগুলো হলো—গ্যাস-পানির সংকট, ভবন-ভূমি দখল, মাদকের কারবার, প্রগতি সরণির যানজট, রিকশাচালক ও ফুটপাতের চাঁদাবাজি। তাছাড়া পর্যাপ্ত চিকিৎসার সুযোগ না থাকা এবং শিশুদের খেলার মাঠের সংকটের কথা জানিয়েছেন ভোটাররা।

মধ্যবাড্ডার ময়নারবাগ এলাকার বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের আমলে এখানে কোনো এমপি ছিলেন বলে মনে হয় না। কেউ তাদের দেখেননি। এলাকার কোনো খোঁজ-খবরও তারা নেননি। এবার একজন ভালো নেতা চাই আমরা। গ্যাস-পানি, বিদ্যুতের সমস্যা তো আছেই; পাশাপাশি চাঁদাবাজি ও জমি দখলের অসংখ্য ঘটনায় মানুষ ভীত এবং অতিষ্ঠ। যাকে ভোট দিলে এ সমস্যাগুলোর সমাধান হবে, তাকে ভোট দেবো আমরা।’

প্রার্থী ১০ জন, লড়াই হবে ধানের শীষ-শাপলা কলির

ঢাকা-১১ আসনে এবার প্রার্থী হয়েছেন ১০ জন। তারা হলেন— বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী এম এ কাইয়ুম, ১১ দলীয় ঐক্যের শাপলা কলি নিয়ে লড়ছেন মো. নাহিদ ইসলাম, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী শেখ মো. ফজলে বারী মাসউদ (হাতপাখা), জাতীয় পার্টির (জাপা) মনোনীত প্রার্থী শামীম আহমেদ (লাঙ্গল)।

গণঅধিকার পরিষদ থেকে ট্রাক প্রতীকে নির্বাচন করছেন আরিফুর রহমান, গণফোরামের আবদুর কাদের, বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির জাকির হোসেন হাতি প্রতীকে, এনপিপির মিজানুর রহমান আম প্রতীকে, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের কাজী মো. শহীদুল্লাহ এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ফুটবল প্রতীক নিয়ে লড়ছেন কহিনূর আক্তার বিথী।

তবে আসনটির ভোটাররা বলছেন, মূলত এবার ধানের শীষের প্রার্থী এম এ কাইয়ুম এবং শাপলা কলির প্রার্থী নাহিদ ইসলামের মধ্যে মূল লড়াই হবে। তাদের দুজনের মধ্য থেকে একজনকে বেছে নিতে পারেন ভোটাররা।

রামপুরা বাজারের আল-আমিন সুপার মার্কেটের দোকানি ষাটোর্ধ্ব আজমল হক বলেন, ‘কাইয়ুম সাহেব এদিকে বেশি পরিচিত। তবে শেখ হাসিনার পতনের আন্দোলনে এক নম্বর নেতা হিসেবে নাহিদও পরিচিত। তাদের মধ্যে ভালো প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে আমরা মনে করছি।’

হাসপাতাল নেই, চিকিৎসা নিতে ভোগান্তি

বাড্ডা, ভাটারা ও রামপুরা এলাকায় সরকারি হাসপাতাল নেই। এ এলাকায় ভোটার প্রায় সাড়ে চার লাখ হলেও বসবাস করেন ১০ গুণ বেশি মানুষ। তারা চিকিৎসাসেবা পেতে সীমাহীন ভোগান্তিতে পড়েন।

আরও পড়ুন

সুপরিকল্পিত পুরান ঢাকা গড়তে ‘সাহসী সিদ্ধান্ত’ চান ভোটাররাজামায়াত আমিরের আসনে ৪৯ শতাংশই নারী ভোটার, হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস‘কড়াইল বস্তির ভোট যার, সংসদ সদস্য পদ তার’

বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ইবনে সিনা, ফরাজি, এএমজেডসহ কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতাল থাকলেও সেখানে ব্যয় বেশি। দরিদ্র মানুষেরা সরকারি চিকিৎসা সেবা থেকে অনেকটা বঞ্চিত। অসুস্থ হলেই তাদের ছুটতে হয় কুর্মিটোলা অথবা মুগদা মেডিকেলে। এ দুই হাসপাতালে যাওয়াটা সময়সাপেক্ষ। ফলে তারা আগামীতে এ এলাকায় একটি সরকারি হাসপাতালের দাবি তুলেছেন।

প্রগতি সরণির যানজট নিরসনের দাবি

কুড়িল বিশ্বরোড থেকে রামপুরা অভিমুখী প্রগতি সরণি। এ সড়কে দিন-রাত যানজট লেগেই থাকে। যত্রতত্র পার্কিং, মূল সড়কে অবাধে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চলাচল এবং ফুটপাত দখলের কারণে প্রগতি সরণিতে দিনে দিনে যানজট বাড়ছে। এ এলাকার বাসিন্দারা এ যানজট সমস্যা নিরসনে সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ চান।

মধ্যবাড্ডা আদর্শনগর এলাকার বাসিন্দা সাজিদ হাসান বলেন, ‘বাসা থেকে বেরিয়ে রাস্তায় এলেই যানজট চোখে পড়ে। এখন থেকে যে রাস্তায় আপনি যেতে চান যানজটের ভোগান্তিতে পড়তে হবে। এ সমস্যা নিরসনে সুপরিকল্পিত পরিকল্পনা দরকার। আশা করি আগামীতে যিনি জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হবেন, তিনি এ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখবেন।

জমি-ভবন দখলে দিশেহারা

ঢাকা-১১ আসনের একেবারে শেষ প্রান্তে পদরদিযা এলাকা। অনেকটা গ্রামের পরিবেশ। তবে নতুন নতুন ভবন গড়ে উঠলে এ এলাকায়। সেখানে এখন জমি ও ভবন দখলের মহোৎসব চলছে বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের।

নাম প্রকাশ না করে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, এলাকায় জমি ও ভবন দখলের ভয়ে বাসিন্দারা। নিজের জমিতে ভবন তুলেও তা বেদখল হয়ে যাচ্ছে। আগে আওয়ামী লীগের লোকজন এটা করতো। ৫ আগস্টের পর আরেকটি রাজনৈতিক দলের নেতা পরিচয়ে দখল করছে। দখলবাজদের উৎখাতে যে প্রার্থী কাজ করবে, তিনি এখান থেকে বেশি ভোট পাবেন।

অলি-গলিতেও চাঁদাবাজির শিকার রিকশাচালকরা

বাড্ডায় ভোটারদের একটি বড় অংশ রিকশাচালক। মূল সড়কে কিংবা অলি-গলিতে রিকশা চালাতেও এখানে চাঁদা দিতে হচ্ছে। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ চালক এবং সাধারণ যাত্রীরাও।

মধ্যবাড্ডা বাজার রোডে নিয়মিত রিকশা চালান রজব আলী বিশ্বাস। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘মূল রাস্তার মুখে সিরিয়াল ধরে প্যাসেঞ্জার (যাত্রী) তুলতে হয়। সেখানে শৃঙ্খলার নামে একজনকে স্থানীয় নেতারা দাঁড় করিয়ে রাখেন। প্রতিদিন তাকে ৫০-১০০ টাকা পর্যন্ত দেওয়া লাগে। তাছাড়া নানা অনুষ্ঠানের কথা বলেও তারা রিকশাচালকদের কাছ থেকে টাকা তোলেন। গরিবের পেটে যারা লাথি মারে, তাদের তো ভোট দেওয়া যাবে না।’

চাঁদাবাজি বন্ধ চান ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা

উত্তরবাড্ডা, মধ্যবাড্ডা, মেরুলবাড্ডা থেকে রামপুরা বাজার এবং গুলশান-বাড্ডা লিংক রোডে বিকেল হলেই জমে ওঠে ফুটপাত। এ ফুটপাত থেকে নিয়মিত চাঁদা তোলার অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর ছত্রছায়ায় এ চাঁদাবাজি চলে। ফুটপাতের এ চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা।

মধ্যবাড্ডা লুৎফুন টাওয়ারের সামনে ফুটপাতে কাপড়ের দোকানি আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘মাসে দুই হাজার টাকা দিয়ে দোকান নিছি। সরকার তো এ টাকা নেয় না। এটা নেয় যারা, তাদের নাম বললে এখনি দোকান তুলে দেবে। আমার তো পেট চালাতে হবে, সংসার চালাতে হবে; বাধ্য হয়ে দুই হাজার টাকা করে মাসিক দিয়েই দোকান চালাচ্ছি। চাপা কষ্ট আছে। ভোট এমন কাউকে দেবো, যে নিজে চাঁদাবাজি করবে না; দলের লোক দিয়েও চাঁদা তুলবে না।’

