সবশেষ তিনটি (২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪) জাতীয় নির্বাচনের অনিয়ম নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে এ বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত তদন্ত কমিশন। প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় নির্বাচনে সারাদেশে ২১৩টি ভোটকেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়েছিল। সেসব কেন্দ্রের শতভাগ ভোটই পড়েছিল নৌকা প্রতীকে। অন্য প্রতীকের কোনো প্রার্থী ১টিও ভোট পাননি।
এই তিনটি নির্বাচনে অনিয়ম, দুর্নীতি খতিয়ে দেখতে হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি শামীম হাসনাইনকে প্রধান করে গঠিত তদন্ত কমিশন সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়।
কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচন কমিশন কর্তৃক প্রকাশিত ভোটকেন্দ্রভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, একাদশ জাতীয় নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ পায় মোট প্রদত্ত ভোটের ৭৪ দশমিক ৪৪ শতাংশ, আর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি পায় ১২ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০১৮ সালের নির্বাচনে ২১৩টি ভোটকেন্দ্রে শতভাগ (যা অসম্ভব) এবং ১৪১৮টি কেন্দ্রে ৯৬ শতাংশের বেশি ভোট পড়ে, যা অস্বাভাবিক ঘটনা। আরও লক্ষ্যণীয় যে, শতভাগ ভোট পড়া কেন্দ্রগুলোতে সব ভোট পান নৌকা প্রতীকের প্রার্থী। অন্য প্রতীকের কোনো প্রার্থী ১টিও ভোট পাননি।
আরও পড়ুনভোট দেননি ৮০ শতাংশের বেশি ভোটার, ‘আগেই হয়ে যায়’ অর্ধেকের ভোট
কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, কারচুপির নির্বাচন ছাড়া কোনো নির্বাচনে শতভাগ ভোট পড়া সম্ভব নয়। এখানে মৃত ভোটার থাকে, প্রবাসী ভোটার থাকে এবং আরও অনেক অনুপস্থিত ভোটার থাকে। ২০১৮ সালের নির্বাচনে ৫৮৭টি কেন্দ্রের মধ্যে ৫৮৬টিতে (৯৯ দশমিক ৮৩ শতাংশ) ভোট পান নৌকা প্রতীকের প্রার্থী।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচনে সরকারি দল আওয়ামী লীগকে অন্যায় সুবিধা দিতে সরকারের আজ্ঞাবহ কর্মকর্তাদের মাঠ প্রশাসনের উচ্চপদে দায়িত্ব দেওয়া হয়। সচিব পদেও দায়িত্ব পান সরকারের আজ্ঞাবহ কর্মকর্তারা। পুলিশ প্রশাসনেও আওয়ামী লীগের দলীয় মতাদর্শের লোকদের শীর্ষ পদে বসানো হয়। এ বিষয়ে সরকার বা নির্বাচন কমিশন সৎ, দক্ষ ও নিরপেক্ষ লোকদের বদলির মাধ্যমে পদায়নের কোনো ব্যবস্থা করেনি, যা বিরল।
এ বিষয়ে প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রধান ড. কামাল হোসেন নির্বাচন কমিশনের কাছে নির্বাচনের আগে মাঠ প্রশাসন ও গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের সচিবদের বদলি করে নিরপেক্ষ কর্মকর্তা পদায়নের অনুরোধ করেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
তদন্ত কমিশন বলছে, ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটের মাঠ সবার জন্য সমান ছিল না। নির্বাচনে অংশগ্রহণের পরপরই প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ও তার জোট শরিকদের ওপর ব্যাপকহারে দমন-পীড়ন শুরু হয়। নির্বিচারে চলে মামলা-হামলা। ব্যাপকহারে বিএনপি কর্মীদের গ্রেফতার করা হয়। বিএনপি ও জোট কর্মীদের কোনো এলাকাতেই নির্বাচনি প্রচারণা করতে দেওয়া হয়নি। বিরোধী রাজনৈতিক কর্মী ও ভোটারদের পুলিশ এবং আওয়ামী লীগ কর্মীদের দিয়ে ভয়-ভীতি দেখানো হয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, একাদশ জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড চেয়ে নির্বাচন কমিশনে আবেদন করেছিলেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রধান ড. কামাল হোসেন। নির্বাচনি প্রচারণা কার্যক্রম পরিচালনা, ভোটে সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টি, বিরোধী মতের ওপর ক্ষমতাসীন সরকারি দল আওয়ামী লীগ ও পুলিশ প্রশাসনের দমন-পীড়ন ও মামলা-হামলার প্রতিকার চেয়ে অনেক প্রার্থী নির্বাচন কমিশনে আবেদন করেন।
সেই ২১৩ কেন্দ্রের ভোটের তথ্য দেখতে এখানে ক্লিক করুন
এমইউ/এমকেআর/জেআইএম