অর্থনীতি

নগদে প্রশাসক পরিবর্তনের ইঙ্গিত গভর্নরের, অনিয়মকারীদের ফেরার সুযোগ নেই

মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রতিষ্ঠান নগদে প্রশাসক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, অনিয়মে জড়িত সাবেক পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের পুনরায় দায়িত্বে ফেরার কোনো সুযোগ নেই।

বুধবার (৪ মার্চ) নগদের প্রশাসক টিমের সঙ্গে বৈঠকে গভর্নর বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের দীর্ঘ সময় অন্য প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক হিসেবে দায়িত্বে রাখা সমীচীন নয়।

বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, বর্তমানে দায়িত্বে থাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালক মো. মোতাসেম বিল্লাহকে এ বিষয়ে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।

মুখপাত্র জানান, বৈঠকে প্রশাসক বলেন- তাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে; যখনই ডেকে নেওয়া হবে, তারা নিজ নিজ দপ্তরে ফিরে যাবেন।

আরিফ হোসেন খান আরও বলেন, নগদে পরিচালিত বিশেষ পরিদর্শনে ব্যাপক অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে। অনিয়মে জড়িত সাবেক পর্ষদের সদস্যদের ফেরার সুযোগ নেই। নগদের মালিক ডাক বিভাগ; তাই প্রতিষ্ঠানটি ডাক বিভাগের অধীনেই পরিচালিত হবে। প্রয়োজনে তারা নতুন বিনিয়োগকারীর কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্তও নিতে পারে।

তিনি জানান, নগদ এখনো পূর্ণাঙ্গ লাইসেন্স পায়নি; অন্তর্বর্তীকালীন লাইসেন্সের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। প্রায় চার থেকে পাঁচ কোটি গ্রাহকের লেনদেন জড়িত থাকায় গ্রাহক স্বার্থ রক্ষায় সেখানে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।

ফরেনসিক নিরীক্ষায় যে অনিয়মের তথ্য

গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২১ আগস্ট নগদের পরিচালনায় প্রশাসক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। পরদিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালক মুহাম্মদ বদিউজ্জামান দিদারকে প্রশাসক করা হয়। পাশাপাশি ছয়জন কর্মকর্তাকে সহায়ক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

প্রশাসক দায়িত্ব নেওয়ার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনে উঠে আসে- ভুয়া পরিবেশক ও এজেন্ট দেখিয়ে আর্থিক জালিয়াতি এবং অতিরিক্ত ই-মানি সৃষ্টির ঘটনা। এতে প্রায় ২ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকার হিসাবে গরমিল ধরা পড়ে।

অনুমোদনহীন পরিবেশক তৈরির অভিযোগে ছয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে প্রশাসক ডাক বিভাগের কাছে তালিকা পাঠান। একই সঙ্গে নগদের ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে ডাক অধিদপ্তরকে চিঠি দেওয়া হয়।

ডাক অধিদপ্তরকে জানানো হয়, অনুমোদন ছাড়াই ৪১টি পরিবেশক হিসাব খোলার মাধ্যমে প্রায় ১ হাজার ৭১১ কোটি টাকা বের করে নেওয়া হয়েছে। এসব হিসাব মূলত সরকারি ভাতা বিতরণের কাজে ব্যবহৃত হতো।

গত বছরের জুনে বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, প্রকৃত টাকা জমা ছাড়াই অন্তত ৬৪৫ কোটি টাকার ই-মানি ইস্যু করেছে নগদ, যা ডাক বিভাগ তথা সরকারের আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২ অনুযায়ী রাষ্ট্রের পক্ষে টাকা ইস্যুর একমাত্র ক্ষমতা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের।

পূর্ণাঙ্গ ফরেনসিক নিরীক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক অডিট প্রতিষ্ঠান কেপিএমজিকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনে উঠে আসা অনিয়মের সঙ্গে ফরেনসিক অডিটের তথ্যেরও মিল পাওয়া গেছে বলে জানান মুখপাত্র।

গত ৫ আগস্টের পর নগদের তৎকালীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) তানভীর আহমেদ অফিসে উপস্থিত হননি। নির্বাহী পরিচালক নিয়াজ মোর্শেদ (এলিট) ও মারুফুল ইসলাম (ঝলক), উপপ্রধান মার্কেটিং কর্মকর্তা খন্দকার মোহাম্মদ সোলায়মান (সোলায়মান সুখন) এবং মানবসম্পদ কর্মকর্তা অনিক বড়ুয়াও অনুপস্থিত ছিলেন।

প্রশাসক দায়িত্ব নেওয়ার পর তাদের বরখাস্ত করা হয়। বরখাস্তদের মধ্যে কয়েকজন নগদ লিমিটেডের মালিকানার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।

ইএআর/বিএ