আইন-আদালত

‘আপাতত’ চালু হচ্ছে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়, আইনজীবীরা বলছেন মন্দের ভালো

স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় কাজ শুরু করেছে। যেখানে প্রশাসনিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে ৪৬টি ক্যাডার পদসহ মোট ২১৩টি পদ রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্ত করে গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। এই সচিবালয় সরাসরি প্রধান বিচারপতির তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (Supreme Court Secretariat) মূলত আদালতের প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম পরিচালনা করে। শুধু বিচারিক কাজ নয়, বরং আদালত পরিচালনার প্রশাসনিক অংশ দেখভাল করে। এর অফিস রাজধানী ঢাকার রমনা থানা এলাকায় বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ভবনে অবস্থিত। সুপ্রিম কোর্ট জাজেস কর্নারে আপাতত কয়েকটি কক্ষ নিয়ে কাজ শুরু করেছে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়।

সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ে শেখ আশফাকুর রহমানকে সিনিয়র সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অতিরিক্ত সচিব হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন চারজন। এদের মধ্যে অতিরিক্ত সচিব শারমিন নিগারকে মানবসম্পদ উন্নয়ন অনুবিভাগ, রুহুল আমিনকে প্রশাসন অনুবিভাগ, মোহাম্মদ হালিম উল্লাহ চৌধুরীকে গবেষণা, উন্নয়ন ও সংস্কার অনুবিভাগ এবং মো. হেমায়েত উদ্দিনকে পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অনুবিভাগে পদায়ন করা হয়েছে।

যুগ্ম সচিব হিসেবেও চারজন নিয়োগ পেয়েছেন। এদের মধ্যে মুন্‌সী আব্দুল মজিদকে আইন, বিধি ও মতামত অনুবিভাগ, মোহা. ইমদাদুল হককে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগ বি. এম. তারিকুল কবীরকে তথ্য ও প্রযুক্তি অনুবিভাগ এবং মনজুর কাদেরকে বাজেট ও নিরীক্ষা অনুবিভাগে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ে উপসচিব ও সিনিয়র সহকারী সচিব হিসেবে তিনজন করে ছয়জন রয়েছেন। উপসচিবদের মধ্যে মো. হাফিজুল ইসলামকে বিচার অধিশাখা, মো. হারুন রেজাকে বাজেট অধিশাখা ও সুব্রত ঘোষ শুভকে পরিকল্পনা অধিশাখায় দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সিনিয়র সহকারী সচিবদের মধ্যে মুহসিনা হোসেন তুষিকে প্রশিক্ষণ শাখা, সাদিয়া আফরীনকে বাজেট-১ শাখা ও মো. আরমান হোসেনকে প্রশাসন-২ শাখায় পদায়ন করা হয়েছে।

এছাড়া, সুপ্রিম কোর্ট থেকে সহায়ক কিছু কর্মচারীকে পদায়িত করা হয়েছে যেমন এমএলএসএস, স্টেনোগ্রাফার ও হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা। সুপ্রিম কোর্ট জাজেস কর্নার ভবন যেটা সচিবালয় ভবন হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে- ওই ফ্লোরের আরও কিছু রুম পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও পরিমার্জন করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

‘আপাতত কাজ শুরু মন্দের ভালো’

সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় ভবনের নির্মাণ কাজ চলছে। কাজ শেষে সেখানে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় শিফট করে কাজ শুরু করতে পারবে। মোটামুটি সত্তরের কাছাকাছি জনবল নিয়ে কাজ শুরু হবে বলেও জানা গেছে। সচিবালয় হলেও আইন অনুযায়ী এখনো বাজেট প্রস্তুত, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও শৃঙ্খলা বিধি প্রণয়ন ছাড়া এই পর্যায়ে বাকি কাজগুলো চলছে। তবে, বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনা নিচ্ছে সচিবালয়। বাস্তবে জনবল নিয়োগ ও কার্যক্রম শুরু হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আপাতত স্বল্প জনবল, সীমিত অফিস নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের যাত্রা শুরু হলেও কাজ এখনও শেষ হয়নি, বিশেষ করে পূর্ণ কর্মক্ষমতা অর্জন এখনও প্রক্রিয়াধীন বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। পরবর্তীতে ধাপে ধাপে আরও কাজ হবে বলে মনে করেন তারা।

বাজেট প্রস্তুত, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও শৃঙ্খলা বিধি প্রণয়নণের এখতিয়ার না থাকলেও আপাতত সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় যাত্রা শুরু করেছে। তাও মন্দের ভালো বলে মনে করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরা।

