যুদ্ধপরবর্তী গাজার শাসনব্যবস্থা পরিচালনার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে গঠিত ‘বোর্ড অব পিস’- এর নির্বাহী কমিটি প্রত্যাখ্যান করেছে ইসরায়েল। এরই মধ্যে দেশটির শাসক জোটের কট্টর ডানপন্থি মন্ত্রীরা গাজা দখল করে সেখানে নতুন ইসরায়েলি বসতি স্থাপন না করায় প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর তীব্র সমালোচনা করেছেন।
রোববার (১৭ জানুয়ারি) হোয়াইট হাউজ তথাকথিত গাজা ‘বোর্ড অব পিস’ গঠনের ঘোষণা দেয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ইসরায়েলের এই প্রতিক্রিয়া এলো। ‘বোর্ড অব পিস’-এর নির্বাহী কমিটিতে কাতার ও তুরস্কের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে দখলদার দেশটি।
ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থি অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোৎরিচ বলেন, গাজার দায়িত্ব নিতে নেতানিয়াহুর অনিচ্ছাই ছিল ‘মূল পাপ।’ স্মোৎরিচ নিজেও অধিকৃত পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারী।
তার মতে, নেতানিয়াহুর উচিত ছিল- সেখানে একটি সামরিক সরকার প্রতিষ্ঠা করা, অভিবাসন ও বসতি স্থাপন উৎসাহিত করা এবং এভাবেই বহু বছরের জন্য ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
চলতি সপ্তাহে হোয়াইট হাউজ ‘গাজা নির্বাহী বোর্ড’ গঠনের ঘোষণা দেয়। এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সভাপতিত্বে পরিচালিত বৃহত্তর ‘বোর্ড অব পিস’-এর অধীনে কাজ করবে। এই কাঠামো ট্রাম্পের যুদ্ধ শেষ করার ২০ দফা পরিকল্পনার অংশ।
পরামর্শমূলক ভূমিকার কথা বলা এই নির্বাহী বোর্ডে রয়েছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান ও কাতারের কূটনীতিক আলি আল-থাওয়াদি, পাশাপাশি অন্যান্য আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক কর্মকর্তা।
কাতার ও তুরস্কের দিকে ইঙ্গিত করে স্মোৎরিচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, যেসব দেশ হামাসকে অনুপ্রাণিত করেছে, তাদের উপস্থিতি থাকা কোনোভাবেই কাম্য নয়। যারা হামাসকে সমর্থন করেছে ও এখনো আশ্রয় দিচ্ছে, তাদের গাজায় কোনো জায়গা দেওয়া হবে না, ব্যস।
তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে এ বিষয়ে কঠোর অবস্থানে থাকতে হবে, এমনকি, এর জন্য যদি ‘মহান বন্ধু’ ও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দূতদের সঙ্গে বিরোধও বাধে।
রোববার উত্তেজনা প্রশমনের চেষ্টা ও পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণের অংশ হিসেবে নেতানিয়াহু জোটসঙ্গীদের সঙ্গে একটি বৈঠক করেন।
নেতানিয়াহুর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো- তার কট্টর ডানপন্থি মিত্রদের নিয়ন্ত্রণে রাখা। কারণ সরকারের টিকে থাকা তার রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য অস্তিত্বগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও এই গোষ্ঠীটি গত বছরের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতিতেও সম্মত হয়নি।
নেতানিয়াহু নিজেও শনিবার ‘বোর্ড অব পিস’ পরিকল্পনাটির বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, কিছু নিয়োগ ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বয় না করেই করা হয়েছে ও সেগুলো দেশটির নীতির পরিপন্থি। তবে তিনি কার কথা বলছেন, তা নির্দিষ্ট করেননি। একই সঙ্গে তিনি ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে যোগাযোগ করার নির্দেশ দেন।
এর আগেও যুদ্ধ পরবর্তী গাজায় তুরস্কের যে কোনো ভূমিকার কড়া বিরোধিতা করেছে ইসরায়েল। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধের পর থেকে দুই দেশের সম্পর্ক মারাত্মকভাবে অবনতি হয়েছে।
এক্সিকিউটিভ বোর্ডে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি ট্রাম্প ‘বোর্ড অব পিস’-এ তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান, মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি, যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার ও আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইকেও আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
হোয়াইট হাউজ জানায়, ট্রাম্পের পরিকল্পনায় তিনটি কাঠামো থাকবে- ট্রাম্পের সভাপতিত্বে বোর্ড অব পিস, গাজা পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ফিলিস্তিনি প্রযুক্তিবিদদের একটি কমিটি এবং পরামর্শমূলক ভূমিকার গাজা এক্সিকিউটিভ বোর্ড।
ফিলিস্তিনি প্রযুক্তিবিদদের ওই কমিটি শনিবার (১৭ জানুয়ারি) কায়রোতে তাদের প্রথম বৈঠক করেছে।
রয়টার্সের দেখা একটি নথি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন প্রায় ৬০টি দেশে পাঠানো একটি খসড়া সনদে বলা হয়েছে, বোর্ড অব পিসের সদস্যপদ তিন বছরের বেশি রাখতে চাইলে দেশগুলোকে নগদ ১০০ কোটি ডলার অবদান রাখতে হবে।
ব্লুমবার্গ নিউজ প্রথম যে নথির কথা জানায়, তাতে বলা হয়েছে, এই সনদ কার্যকর হওয়ার পর প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রের মেয়াদ সর্বোচ্চ তিন বছর হবে, যা চেয়ারম্যানের অনুমোদনে নবায়নযোগ্য।
তবে এতে আরও বলা হয়েছে, যেসব সদস্য রাষ্ট্র সনদ কার্যকর হওয়ার প্রথম বছরের মধ্যে বোর্ড অব পিসে এক বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি নগদ অর্থ প্রদান করবে, তাদের ক্ষেত্রে এই তিন বছরের সীমা প্রযোজ্য হবে না।
এই কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র জানায়, গাজা যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনা এখন দ্বিতীয় ধাপে প্রবেশ করেছে। এই ধাপে যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে হামাসের নিরস্ত্রীকরণে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পরই গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযান শুরু হয়েছিল।
দ্বিতীয় ধাপে যুদ্ধ বন্ধের পাশাপাশি অন্তর্বর্তী শাসনব্যবস্থা, নিরস্ত্রীকরণ ও পুনর্গঠনের দিকে মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে। তবে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর অব্যাহত সহিংসতার মধ্যে এটি কূটনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার বড় ধরনের বিস্তার হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
এসএএইচ