দেশজুড়ে

হাসপাতালে লিফট লাগাতে রামেকের বাধা, বিপাকে ঠিকাদার

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নবনির্মিত আইসিইউ ও আইসোলেশন ইউনিটে সরবরাহ করা লিফট স্থাপন নিয়ে জটিলতা তৈরি হওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দাবি করছে, দরপত্র অনুযায়ী বৈধ ও মানসম্মত লিফট সরবরাহ করা হলেও রামেকের কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রশাসনিক জটিলতার কারণে তা স্থাপন করা যাচ্ছে না।

এদিকে সরবরাহকৃত লিফটগুলোর কারিগরি মান ও উৎপত্তিস্থল নিয়ে চলমান পর্যবেক্ষণ শেষ করেছে গণপূর্ত অধিদপ্তরের উচ্চতর কারিগরি কমিটি। কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, সরবরাহকৃত ফুজিটেক ব্র্যান্ডের লিফটগুলো টেন্ডারের শর্ত ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী যথাযথ রয়েছে। গত ২৮ জানুয়ারি গণপূর্তের ই/এম ডিজাইন সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ আব্দুল কাইয়ুম এই প্রতিবেদন দাখিল করেন।

এতে বলা হয়, গণপূর্ত অধিদপ্তরের গঠিত এই উচ্চতর কারিগরি কমিটি গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর সরেজমিনে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করে। তারা সরবরাহকৃত লিফটের মোটর, কন্ট্রোল ইউনিট ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ পরীক্ষা করেন এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যেমন, বিল অফ লেডিং, প্যাকিং লিস্ট ও বিল অফ এন্ট্রি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করেন। এছাড়া স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কমিটি সরাসরি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ফুজিটেক কোং লিমিটেডের সঙ্গে ইমেইলের মাধ্যমে যোগাযোগ করে। ফুজিটেক কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে যে, রামেক হাসপাতালের জন্য সরবরাহকৃত লিফটগুলো তাদের নিজস্ব কারখানায় উৎপাদিত হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সরবরাহকৃত লিফটগুলো ফুজিটেক ব্র্যান্ডের `ZEXIA-D’ মডেলের প্যাসেঞ্জার এলিভেটর। এগুলোর ধারণক্ষমতা ১৬০০ কেজি, গতিবেগ সেকেন্ডে ২.০ মিটার এবং এটি ৩২-বিট মাইক্রোপ্রসেসর সমৃদ্ধ কন্ট্রোল সিস্টেম দ্বারা পরিচালিত। লিফটগুলো আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান `EN 81.1’ অনুসরণ করে তৈরি করা হয়েছে, যা আইসিইউ বা সিসিইউ ইউনিটের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করে।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, লিফটগুলো জাপানি ব্র্যান্ডের হলেও এগুলো প্রস্তুত করা হয়েছে চীনের কারখানায়। টেন্ডারের শর্ত অনুযায়ী এডিবি সদস্যভুক্ত দেশের পণ্য গ্রহণের সুযোগ থাকায় এবং ফুজিটেক একটি বহুজাতিক কোম্পানি হওয়ায় এর গুণগত মান নিয়ে কোনো কারিগরি প্রতিবন্ধকতা নেই বলে কমিটি মত প্রকাশ করেছে।

কমিটি লিফটগুলো স্থাপন, কমিশনিং এবং পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণের জন্য সবুজ সংকেত দিয়েছে। একইসঙ্গে ‘সাইট অ্যাকসেপ্টেন্স টেস্ট’ (SAT) যথাযথভাবে সম্পন্ন করা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা এবং ওয়ারেন্টি সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংরক্ষণ করার সুপারিশ করা হয়েছে।

তারা উল্লেখ করেন, এই লিফটগুলো বাংলাদেশে সরবরাহ করেছে ফুজিটেকের স্থানীয় প্রতিনিধি শেল কর্পোরেশন বাংলাদেশ লিমিটেড। কারিগরি কমিটির এই প্রতিবেদনের ফলে প্রকল্পটির দ্রুত বাস্তবায়নে আর কোনো বাধা রইল না বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ব্রাদার্স কন্সট্রাকশনের স্বত্বাধিকারী সৈয়দ জাকির হোসেন বলেন, গণপূর্তের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী দরপত্রে দেওয়া লিফট স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী রামেকে লিফট সরবরাহ করা হয়েছে। দরপত্র চুক্তিতে যা যা বলা হয়েছে, তাই দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, চুক্তি অনুযায়ী আমরা লিফট আমদানি করেছি। এখন সেটি স্থাপন করতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সম্মতি না দেওয়ায় আমি আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছি। আমি চাই, দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী লিফটটি কর্তৃপক্ষ বুঝে নিয়ে দ্রুত আমার পাওনা পরিশোধ করে আর্থিক ক্ষতির হাত থেকে আমাকে রক্ষা করুক।

