প্রবাস

করদোভা মসজিদে নামাজ পড়া নিষেধ! উত্থান-পতনের গল্প

স্পেনের আন্দালুসিয়ার প্রাণকেন্দ্রে দাঁড়িয়ে থাকা ইতিহাসের এক বিস্ময়কর নিদর্শন হলো করদোভা মসজিদ। যা আজ ‘মেজকিতা-ক্যাথেড্রাল অব করদোভা’ নামে পরিচিত।

উমাইয়া শাসক আবদুর রহমান প্রথমের উদ্যোগে ৭৮৫ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ শুরু হওয়া এই মহিমান্বিত মসজিদ একসময় ইসলামী বিশ্বের গর্ব হিসেবে বিবেচিত হতো। তার উত্তরসূরিদের শাসনামলে ধারাবাহিক সম্প্রসারণের ফলে এটি পরিণত হয় ইউরোপের বৃহত্তম ও সবচেয়ে শৈল্পিক মসজিদগুলোর একটিতে।

ইসলামী শাসনামলে এখানে একসঙ্গে প্রায় ৪০ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারতেন। করদোভা তখন ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞান, চিকিৎসা, দর্শন ও সাহিত্যচর্চার অন্যতম কেন্দ্র। মসজিদটি শুধু ইবাদতের স্থানই নয়, বরং একটি শিক্ষা কেন্দ্র হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত।

মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে লাল-সাদা রঙের অসংখ্য খিলান, শত শত মার্বেল স্তম্ভ আর প্রশস্ত অঙ্গনের শোভা। কমলা গাছের সারিবদ্ধ বাগান যেন আন্দালুসিয়ার নান্দনিকতার প্রতীক।

বিশেষ করে মিহরাবের ওপর সোনালি মোজাইকে খোদাই করা পবিত্র কুরআনের আয়াত-বিশেষত আয়াতুল কুরসি-ইসলামী শিল্পকলার এক অনবদ্য নিদর্শন। শত শত বছর পেরিয়েও এই অলঙ্করণ আজও ইতিহাসের গৌরবময় অধ্যায়ের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

তবে পরিতাপের বিষয় হলো, আট শতাব্দীরও বেশি সময় মুসলিম শাসনের অধীনে থাকা এই পবিত্র স্থাপনায় আজ মুসলমানদের নামাজ আদায় নিষিদ্ধ। ১২৩৬ সালে খ্রিষ্টান রাজা ফের্দিনান্দ তৃতীয় করদোভা দখল করার পর মসজিদটিকে ক্যাথেড্রালে রূপান্তর করা হয়। পরবর্তীতে এর কেন্দ্রস্থলে নির্মিত হয় একটি বিশাল গির্জা, যা ইসলামী ও খ্রিষ্টীয় স্থাপত্যশৈলীর এক বিরল সংমিশ্রণ সৃষ্টি করেছে।

মসজিদের প্রাচীন অযুখানার স্থানে গড়ে তোলা হয়েছে চ্যাপল। বর্তমানে কেউ যদি আবেগে দু’হাত তুলে সিজদায় ঝুঁকে পড়েন, সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তাকর্মীরা তাকে থামিয়ে দেন। যেখানে একসময় আল্লাহর ইবাদতে মুখরিত ছিল পরিবেশ, আজ সেখানে ধর্মীয় আচার পালনের সুযোগ নেই-শুধু ইতিহাস দেখার অনুমতি।

১৯৮৪ সালে ইউনেস্কো করদোভা মসজিদকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার স্বীকৃতি দেয়। বর্তমানে এটি স্পেনের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন আকর্ষণ। প্রতিদিন হাজারো পর্যটক পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে এসে এই স্থাপত্য বিস্ময় ঘুরে দেখছেন এবং আন্দালুসিয়ার স্বর্ণযুগের স্মৃতিচিহ্নের সাক্ষী হচ্ছেন।

ইতিহাসবিদদের মতে, করদোভা মসজিদ শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়; এটি মুসলিম সভ্যতার জ্ঞানচর্চা, সহনশীলতা ও শিল্পরুচির প্রতীক। এই মসজিদ প্রমাণ করে, একসময় ইউরোপের বুকে ইসলামি শাসন কীভাবে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও মানবিক মূল্যবোধের আলো ছড়িয়ে দিয়েছিল।

আজও করদোভা মসজিদ দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষী হয়ে-যা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় ইসলামী সভ্যতার গৌরবময় অতীত এবং সেই অধ্যায়ের উত্থান-পতনের বেদনাময় বাস্তবতা।

এমআরএম/এমএস