আইন-আদালত

জুলাই গণহত্যা মামলায় জামিন বন্ধ ও সাক্ষীর নিরাপত্তার দাবি বৈছাআর

জুলাই-আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আসামিকে জামিন না দেওয়া, সাক্ষিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বিচারে গাফিলতির জবাবদিহি এবং দ্রুত বিচার সম্পন্ন করার দাবিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন (বৈছাআ)।

সোমবার (১২ জানুয়ারি) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বরাবর স্মারকলিপি জমা দেন বৈছাআর নেতারা। স্মারকলিপিতে তারা উল্লেখ করেন, দ্রুত বিচার নিশ্চিত না হলে, দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে এবং বিচার প্রক্রিয়ায় পূর্ণ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে জনগণ তা মেনে নেবে না।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের চিফ প্রসিকিউশনের কাছে এসব দাবি জানায় বৈছাআ। পরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের এ তথ্য তুলে ধরেন বৈছাআর সভাপতি রিফাত রশীদ। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রেস কনফারেন্সে তাদের তিন দফা দাবি নিম্নরূপ তুলে ধরা হয়।

১. জুলাই আগস্টের মামলায় যাতে কোনো অপরাধী জামিন, অব্যাহতি বা খালাস না পায় সেটি নিশ্চিত করতে হবে।

২. জুলাই হত্যায় যারা ফ্যাসিলিটেড করেছে সেই সব ব্যবসায়ী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রসিকিউশনের বিচারিক ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে।

৩. জুলাই হত্যায় জড়িতদের তদন্তের ক্ষেত্রে একটি বিশেষ তদন্ত টিম ও স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে।

এদিকে, গত রোববার (১১ জানুয়ারি) লক্ষ্মীপুরের এক আওয়ামী লীগ নেতার জামিনের প্রতিবাদে সুপ্রিম কোর্ট মাজার গেট ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সামনের গেটে ‘ট্রাইব্যুনাল ঘেরাও কর্মসূচি’ পালন করে বিপ্লবী ছাত্র-জনতা। এসময় তারা চিফ প্রসিকিউটরসহ সব প্রসিকিউটরের পদত্যাগ দাবি করেন। পাশাপাশি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকারীদের হত্যায় জড়িত আসামিদের জামিন অনুমোদনের সঙ্গে জড়িত বিচারক এবং সর্বোচ্চ ও নিম্ন আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের পদত্যাগও চেয়েছেন তারা।

তাদের পক্ষ থেকে দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে সংঘটিত নৃশংস গণহত্যা দেশের ইতিহাসে এক গভীর কলঙ্কজনক অধ্যায়। এ ঘটনায় অসংখ্য নিরীহ ছাত্র-জনতা শহীদ হয়েছেন, শতাধিক মানুষ আহত ও পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। এই বর্বরতা শুধু কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধ নয়, বরং এটি রাষ্ট্র, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের বিরুদ্ধে সংঘটিত সুস্পষ্ট অপরাধ।

অত্যন্ত উদ্বেগ ও ক্ষোভের সঙ্গে আমরা লক্ষ্য করছি যে, এই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডে দায়েরকৃত মামলাসমূহে অভিযুক্ত আসামিদের দ্রুত, অযৌক্তিক ও প্রশ্নবিদ্ধভাবে একের পর এক জামিন প্রদান করা হচ্ছে। একই সঙ্গে আজ পর্যন্ত বিচার প্রক্রিয়া দৃশ্যমানভাবে এগিয়ে না যাওয়ায় রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার নগ্ন বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।

বলা হয়, যে অপরাধ জাতির বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে, যে হত্যাকাণ্ডের বিচার জাতি আজও অধীর আগ্রহে প্রত্যাশা করছে সেই মামলার আসামিদের জামিনে মুক্তি পাওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে যে বিচার ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করার অপচেষ্টা এখনো অব্যাহত রয়েছে।

এর ফলে প্রমাণ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি, সাক্ষীদের নিরাপত্তাহীনতা এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। এটি কেবল শহীদ ও আহতদের পরিবারের সঙ্গে অবিচার নয়, এটি পুরো জাতির সঙ্গে এক নির্মম প্রতারণা। জুলাই গণহত্যার বিচার প্রশ্নে কোনো রকম শিথিলতা বা আপস জাতি কখনই মেনে নেবে না।

ট্রাইব্যুনাল ঘেরাও কর্মসূচির প্রেক্ষাপটে আমরা জোরালোভাবে দাবি:১. জুলাই গণহত্যার মামলায় সব অভিযুক্ত আসামির জামিন অবিলম্বে বাতিল করতে হবে।

২. আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে বিচার কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে।

৩. বিচার প্রক্রিয়ায় গাফিলতি ও ব্যর্থতার জন্য দায়ী রাষ্ট্রীয় ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

৪. ভুক্তভোগী পরিবার ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

ওই দাবিগুলোর বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আমরা ট্রাইব্যুনাল ঘেরাও কর্মসূচি ঘোষণা করছিলাম, সেটি পালন করা হয়েছে। এ কর্মসূচির মাধ্যমে আমরা বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে আমাদের সুস্পষ্ট অবস্থান তুলে ধরছি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে জোর দাবি জানাচ্ছি।

আমরা সতর্ক করে জানাতে চাই, ভবিষ্যতে এ ধরনের কর্মকাণ্ড পুনরায় ঘটলে এবং বিচার প্রক্রিয়ায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হলে, আমরা আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করতে বাধ্য হবো। জুলাই গণহত্যার সঙ্গে জড়িত সব ব্যক্তির দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতেই হবে, এটাই জনগণের শেষ কথা।

এফএইচ/এমএএইচ/এমএস