এ বিষয়ে রাজশাহী গণপূর্ত বিভাগ-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মিজানুর রহমানের সঙ্গে যোগযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমাদের বিভাগের ও রামেক হাসপাতালের দুইটি আলাদা আলাদা কমিটি গঠন করা হয়েছিল। দুটি কমিটিই রিপোর্ট দিয়েছে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের উচ্চতর কারিগরি কমিটি আমদানি করা লিফটটি যাচাই বাছাই করে দেখেছে। আমাদের সঙ্গে ঠিকাদারের যে চুক্তি হয়েছে, সেই অনুযায়ী তারা সেটি সরবরাহ করেছে এবং তার স্পেসিকেশন সঠিক আছে। এখন এটি নিয়ে কী করণীয় সেটি দুটি কমিটির রিপোর্ট দেখে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেবে।

অপরদিকে এ বিষয়ে রামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পিকেএম মাসুদ উল ইসলামকে একাধিকবার মুঠোফনে কল করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

তবে তাদের করা প্রতিবেদনে বেশ কিছু অসঙ্গতি উঠে এসেছে। সেখানে লিফটটি জাপানের ফুজিটেক কোম্পানি থেকে কি না তার অর্ডারের প্রমাণ হিসেবে যে ই-মেইল দেখানো হয়েছে, প্রকৃতপক্ষে সেটি ছিল ভুয়া। তদন্তে দেখা যায়, ডোমেইনটি ঢাকার এক ব্যক্তির নামে নিবন্ধিত। অর্থাৎ জাপানি প্রতিষ্ঠানের নামে নকল ডোমেইন খুলে ই-মেইল চালাচালি দেখানো হয়েছে।

হাসপাতালের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বাংলাদেশি আমদানিকারক হিসেবে দেখানো হয়েছে শেল করপোরেশন বিডিকে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি ফুজিটেকের অনুমোদিত ডিলার নয়। এলসি করেছে ময়মনসিংহের নাঈমা এন্টারপ্রাইজ, যারা অনুমোদিত আমদানিকারক নয়। এমন আরও নানা অসঙ্গতি সামনে এসেছে।

তদন্ত কমিটি বলছে, প্রি-শিপমেন্ট কার্যক্রম বানোয়াট। ই-মেইল অর্ডারও ভুয়া। ফলে লিফটের প্রকৃত উৎস অজানা। তাই সরবরাহকৃত লিফট স্থাপন না করার বিষয়ে একমত হন কমিটির সদস্যরা। ভুয়া কাগজ তৈরির কারণে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ারও সুপারিশ করা হয়।

এ বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ব্রাদার্স কন্সট্রাকশনের স্বত্বাধিকারী সৈয়দ জাকির হোসেন বলেন, এখানে আমাদের কোনো ভুল নেই। আমার নিজেরা কোনো লিফট আমদানি করতে পারবো না। শেল করপোরেশন বিডি আমাদের যা কাগজ ও ই-মেইল আইডি সরবরাহ করেছে, আমরা সেগুলোই গণপূর্ত বিভাগকে দিয়েছি। রামেকের কমিটি যে প্রতিবেদন দিয়েছে, সেটি সঠিক নয়। রামেকের কমিটিতে রুয়েটের দুজন শিক্ষক ছিলেন। সেই রুয়েটের অতিথি ভবনে শেল করপোরেশন বিডির সরবরাহ করা ফুজিটেক কোম্পানির লিফটই ব্যবহৃত হচ্ছে। এতেও প্রমাণিত হয়, শেল করপোরেশন বিডি ফুজিটেকের বাংলাদেশের এজেন্ট। এমনকি ফুজিটেকের ওয়েবসাইটে গেলেও যে কেউ দেখতে পারবে শেল করপোরেশন বিডি তাদের অনুমোদিত এজেন্ট/ডিলার।

ময়মনসিংহের নাঈমা এন্টারপ্রাইজের মাধ্যমে এলসি করার বিষয়ে ঠিকাদার সৈয়দ জাকির হোসেন বলেন, শেল করপোরেশন বিডি কার মাধ্যমে এলসি করবে, সেটি তাদের বিষয়। রামেকের কমিটি সরবরাহ লিফটের দরপত্রের চুক্তি অনুযায়ী সঠিক রয়েছে কি না, তা যাচাই বাছাই না করেই ব্যক্তিগত আক্রোশ চরিতার্থ করতে এমন একপাক্ষিক রিপোর্ট দিয়েছে।

ঠিকাদারের দাবি, হাসপাতালের ৭ সদস্যের কমিটিতে চারজনই ডাক্তার, তারা কেউই টেকনিক্যাল পার্সন না। এছাড়া রুয়েটের যে দুজন শিক্ষককে কমিটিতে রাখা হয়েছে, তারাও লিফটের স্পেশালিস্ট বা টেকনিক্যাল পার্সন না। ফলে তাদের রিপোর্টে প্রকৃত তথ্য উঠে আসেনি।

এফএ/এমএস