ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে লক্ষ্য করে যে কোনো হামলাকে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণার শামিল বলে সতর্ক করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। রোববার (১৮ জানুয়ারি) তিনি এই হুঁশিয়ারি দেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা বা ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা বিবেচনা করছেন- এমন জল্পনার প্রেক্ষাপটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে পেজেশকিয়ান বলেন, আমাদের দেশের মহান নেতার ওপর হামলা মানেই ইরানি জাতির বিরুদ্ধে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ ঘোষণা।
ইরানের প্রেসিডেন্ট আরও অভিযোগ করেন, গত দুই সপ্তাহ ধরে দেশজুড়ে চলা বিক্ষোভ ও এতে হাজারো মানুষের মৃত্যুর জন্য যুক্তরাষ্ট্র দায়ী। ইরানের প্রিয় জনগণের জীবনে যদি কষ্ট ও সীমাবদ্ধতা থাকে, তার অন্যতম প্রধান কারণ হলো মার্কিন সরকার ও তার মিত্রদের দীর্ঘদিনের শত্রুতা এবং অমানবিক নিষেধাজ্ঞা।
এর আগে শনিবার (১৭ জানুয়ারি) মার্কিন সংবাদমাধ্যম পলিটিকোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প খামেনির প্রায় ৪০ বছরের শাসনের অবসান চেয়ে তাকে ‘একজন অসুস্থ মানুষ’ বলে আখ্যা দেন। ট্রাম্প বলেন, খামেনির উচিত নিজের দেশ ঠিকভাবে চালানো ও মানুষ হত্যা বন্ধ করা।
ইরানে সর্বশেষ অস্থিরতার সূচনা হয় গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর। লাগামছাড়া মূল্যস্ফীতি, মুদ্রার দরপতন ও তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের বিরুদ্ধে তেহরান থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দ্রুতই সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে প্রতিবাদ রূপ নেয় সরকারবিরোধী আন্দোলনে, যেখানে শাসন পরিবর্তনের দাবিও ওঠে।
আন্দোলন জোরালো হলে ৮ জানুয়ারি ইরানি কর্তৃপক্ষ ইন্টারনেট ও ফোন পরিষেবা প্রায় পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। বৈশ্বিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে বিক্ষোভের ব্যাপ্তি আড়াল করা, যোগাযোগ দমন এবং স্বাধীন সংবাদ পরিবেশনা রুখতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এতে বহু ইরানি কার্যত বাইরের দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।
গত মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) ট্রাম্প ইরানিদের বিক্ষোভ চালিয়ে যেতে ও ‘নিজেদের প্রতিষ্ঠান’ দখল করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সহায়তা আসছে। একই সময় ইরানে হামলা আসন্ন- এমন প্রচারও বাড়তে থাকে।
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর সামরিক হামলার খুব কাছাকাছি চলে গেলেও শেষ পর্যন্ত তা থেকে সরে আসে। আঞ্চলিক ও কূটনৈতিক চাপ বাড়ায় ট্রাম্প সাময়িক বিরতির সিদ্ধান্ত নেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানায়, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলেন, ইরানের পাল্টা হামলার জন্য ইসরায়েল প্রস্তুত নয় ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার কার্যকারিতা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন। একই সঙ্গে সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে সংযমের আহ্বান জানান।
এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ইরানে হামলা সত্যিই খুব কাছাকাছি ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত হামলার নির্দেশ আর দেওয়া হয়নি।
শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প তেহরানের নেতাদের ধন্যবাদ জানান। তার দাবি, তারা ৮০০ জনের নির্ধারিত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা থেকে সরে এসেছে। এর মধ্যে ছিলেন ২৬ বছর বয়সী এরফান সোলতানি, যিনি চলমান অস্থিরতার পর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত প্রথম ইরানি বিক্ষোভকারী।
অধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, পোশাকের দোকানে কর্মরত সোলতানি তেহরানের উত্তর-পশ্চিমের কারাজ শহরে বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার পর গ্রেফতার হন। বুধবার (১৪ জানুয়ারি) তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। গ্রেফতারের পর থেকে সোলতানির পরিবার তার অবস্থার বিষয়ে খুব কম তথ্য পেয়েছিল। তবে সপ্তাহ শেষে পরিবার তার সঙ্গে দেখা করতে সক্ষম হয় ও নিশ্চিত হয় যে তিনি জীবিত।
এদিকে, গত কয়েক দিন ধরে ইরানে আর কোনো বড় বিক্ষোভের খবর পাওয়া যায়নি। দেশটির রাস্তাঘাটে শান্ত অবস্থা বিরাজ করছে। তবে শনিবার (১৭ জানুয়ারি) রাতে তেহরান, শিরাজ ও ইসফাহানের বিভিন্ন এলাকায় মানুষ ঘরের জানালা থেকে খামেনিবিরোধী স্লোগান দেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
এসএএইচ