আন্তর্জাতিক

ইরানের পাল্টা আঘাত যেভাবে চমকে দিলো যুক্তরাষ্ট্রকে

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর আগে থেকেই তেহরান সতর্ক করে দিয়েছিল— হামলার জবাব হবে তীব্র এবং ক্রমেই তা আরও বিস্তৃত হবে। ইরানি কমান্ডাররা বলেছিলেন, মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে। এমনকি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার প্রস্তুতির কথাও জানান তারা।

কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রায় দুই সপ্তাহ পর দেখা যাচ্ছে, ইরানের প্রতিক্রিয়ার ব্যাপ্তি ও কৌশলকে যুক্তরাষ্ট্র যথাযথভাবে অনুমান করতে পারেনি। ইরানের হামলায় উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল ও গ্যাস পরিবহন প্রায় থমকে গেছে। এর ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তীব্র অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ স্বীকার করেছেন, ইরান এভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে, এমনটা নিশ্চিতভাবে অনুমান করেননি তারা। যদিও এ ধরনের পরিস্থিতির আশঙ্কা সম্পর্কে ধারণা ছিল তাদের।

অভাবনীয় গোয়েন্দা সক্ষমতা ও নিখুঁত নিশানা

সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা ও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান গোয়েন্দা তথ্য, স্যাটেলাইট ছবি এবং রাশিয়ার যুদ্ধের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি ও কৌশলগত স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করতে পেরেছে।

মার্কিন বিশেষ বাহিনীর মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের স্পেশাল অপারেশনস কমান্ড সেন্ট্রালের সাবেক চিফ অব স্টাফসেথ ক্রাম্ম্রিচ বলেন, সীমিত সম্পদ থাকা সত্ত্বেও ইরান যে সক্ষমতা দেখিয়েছে, তা নজিরবিহীন।

পেন্টাগনের সাবেক কর্মকর্তা ডানা স্ট্রোল জানান, ইরান সম্ভবত রাশিয়া ও চীনের কাছ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্য ও চিত্র সহায়তা পাচ্ছে।

ড্রোন যুদ্ধের নতুন বাস্তবতা

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনার স্টাডিজের গবেষক কেট বন্ডার বলেন, ইরানের তৈরি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের মতো হুমকির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পুরোপুরি প্রস্তুত ছিল না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান ব্যাপকভাবে ব্যবহার করছে প্রপেলারচালিত শাহেদ ড্রোন। মোটরসাইকেলের ইঞ্জিনচালিত এসব ড্রোনে সাধারণত ২৫ থেকে ৫০ কেজি ওজনের বিস্ফোরক বহন করা যায়।

এই ড্রোনগুলো ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় অনেক সস্তা, দ্রুত মোতায়েনযোগ্য এবং ধ্বংস করা কঠিন। পিকআপ ট্রাকে সহজেই ড্রোন উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা বসানো যায় এবং দ্রুত স্থান পরিবর্তন করা সম্ভব। অনেক ক্ষেত্রে স্যাটেলাইট নেভিগেশন বা কম্পিউটার ভিশনের সাহায্যে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে এগুলো।

রাডার ও সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু

বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের প্রথম দিকেই ইরানের লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের রাডার ও নজরদারি ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে দেওয়া।

স্যাটেলাইট ছবির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জর্ডানে যুক্তরাষ্ট্রের একটি এএন/টিপিওয়াই-২ রাডার ধ্বংস হয়েছে এবং কাতারে থাকা এএন/এফপিএম-১৩২ রাডার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এ ছাড়া বাহরাইনের রাজধানী মানামায় অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরের সদরদপ্তরের কাছে একটি স্যাটেলাইট যোগাযোগ স্থাপনাও হামলার শিকার হয়েছে।

রাশিয়ার অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তির সমন্বয়

বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার ব্যবহৃত ইরানি ড্রোনের অভিজ্ঞতা থেকে তেহরান অনেক কিছু শিখেছে। তারা এখন একই লক্ষ্যবস্তুতে বিভিন্ন দিক থেকে ড্রোন নিক্ষেপ করছে, যা ইন্টারসেপ্ট করা কঠিন।

এছাড়া কিছু ড্রোনে রাশিয়ার তৈরি জ্যামিং-প্রতিরোধী প্রযুক্তি ব্যবহারেরও প্রমাণ পাওয়া গেছে।

উপসাগরীয় দেশগুলোতে অস্থিরতা

ইরান কেবল ইসরায়েল বা মার্কিন ঘাঁটিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তারা রিয়াদ ও কুয়েত সিটিতে মার্কিন দূতাবাস, দুবাই বিমানবন্দর সংলগ্ন এলাকা, আবুধাবির তেল শোধনাগার এবং ওমানের বন্দরেও আঘাত হেনেছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছেন, ইরান এমন সব দেশেও হামলা চালাচ্ছে যারা সরাসরি এই যুদ্ধে অংশ নেয়নি।

ট্রাম্প প্রশাসনের ভুল হিসাব?

প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) সম্ভাব্য পরিস্থিতির বিষয়ে সতর্ক করলেও ট্রাম্প এবং তার ঘনিষ্ঠ মহল ইরানের পাল্টা আঘাতের তীব্রতা এবং যুদ্ধের ব্যাপ্তি বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন। ট্রাম্পের ধারণা ছিল এটি একটি সংক্ষিপ্ত এবং একতরফা অভিযান হবে, কিন্তু ইরান একে একটি দীর্ঘমেয়াদি এবং ব্যয়বহুল যুদ্ধে রূপান্তর করেছে।

‘তুরুপের তাস’ এখনো বাকি?

প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান এখনো তাদের সবচেয়ে উন্নত অস্ত্রগুলো ব্যবহার করেনি। এর মধ্যে রয়েছে:

কাসেম বাসির : অপটিক্যাল গাইডেন্স সম্পন্ন হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র। শাহেদ-২৩৮: জেট ইঞ্জিন চালিত ড্রোন, যা প্রচলিত ড্রোনের চেয়ে তিনগুণ বেশি গতিসম্পন্ন। আরও দীর্ঘ হতে পারে সংঘাত

মার্কিন সেনাবাহিনীর জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান ড্যান কেইন বলেন, যুদ্ধক্ষেত্রে প্রথম সংঘর্ষের পর কোনো পরিকল্পনাই পুরোপুরি কার্যকর থাকে না। উভয় পক্ষই পরিস্থিতির সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।

তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব আরও গভীর হতে পারে।

সূত্র: ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকেএএ/