স্বাস্থ্যখাতের দীর্ঘদিনের সংকট নিরসনে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত স্বাস্থ্যবিষয়ক সংস্কার কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশগুলো এখনো আলোর মুখ দেখেনি। প্রতিবেদন জমা দেওয়ার ১০ মাস পেরিয়ে গেলেও বাস্তবায়নের অগ্রগতি ‘প্রায় শূন্য’ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সুপারিশগুলোর বিষয়ে এরই মধ্যে নতুন সরকারকে চিঠি দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে কমিশন।
গত বছরের ৫ মে কমিশনের প্রধান জাতীয় অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ খানের নেতৃত্বে কমিশন সদস্যরা তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে স্বাস্থ্যখাত সংস্কারের বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দেন। এতে স্বল্প ও মধ্যমেয়াদে বাস্তবায়নযোগ্য ৩২টি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করা হয়।
প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময় ড. ইউনূস দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশগুলো কার্যকর করার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, দেশের স্বাস্থ্যখাতের দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধানে এসব সুপারিশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বাস্তবে সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে তেমন কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি।
আরও পড়ুনস্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের সুপারিশ দ্রুত বাস্তবায়নের নির্দেশবিগত বছরে স্বাস্থ্যখাতে অগ্রগতি শ্লথ!
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি। নতুন সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন সরকারি স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র পরিদর্শনে গিয়ে চিকিৎসক ও নার্সদের কর্মস্থলে অনুপস্থিতি, অব্যবস্থাপনা ও স্বাস্থ্যসেবার দুর্বল চিত্র দেখতে পেয়েছেন বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা বেসরকারি ক্লিনিক নিয়ন্ত্রণে আনার নির্দেশনাও দিয়েছেন তিনি।
প্রতিবেদনে যেসব বড় সুপারিশ
কাঠামোগত সংস্কারস্বাস্থ্য ব্যবস্থার তদারকি ও উন্নয়নের জন্য একটি ‘স্বাধীন বাংলাদেশ হেলথ কমিশন’ গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে স্বায়ত্তশাসন দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
ডিজিটাল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা‘স্বাস্থ্য-সেতু’ নামে একটি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রতিটি নাগরিকের জন্য ইউনিক হেলথ আইডি ও ইলেকট্রনিক হেলথ রেকর্ড চালুর সুপারিশ করা হয়েছে।
স্বাস্থ্যখাতে বাজেট বৃদ্ধিস্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ জিডিপির অন্তত ৫ শতাংশে উন্নীত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামাজিক স্বাস্থ্যবিমা বা ‘স্বাস্থ্য-কবচ’ চালু করে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তাচিকিৎসকদের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘মেডিকেল পুলিশ’ ইউনিট গঠন এবং পেশাগত সুরক্ষার জন্য মেডিকেল প্রফেশনাল ইনস্যুরেন্স চালুর সুপারিশ রয়েছে।
ওষুধ ব্যবস্থাপনাওষুধের যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে সারাদেশে ই-প্রেসক্রিপশন ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে।
গবেষণা ও বিশেষায়িত চিকিৎসাজেলা পর্যায়ে ক্যানসার শনাক্তকরণ কেন্দ্র স্থাপন এবং একটি জাতীয় ক্যানসার ট্রাস্ট ফান্ড গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে।
বুধবার (১১ মার্চ) স্বাস্থ্যবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান জাতীয় অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ খানের কাছে সুপারিশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জাগো নিউজকে জানান, প্রতিবেদন জমা দেওয়া পর্যন্তই তাদের দায়িত্ব ছিল। বাস্তবায়নের বিষয়টি পুরোপুরি সরকারের।
ডা. আজাদ বলেন, ‘কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে সে বিষয়ে আমি মন্তব্য করবো না। বাস্তবায়ন হয়ে থাকলে তা সবাই দেখতে পাচ্ছে।’
আরও পড়ুনস্বাস্থ্যখাতে যেমন ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছর
স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের প্রধান জানিয়েছেন, কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের বিষয়ে নতুন সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, সুপারিশ বাস্তবায়নে সরকারের কোনো ধরনের সহায়তা প্রয়োজন হলে কমিশনের সদস্যরা বিনামূল্যে সর্বাত্মক সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন আনা সম্ভব। কিন্তু দীর্ঘসূত্রতা অব্যাহত থাকলে স্বাস্থ্যখাতের সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
এমইউ/এমকেআর