উগান্ডার রাজধানী কাম্পালার পাহাড়ি নাসাকেরো এলাকায় অবস্থিত স্টেট হাউস হলো দেশটির প্রত্যেক প্রেসিডেন্টের জন্য তৈরি সরকারি বাসভবন। তবে গত চার দশকের বেশি সময় ধরে সেখানে বসবাস করছেন একজনই—ইওয়েরি মুসেভেনি। গত ১৫ জানুয়ারির নির্বাচনে আবারও জয়ী হয়ে টানা সপ্তমবারের মতো ক্ষমতায় বসছেন তিনি।
নির্বাচনে জনপ্রিয় বিরোধী প্রার্থী ও সংগীতশিল্পী রবার্ট ‘ববি ওয়াইন’ কিয়াগুলানির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলেও দেশটির নির্বাচন কমিশন জানায়, মুসেভেনি পেয়েছেন প্রায় ৭২ শতাংশ ভোট। ৮১ বছর বয়সী মুসেভেনি বর্তমানে বিশ্বের তৃতীয় দীর্ঘসময় ধরে ক্ষমতায় থাকা সরকারপ্রধান।
বিশ্লেষকদের মতে, উগান্ডায় তার নিয়ন্ত্রণ প্রায় সর্বাত্মক। ২০২৪ সালে নিজের ছেলে জেনারেল মুহুজি কাইনেরুগাবাকে সেনাপ্রধান নিয়োগ দেন তিনি। এরপর থেকেই মানবাধিকারকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ—ক্ষমতা হস্তান্তরের একটি পারিবারিক বা বংশানুক্রমিক পরিকল্পনা সামনে আসছে কি না।
উগান্ডার প্রায় ৭০ শতাংশ জনগোষ্ঠীর বয়স ৩৫ বছরের নিচে। এই তরুণ প্রজন্মের বড় অংশের কাছে মুসেভেনিই একমাত্র প্রেসিডেন্ট, যাকে তারা চেনে। ২০৩১ সালে বর্তমান মেয়াদ শেষ হলে তার ক্ষমতায় থাকা দাঁড়াবে টানা ৪৫ বছর।
তবে মুসেভেনি একা নন। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে এমন আরও শাসক রয়েছেন, যারা নিয়মিত নির্বাচন আয়োজন করলেও কার্যত কয়েক দশক ধরে ক্ষমতা আঁকড়ে রয়েছেন।
উগান্ডা: ভয়, নির্যাতন আর ‘দুর্নীতির মাধ্যমে দুর্নীতি দমন’রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, উগান্ডায় মুসেভেনির ক্ষমতা ধরে রাখার অন্যতম হাতিয়ার সহিংসতা। বিরোধী রাজনীতিক, সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীদের ওপর নিয়মিত দমন-পীড়ন চালানো হয়।
২০২০ সালে ববি ওয়াইন রাজনীতিতে আবির্ভূত হওয়ার পর তরুণদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান। কিন্তু তার সমাবেশগুলোতে নিরাপত্তা বাহিনীর সহিংসতায় বহু সমর্থক নিহত হন। চলতি নির্বাচনের আগেও বিরোধী শিবিরের ওপর নির্বিচার গ্রেফতার, নির্যাতন ও বলপ্রয়োগের অভিযোগ তুলেছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।
একই সঙ্গে, ক্ষমতাসীন দলের ভেতরেও ভয়ের রাজনীতি চালু রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, মুসেভেনি ইচ্ছা করে নিজের ঘনিষ্ঠদের দুর্নীতিতে জড়াতে দেন, পরে সেটিকেই নিয়ন্ত্রণের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন।
২০০৫ সালে সংবিধান থেকে মেয়াদসীমা তুলে দেওয়ার পর মুসেভেনির অনির্দিষ্টকালের ক্ষমতায় থাকার পথ খুলে যায়। পশ্চিমা সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হলেও সোমালিয়ায় আল-শাবাববিরোধী অভিযানে সেনা পাঠিয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা শক্তির সমর্থন ধরে রেখেছেন।
ক্যামেরুন: নির্বাচনের মোড়কে কর্তৃত্ববাদক্যামেরুনে ২০২৪ সালের অক্টোবরে অষ্টম মেয়াদে জয় পান ৯২ বছর বয়সী প্রেসিডেন্ট পল বিয়া। তিনি বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক ক্ষমতাসীন সরকারপ্রধান। ১৯৮২ সাল থেকে ক্ষমতায় রয়েছেন তিনি।
দীর্ঘ সময় প্রকাশ্যে না থাকা ও দেশের বাইরে অবস্থানের কারণে বিয়াকে বলা হয় ‘অনুপস্থিত প্রেসিডেন্ট’। তবে বিরোধীরা জানতেন, নির্বাচন তার পক্ষেই যাবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ক্যামেরুন একটি ‘নির্বাচনী স্বৈরতন্ত্র’। নির্বাচন আয়োজন করা হলেও নির্বাচন কমিশন কার্যত সরকারেরই অংশ। জাতিগত বিভাজন, তথ্যপ্রচার এবং সীমিত পরিসরে মতপ্রকাশের সুযোগ দিয়ে বিরোধী ক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়।
বিরোধী প্রার্থী ইসা চিরোমার সমর্থনে বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে অন্তত ৪৮ জন নিহত হন। অ্যাংলোফোন অঞ্চলে সরকারের কঠোর অবস্থান থেকে সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী সংঘাতও দীর্ঘদিন ধরে চলছে।
কঙ্গো-ব্রাজাভিল: তেল, বিদেশি মিত্র আর দীর্ঘ শাসনগণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গোতে ডেনিস সাসু এনগুয়েসোও ক্ষমতায় রয়েছেন প্রায় চার দশক। ১৯৭৯ সালে তিনি প্রথম নির্বাচিত হয়ে টানা ১২ বছর দেশ শাসন করেন। পরে নির্বাচনে হেরে গেলেও গৃহযুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৯৭ সালে আবারও ক্ষমতায় ফেরেন। ২০১৫ সালে তিনিও সংবিধান বদলে সরকারপ্রধানের মেয়াদসীমা তুলে দেন।
তেলসমৃদ্ধ দেশ হলেও দুর্নীতির কারণে কঙ্গো চরমভাবে অনুন্নত। বিশ্লেষকদের মতে, ফ্রান্স ও পরে চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এনগুয়েসোর ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে বড় ভূমিকা রেখেছে।
আফ্রিকায় নির্বাচন কি অর্থহীন হয়ে পড়ছে?বিশেষজ্ঞদের মতে, এই শাসকরা সহিংসতা, বিভাজন আর বিদেশি সমর্থনের পাশাপাশি নির্বাচনকেও নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছেন। নির্বাচন এখন অনেক দেশে কেবল আনুষ্ঠানিকতা, নাগরিকদের প্রকৃত মত প্রকাশের সুযোগ নয়।
তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, নির্বাচন বর্জন নয়, বরং ন্যায্য নির্বাচন আদায়ে আইনি লড়াই, আন্দোলন ও নাগরিক প্রতিরোধই একমাত্র পথ।
সূত্র: আল-জাজিরাকেএএ/