গত বছর আলুতে লোকসান গুণেছিলেন উত্তরের জেলা লালমনিরহাটের প্রান্তিক কৃষকরা। সেই ক্ষত শুকাতে না শুকাতেই এবার ধার-দেনা করে, চড়া দামে সার-বীজ কিনে নতুন করে স্বপ্ন বুনেছিলেন তারা। উর্বর মাটিতে এবার আলুর বাম্পার ফলনও হয়েছে। দিগন্ত বিস্তৃত মাঠে ফসলের হাসি। কিন্তু এই হাসি কৃষকের মুখে নেই, তাদের চোখে এখন কেবলই হতাশার জল। বাম্পার ফলনই যেন এবার তাদের জন্য ‘কাল’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একদিকে ন্যায্যমূল্য না পাওয়া, অন্যদিকে হঠাৎ বৃষ্টির হানা, সব মিলিয়ে দুশ্চিন্তায় নির্ঘুম রাত কাটছে লালমনিরহাটের হাজারো আলুচাষি।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর জেলায় ৭ হাজার ১৬০ হেক্টর জমিতে আলুর চাষ হয়েছে। হাড়ভাঙা খাটুনি আর চড়া দামের কৃষি উপকরণের কারণে প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে কৃষকের খরচ পড়েছে প্রায় ১৫ টাকা। অথচ বর্তমানে পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৮-৯ টাকায়, কোথাও আবার ১০ টাকায়। ভরা মৌসুমেও ব্যবসায়ীদের আলু কেনার কোনো তাগিদ নেই। একদিকে দাম নেই, অন্যদিকে ক্রেতার অভাবে পরবর্তী ফসল আবাদেও দেরি হয়ে যাচ্ছে কৃষকদের।
ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার এই তীব্র হতাশার মধ্যেই কৃষকের জন্য ‘মরার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে এসেছে হঠাৎ রাতের ভারী বৃষ্টি। বৃষ্টির পানিতে জেলার নিচু এলাকার আলু ক্ষেতগুলো তলিয়ে গেছে। অনেকেই হাড়ভাঙা পরিশ্রমে আলু তুলে জড়ো করে রেখেছিলেন, কিন্তু হিমাগারে নেওয়ার আগেই তা বৃষ্টিতে ভিজে কাদাযুক্ত হয়ে ক্ষেতেই পড়ে আছে। ব্যাপকভাবে আলু পচে যাওয়ার শঙ্কায় এখন দিশাহারা চাষিরা।
মাঠপর্যায়ে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের অবস্থা দুর্বিষহ। মহেন্দ্রনগরের আলুচাষি জালাল উদ্দিন বলেন, ১৫-১৬ জন লোক নিয়ে আলু তুলছিলাম। ১৫ শতক জমির আলু হিমাগারে পাঠিয়েছি। বাকি জমির আলু গুছিয়ে রাখার আগেই হঠাৎ বৃষ্টিতে ভেসে গেছে। কাদামাখা আলু বাজারে নিচ্ছে না, দামও অনেক কম। গতবার ঋণ করে আলুচাষ করে লস খেয়েছিলাম, ভেবেছিলাম এবার সেই ঋণ শোধ করবো। কিন্তু পারলাম না, উল্টো ঋণ আরও বেড়ে গেলো।
আলুচাষি বেলাল উদ্দিন বলেন, এমনিতেই আলুর দাম নেই, বাজারে ১০ টাকা কেজি। যে পরিমাণ খরচ করেছি, তাতে লাভ তো দূরের কথা, পুরো লস অবস্থায় আছি। ঋণ করে চাষ করেছিলাম, এখন ফসল বেচে সেই ঋণ শোধ হবে না। কৃষকরা এভাবে লসে পড়ে যাচ্ছে, সরকারের উচিত আমাদের দিকে একটু নজর দেওয়া।
আমবাড়ির আলুচাষি সোবেদ আলী বলেন, আলুচাষ করে আমাদের একেবারে ‘মার্ডার’ হওয়ার মতো অবস্থা। সার কেনার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে চড়া দামে সার কিনেছি। সেই ফসলের আজ কোনো দাম নেই। কীভাবে এই ধার-দেনা শোধ করবো, কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না।
এ বিষয়ে লালমনিরহাট কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মাঠ ও বাজার পরিদর্শক হিমাংশু চন্দ্র বর্মন জানান, চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি হওয়ার কারণেই মূলত বাজারে আলুর দাম কমে গেছে।
তিনি বলেন, জেলায় গড়ে ৩০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। তবে ইতোমধ্যে অর্ধেকের বেশি জমির আলু ঘরে তোলা হয়েছে। আলুর ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভালো থাকায় বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা কিছুটা কম।
কৃষকদের লোকসানের হাত থেকে বাঁচাতে বিকল্প পথের পরামর্শ দিয়ে তিনি আরও জানান, কৃষকরা যদি শুধু আলুর ওপর নির্ভরশীল না হয়ে গম, সরিষা, সূর্যমুখীসহ অন্যান্য ফসলের আবাদ করেন, তবে এমন লোকসানের মুখে পড়তে হবে না। এছাড়া আলু দিয়ে বিভিন্ন ধরনের খাদ্যপণ্য তৈরির মাধ্যমে এর বহুমুখী চাহিদা বাড়ানো সম্ভব। আমরা সে বিষয়ে উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি।
মহসীন ইসলাম শাওন/এমএন/জেআইএম