মাদক কারবারিদের দমন চান এলাকাবাসী

বাড্ডা এলাকার বড় সমস্যাগুলোর মধ্যে মাদক একটি। একটু ভেতরের দিকে বিশেষ করে বোটঘাট, মোল্লারটেক, আফতাবনগরের ভেতরের দিকে রমরমা মাদক কারবার চলে। এতে পথশিশুসহ সব বয়সী মানুষ মাদকে জড়িয়ে পড়ছে। এ মাদকের কারণে বাড়ছে চুরি, ছিনতাইসহ নানান অপরাধ।

আরও পড়ুন১১ প্রার্থীর ৯ জনই ‘মাঠে নেই’, দুই প্রার্থীর দিকে তাকিয়ে এলাকাবাসীসুপরিকল্পিত পুরান ঢাকা গড়তে ‘সাহসী সিদ্ধান্ত’ চান ভোটাররাঢাকা-৫: নানা প্রতিশ্রুতিতে ভোটার আকর্ষণের চেষ্টায় প্রার্থীরা

বোটঘাট এলাকার ব্যবসায়ী সিদ্দিক হোসেন বলেন, ‘দিনে-দুপুরে মাদকের কারবার চলে। প্রকাশ্যে এসব চললেও পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নেয় না। পুলিশও তাদের থেকে টাকা নেয় শুনেছি। মাদকের কারবারে লাগাম টানতে পারবে এমন প্রার্থীকে এ আসনে খুব দরকার।’

রামপুরায় শিশুদের খেলার মাঠ নেই

রামপুরা এলাকায় শিশুদের খেলার মাঠ খুবই অপ্রতুল। এজন্য এ এলাকার বাসিন্দারা শিশুদের জন্য খেলার মাঠ ও পার্ক গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন। রামপুরার উলন এলাকার বাসিন্দা নিলুফার ইয়াসমিন বলেন, ‘এদিকে শিশুদের খেলার মাঠ নেই। অধিকাংশ স্কুলগুলোতে খেলার মাঠ নেই। দু-একটাতে থাকলেও তা খুব ছোট। এজন্য আগামীতে যিনি এমপি হবেন, তার কাছে আমাদের প্রত্যাশা শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ ও পার্ক গড়ে তুলতে হবে।’

ভোটারদের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে যা বলছেন প্রার্থীরা

গ্যাস-পানির সংকট, জমি-ভবন দখল, যানজট, মাদক কারবার নির্মুলসহ ভোটারদের চাওয়া পূরণে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন প্রার্থীরা। বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে ধানের শীষের প্রার্থী এম এ কাইয়ুম জাগো নিউজকে বলেন, ‘ঢাকা-১১ আসনের মানুষের সমস্যা ও সংকট সম্পর্কে আমার চেয়ে কোনো প্রার্থী ভালো জানেন না—এটা আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি। যারা এখানে নতুন প্রার্থী হয়ে এসেছেন, তারা মানুষের প্রত্যাশা কতটুকু পূরণ করতে পারবেন, তা বিবেচনা করে এ আসনের বাসিন্দারা ১২ তারিখে ভোট দেবেন। আশা করছি, ধানের শীষে ভোট দিয়ে বাড্ডা, ভাটারা, রামপুরা ও হাতিরঝিলবাসী উন্নয়ন বুঝে নেবেনে।’

গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী আরিফুর রহমান বলেন, ‘আমরা ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছি, তাদের কথা শুনছি। আমি নির্বাচিত হলে এ সমস্যাগুলো সমাধানে কাজ করবো।’

এনসিপির আহ্বায়ক ও ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী নাহিদ ইসলামের সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে গত ২৫ জানুয়ারি পদরদিয়া, সাতারকুল, মোল্লারটেক এলাকায় নির্বাচনি প্রচারণাকালে নাহিদ বলেন, ‘ঢাকা-১১ আসনের বিশেষ করে বাড্ডা এলাকায় গ্যাস-পানির সংকট প্রকট। মা-বোনেরা রান্না করতে সীমাহীন ভোগান্তি পোহাচ্ছেন। আমি নির্বাচিত হলে যে গ্যাসের লাইন আছে, তা মেরামত ও সংস্কার করে এ সমস্যা নিরসনে কাজ করবো। পাশাপাশি মাদক ও ভূমি দখল ঠেকাতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

এএএইচ/ইএ