আরও পড়ুন

সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় কমিটির প্রথম সভায় ৪৮৯টি পদ সৃজনের সিদ্ধান্ত৩ জেলা জজকে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ে অতিরিক্ত সচিব হিসেবে বদলি

এ বিষয়ে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) চেয়ারম্যান ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ জাগো নিউজকে বলেন, আপাতত সুপ্রিম কোর্টের অধীনে সচিবালয়টা এলো। কিন্তু, এটার সঙ্গে একটা অনেক বড় বিষয় জড়িত আছে। সেটা হলো এদের বসার জায়গা, অ্যাকোমোডেশন। মিনিস্ট্রি থেকে ফাইলগুলো নিয়ে আসা, তারপরে সচিবালয়ের অধীনে লোকবল নিয়োগ করা। এরইমধ্যে আমাদের সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের যিনি দায়িত্বে আছেন, সচিবের দায়িত্বে, সেখান থেকে একটা কমিটি গঠন করা হয়েছে। যে লোকবল নিয়ে এই সচিবালয়টা গঠিত হবে সেই সংখ্যাটা তারা নির্ধারণ করেছেন এবং কয়েকজনকে আপাতত নিয়োগও দিয়েছেন, খুব স্বল্প সংখ্যক। কারণ ওনাদের তো এখন পর্যন্ত বসার অ্যারেঞ্জমেন্ট হয়নি।

এখনও আইন মন্ত্রণালয়ের ওপর নির্ভরতা

মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘আমাদের এখানে একটি ভবনের কার্যক্রম চলমান। আমার ধারণা যে, ওই ভবনের কার্যক্রমটা শেষ হলে ওখানে হয়তো একটা অ্যাকোমোডেশন করা হবে। এর বাইরে নতুন করে বিল্ডিং করলে সেটা আরও দেরি হবে। এই ভবনের কাজটা যেন দ্রুত শেষ হয় সেই ব্যবস্থা নেওয়া, ওটা হওয়ার পরে সেখানে যদি ওই ভবনের মধ্যে সচিবালয় স্থাপন করে, তারপরে লোকবলগুলো নিয়োগ করা এবং সেভাবে ফাইলগুলো নিয়ে আসা- এগুলো করতে তো মিনিমাম এক বছর সময় লাগবেই। এর আগে এটার কোনো বেনিফিট আমরা পাবো বলে মনে হয় না। কারণ, এখন পর্যন্ত সবকিছুই কিন্তু মিনিস্ট্রির (আইন মন্ত্রণালয়ের) অধীনে, যার ফলে এখনো কিন্তু নিম্ন আদালতের যে বিচারকরা তারা মিনিস্ট্রিরির ওপরই ভরসা রাখেন।’

তিনি বলেন, ‘এখনো ফাইলটা ওখান থেকে ডিল হয়। তো, সুপ্রিম কোর্টের তৎকালীন দায়িত্বে ছিলেন, যিনি সচিবালয়ের উদ্যোগ নিলেন, তখন যদি এই অ্যাকোমোডেশনের বিষয়টাও তৎকালীন সময়ে আর্লি এবং খুব তৎপরতার সঙ্গে দেখতেন, তাহলে হতে পারতো। কারণ ওই কাজটা চলছে হালকাভাবে। এখানে দ্রুত কার্যক্রম শেষ করে অফিস সেটআপ এগুলো করা যেতো। সেগুলো করার জন্য ব্যবস্থা না করা পর্যন্ত এটা হবে না এবং হতে হতে সম্ভবত আরও এক বছর সময় লাগতে পারে বলে আমার ধারণা।’

চলছে অবকাঠামোগত পরিমার্জন

সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সচিব ও সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী জাগো নিউজকে বলেন, সচিব, চারজন করে অতিরিক্ত সচিব ও যুগ্ম সচিব এবং বেশ কয়েকজন উপসচিব ও সিনিয়র সহকারী সচিব এসেছেন। পূর্ণাঙ্গ নয়, তবে মোটামুটি দুইজনের মতো অফিসার এসেছেন। আর সুপ্রিম কোর্ট থেকে সহায়ক কিছু কর্মচারী পদায়িত করেছি। যেমন: এমএলএসএস, স্টেনোগ্রাফার এবং হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা এই জাতীয় কর্মকর্তা। সিনিয়ার সচিবের ভবন যেটা সচিবালয় ভবন হিসেবে রয়েছে, ওই ফ্লোরের আরও কিছু রুম, পরিবর্তন, পরিমার্জন ও পরিবর্ধন করে বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

