লাইফস্টাইল

বিয়ের অনেক বছর পার হলেও সন্তান হচ্ছে না?

বিয়ে হওয়ার কয়েক বছর পেরিয়ে গেলেও সন্তান না হওয়া, অনেক দম্পতির জন্য চরম দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পরিবার ও সমাজের চাপের পাশাপাশি মানসিক অস্থিরতাও বাড়তে থাকে। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এটি কোনো একক ব্যক্তির ব্যর্থতা নয়, বরং শারীরিক, হরমোনজনিত ও জীবনযাপনসংক্রান্ত নানা কারণের সমন্বয়ে তৈরি একটি চিকিৎসাযোগ্য সমস্যা।

সন্তান না হওয়ার কারণ, কখন চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত, কী ধরনের পরীক্ষা প্রয়োজন এবং আধুনিক চিকিৎসায় কীভাবে সমাধান সম্ভব এসব বিষয়ে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগের অধ্যাপক রেজাউল করিম কাজলের সঙ্গে কথা বলেছে জাগো নিউজ।

জাগো নিউজ: বিয়ের অনেক বছর পার হলেও সন্তান হচ্ছে না, এর সাধারণ কারণগুলো কী হতে পারে?

অধ্যাপক রেজাউল করিম কাজল: সাধারণত সন্তান না হওয়ার পেছনে একক কোনো কারণ থাকে না। নারীদের ক্ষেত্রে ডিম্বস্ফোটনের সমস্যা, পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (পিসিওএস), ফ্যালোপিয়ান টিউব ব্লক, এন্ডোমেট্রিওসিস বা জরায়ুর গঠনগত সমস্যা থাকতে পারে। পুরুষদের ক্ষেত্রে শুক্রাণুর সংখ্যা কম হওয়া, গতি বা গুণগত মান কম থাকা, হরমোনজনিত সমস্যা বা জীবনযাপনের নেতিবাচক প্রভাব বড় ভূমিকা রাখে। আবার অনেক সময় উভয়ের ছোট ছোট সমস্যার সমন্বয়েই গর্ভধারণ বিলম্বিত হয়।

জাগো নিউজ: পুরুষ ও নারীর উভয়ের কারণে সন্তান না হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু থাকে?

অধ্যাপক রেজাউল করিম কাজল: পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রায় ৪০ শতাংশ ক্ষেত্রে নারীর কারণে, ৪০ শতাংশ ক্ষেত্রে পুরুষের কারণে এবং বাকি ২০ শতাংশ ক্ষেত্রে উভয়ের যৌথ কারণ বা অজ্ঞাত কারণ দায়ী। তাই সন্তান না হলে শুধু নারীকে দায়ী করা একেবারেই বৈজ্ঞানিক নয়।

জাগো নিউজ: কোন ক্ষেত্রে দম্পতিকে বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়?

অধ্যাপক রেজাউল করিম কাজল: যদি নিয়মিত সহবাস সত্ত্বেও এক বছর চেষ্টা করার পর গর্ভধারণ না হয়, তাহলে বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। তবে নারীর বয়স ৩৫ বছরের বেশি হলে ছয় মাস চেষ্টা করার পরই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া বাঞ্ছনীয়।

জাগো নিউজ: ইনফার্টিলিটি নির্ণয়ের জন্য কোন ধরনের পরীক্ষা বা চেকআপ করা হয়?

অধ্যাপক রেজাউল করিম কাজল: নারীর ক্ষেত্রে আল্ট্রাসনোগ্রাফি, হরমোন পরীক্ষা, ডিম্বস্ফোটন পর্যবেক্ষণ, টিউব পরীক্ষা (এইচএসজি) করা হয়। পুরুষের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সিমেন অ্যানালাইসিস। প্রয়োজনে হরমোন টেস্ট বা অন্যান্য বিশেষ পরীক্ষা করা হতে পারে।

আরও পড়ুন:  স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকলে চোখের পানি দ্রুত শুকিয়ে যায় মাদকাসক্তি শুধু খারাপ অভ্যাস নয়, এটি মানসিক রোগ করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্টে হালকা উপসর্গ, ঝুঁকিতে বৃদ্ধ-শিশুরা

জাগো নিউজ: কতদিন চেষ্টা করার পর দম্পতিকে পরীক্ষা করানো উচিত?

অধ্যাপক রেজাউল করিম কাজল: সাধারণভাবে এক বছর। তবে বয়স বেশি হলে, মাসিক অনিয়মিত হলে, আগে কোনো অপারেশন বা দীর্ঘমেয়াদি রোগ থাকলে অপেক্ষা না করে আগেই পরীক্ষা করানো ভালো।

জাগো নিউজ: কোন বয়সে বা কোন অবস্থায় পরীক্ষার ক্ষেত্রেবিশেষ সতর্কতা নেওয়া জরুরি?

অধ্যাপক রেজাউল করিম কাজল: ৩৫ বছরের পর নারীদের ডিম্বাণুর সংখ্যা ও গুণগত মান দ্রুত কমতে থাকে। এছাড়া থাইরয়েড সমস্যা, ডায়াবেটিস, অতিরিক্ত ওজন, ধূমপান বা মানসিক চাপ থাকলে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।

জাগো নিউজ: সাধারণত সন্তান না হওয়ার সমস্যার জন্য কোন চিকিৎসা বা থেরাপি সবচেয়ে কার্যকর?

অধ্যাপক রেজাউল করিম কাজল: কারণভেদে চিকিৎসা ভিন্ন হয়। ওষুধের মাধ্যমে ডিম্বস্ফোটন করানো, হরমোন থেরাপি, ছোটোখাটো সার্জারি এসবেই অনেক দম্পতি সফল হন। সব ক্ষেত্রে আইভিএফ প্রয়োজন হয় না।

জাগো নিউজ: আইভিএফ ও অন্যান্য সহায়ক প্রজনন প্রযুক্তি (এআরটি) সম্পর্কে সাধারণ মানুষের কী জানা উচিত?

অধ্যাপক রেজাউল করিম কাজল: আইভিএফ হলো এমন একটি পদ্ধতি যেখানে শরীরের বাইরে ডিম্বাণু ও শুক্রাণু নিষিক্ত করে ভ্রূণ তৈরি করে জরায়ুতে স্থাপন করা হয়। এটি চিকিৎসার শেষ ধাপ। সাফল্যের হার বয়স ও শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভরশীল। তাই অযথা ভয় না পেয়ে সঠিক সময়ে সঠিক তথ্য নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।

জাগো নিউজ: চিকিৎসা নেওয়ার আগে জীবনযাপন বা খাদ্যাভ্যাসে কোনো পরিবর্তন দরকার হতে পারে?

অধ্যাপক রেজাউল করিম কাজল: স্বাস্থ্যকর খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত ব্যায়াম, ধূমপান ও মাদক বর্জন এ পরিবর্তনগুলো অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসার চেয়েও কার্যকর ভূমিকা রাখে।

জাগো নিউজ: ইনফার্টিলিটি মানসিক চাপও দেয়, তা কীভাবে মোকাবিলা করা যায়?

অধ্যাপক রেজাউল করিম কাজল: মানসিক চাপ সরাসরি হরমোনের ওপর প্রভাব ফেলে। দম্পতির একে অপরকে বোঝা, পরিবারের ইতিবাচক সমর্থন, প্রয়োজনে কাউন্সেলিং নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

জাগো নিউজ: খাদ্য, ব্যায়াম ও জীবনধারার কোন বিষয়গুলো সন্তানের সম্ভাবনা বাড়াতে সহায়ক?

অধ্যাপক রেজাউল করিম কাজল: শাক-সবজি, ফল, প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার, আয়রন ও ফলিক অ্যাসিড গ্রহণ, অতিরিক্ত ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং হালকা ব্যায়াম এসব গর্ভধারণের সম্ভাবনা বাড়ায়।

জাগো নিউজ: বাংলাদেশে দম্পতিদের জন্য সরকারি বা বেসরকারি সহায়ক প্রোগ্রাম আছে কি?

অধ্যাপক রেজাউল করিম কাজল: সরকারি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে স্বল্প খরচে ইনফার্টিলিটি সেবা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে আধুনিক এআরটি সুবিধাও রয়েছে। তবে চিকিৎসা শুরুর আগে অবশ্যই অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ বেছে নেওয়া জরুরি।

জাগো নিউজ: মূল্যবান সময় দেওয়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ। সবশেষে পাঠকদের জন্য আপনার বার্তা কী?

অধ্যাপক রেজাউল করিম কাজল: আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি তুলে ধরার জন্য। সবশেষে একটা কথাই বলবো সন্তান না হওয়া কোনো লজ্জার বিষয় নয় এবং এটি কোনো একক ব্যক্তির ব্যর্থতাও নয়। সময়মতো সঠিক চিকিৎসা, সচেতনতা ও মানসিক সমর্থন থাকলে অধিকাংশ দম্পতির পক্ষেই সুস্থভাবে বাবা-মা হওয়া সম্ভব।

জেএস/এমএমএআর/এমএফএ