হাবিবুর রহমান জানান, পাশেই যে রেকর্ড ভবনটি ওটার প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় ফ্লোর নিয়ে খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে সচিবালয়ের কাজ শুরু হবে ইনশাআল্লাহ। আশা করা যাচ্ছে যে, ঈদের আগে না হলে অন্তত ঈদের ঠিক পরপর একটা ফ্লোর প্রস্তুত হয়ে যাবে। সেখানে তারা দ্রুত শিফট করে কাজ শুরু করতে পারবে।

সাবেক সচিব আরও জানান, আইন অনুযায়ী এখন বদলি এবং শৃঙ্খলা যেটা- সচিবালয় অধ্যাদেশের সাত ধারায়, এখন আইন বাদে এই পর্যায়ে বাকি কাজগুলো চলছে। তবে, বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনা নিচ্ছে সচিবালয়। বিশেষ করে অবকাঠামোগত উন্নয়ন।

আরও পড়ুন

সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় উদ্বোধনসুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ে ৪৬টি ক্যাডারসহ ২১৩ পদ সৃজনের গেজেট

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সংবিধান সংরক্ষণ কমিটির সাধারণ সম্পাদক সিনিয়র অ্যাডভোকেট সৈয়দ মামুন মাহবুব জাগো নিউজকে বলেন, সচিবালয় যাত্রা শুরু করেছে। আমি প্রত্যাশা করবো, বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে তার ভাষণে বলেছেন যে, দিন শেষে আইনের শাসনই হবে তার সরকারের শেষ কথা। তো সেই আইনের শাসনের অন্যতম আন্তরিকতা হবে এই সচিবালয়কে দ্রুত আরও বেশি অবকাঠামোগত সহায়তা করা, পদোন্নতি, বাজেট প্রস্তুত, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও শৃঙ্খলা রক্ষা।

তিনি বলেন, আইন মন্ত্রণালয়ে ওই যে সাব-রেজিস্ট্রার নিয়োগ, নিকাহ রেজিস্ট্রার নিয়োগ আর বিভিন্ন আইনের ড্রাফটিং করা ছাড়া বিচার বিভাগের কোনো জায়গায় যেন আইন মন্ত্রণালয়ের কোনো কাজের সুযোগ না থাকে। কারণ, আমরা অনেক মন্ত্রণালয় দেখেছি, অতীতেও বিভিন্ন অভিযোগ দেখেছি।

সৈয়দ মামুন মাহবুব আরও বলেন, তবে মাননীয় প্রধান বিচারপতির কাছে আহ্বান থাকবে, এই অফিসেরও যেন একটা দায়বদ্ধতা থাকে। নাহলে, পরে দেখা যাবে যে, এই অফিসও আইন মন্ত্রণালয়ের মতো হয়ে গেছে। কাজেই আমরা আশা করবো, সবাই শুভ উদ্যোগে কাজ করবে এবং বর্তমান সরকার সব ধরনের সহযোগিতা অনতিবিলম্বে দেবে এবং এগুলো না দিলে লোক দেখানো কাজ হবে। কাজের কাজ কিছু হবে না। প্রথমত সুপ্রিম কোর্টের সচিবালয় যে এতদিন পরে হলো অন্তত যাত্রা শুরু করেছে সীমাবদ্ধতার মধ্যেও এটা বিচারপ্রার্থী মানুষ, দেশের বিচার বিভাগ ও গণতন্ত্রের জন্য শুভ লক্ষণ। তবে আর্থিক ব্যবস্থাপনা আমি যেটা অনলাইনেও দেখেছি বাজেট প্রস্তুত, পদোন্নতি, শৃঙ্খলা রক্ষা- এগুলো এখনও এই সচিবালয়ের হাতে দেয়নি।

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সংবিধান সংরক্ষণ কমিটির সাধারণ সম্পাদক বলেন, খুব মনে পড়ছে আইনজীবী জীবনের প্রথম দিকে ৯৯ সালে খুব নামকরা ব্যক্তি প্রধান বিচারপতি মোস্তফা কামাল যিনি মাজদার হোসেন মামলার রায় দিয়েছিলেন। আপিল বিভাগে উনি তখন বলেছিলেন যে, আমরা একটা আলপিন কিনতে গেলেও আইন মন্ত্রণালয়ের অ্যাপ্রুভাল লাগে।

এফএইচ/এএমএ/এমএমএআর