আন্তর্জাতিক

যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনবিরোধী অভিযান জোরদার, বাড়ছে নিহতের সংখ্যা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিবাসনবিরোধী অভিযান ঘিরে নিহতের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। শনিবার (২৪ জানুয়ারি) মিনিয়াপোলিসে এক ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় সরকারের কঠোর অভিযান নিয়ে সমালোচনা আরও তীব্র হয়েছে।

জানুয়ারি মাসে অভিবাসন আইন প্রয়োগের সময় অন্তত পাঁচটি গুলির ঘটনা ঘটলো। এর মধ্যে মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের নারী রেনে গুডের মৃত্যুও রয়েছে। এছাড়া এই মাসে ফেডারেল বাহিনীর হেফাজতে অন্তত ছয়জন অভিবাসীর মৃত্যু হয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসন অভিবাসন আইন প্রয়োগে ব্যাপকভাবে তৎপরতা বাড়িয়েছে। ২০২৯ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অভিবাসন সংস্থাগুলোর জন্য ১৭০ বিলিয়ন ডলারের বাজেট বরাদ্দ করা হয়েছে, যা ইতিহাসে সর্বোচ্চ।

এই মাসে মিনিয়াপোলিস ট্রাম্প প্রশাসনের অভিযানের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রায় ৩ হাজার ফেডারেল এজেন্ট মোতায়েন করা হয়েছে। মাইনাস তাপমাত্রা উপেক্ষা করে শুক্রবার হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেন। তারা এই অভিযান প্রত্যাহারের দাবি জানান। মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের কর্মকর্তারা এ পরিস্থিতিকে কার্যত ‘দখলদারিত্ব’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

ট্রাম্পের দাবি, অপরাধীদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরিয়ে দিতে এসব কড়া ও সামরিক ধাঁচের অভিযান প্রয়োজন। তবে গ্রেফতার হওয়া অনেকেই কেবল বেসামরিক অভিবাসন আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে আটক হয়েছেন, যা আইনের দৃষ্টিতে ট্রাফিক আইন ভঙ্গের মতো একটি বিষয়।

শনিবার মিনিয়াপোলিসে নিহত ব্যক্তি একজন মার্কিন নাগরিক। সংবাদমাধ্যমের তথ্যে তিনি ৩৭ বছর বয়সী অ্যালেক্স প্রেটি। পেশায় একজন নার্স এবং বৈধভাবে অস্ত্র বহনের অনুমতি ছিল তার।

যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ জানায়, প্রেটি অস্ত্র ছাড়তে অস্বীকৃতি জানালে এক বর্ডার প্যাট্রোল এজেন্ট তাকে গুলি করেন। তবে স্থানীয় নেতারা এই বর্ণনাকে প্রশ্নবিদ্ধ বলে মন্তব্য করেছেন।

রয়টার্স যাচাইকৃত ভিডিওতে দেখা যায়, প্রেটি মোবাইল ফোনে ছবি তুলছিলেন, এ সময় এজেন্টরা তাকে ও অন্য বিক্ষোভকারীদের ওপর পিপার স্প্রে ব্যবহার করেন। ভিডিওতে তার হাতে কোনো অস্ত্র দেখা যায় না। একপর্যায়ে একাধিক এজেন্ট তাকে মাটিতে ফেলে ধরার পর গুলির শব্দ শোনা যায়।

এই ঘটনা ঘটে রেনে গুডের মৃত্যুর কিছুদিন পর। চলতি মাসের শুরুতে আইসিই কর্মকর্তা জোনাথন রস গুডের গাড়িতে গুলি চালান।

ঘটনার পরপরই হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সচিব ক্রিস্টি নোএম গুডকে ‘ঘরোয়া সন্ত্রাসী’ বলে আখ্যা দেন এবং দাবি করেন তিনি আইসিই কর্মকর্তাকে গাড়ি দিয়ে চাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তবে এ দাবির পক্ষে কোনো সন্ত্রাসবাদ-সংক্রান্ত প্রমাণ দেওয়া হয়নি। ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, গুডের গাড়ি কর্মকর্তার পাশ দিয়ে চলে যাওয়ার সময় গুলি ছোড়া হয়।

গুডের মৃত্যুর পরদিন ওরেগনের পোর্টল্যান্ডে এক বর্ডার প্যাট্রোল এজেন্ট এক ভেনেজুয়েলান পুরুষ ও নারীকে গুলি করে আহত করেন। হোমল্যান্ড সিকিউরিটির দাবি, এটি ছিল একটি ‘লক্ষ্যভিত্তিক গাড়ি থামানোর অভিযান’।

ডিএইচএস জানায়, ভেনেজুয়েলার নাগরিক লুইস নিনো-মোনকাদা এজেন্টদের ওপর গাড়ি তুলে দেওয়ার চেষ্টা করলে গুলি চালানো হয়। এতে তিনি ও তার সঙ্গে থাকা নারী ইয়োরলেনিস জামব্রানো-কনত্রেরাস আহত হন।

পরে বিচার বিভাগ নিনো-মোনকাদার বিরুদ্ধে একজন কর্মকর্তাকে আক্রমণের অভিযোগ আনে। জামব্রানো-কনত্রেরাস ২০২৩ সালে অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের দায় স্বীকার করেছেন।

১৫ জানুয়ারি মিনিয়াপোলিসে আইসিই এজেন্টরা হুলিও সিজার সোসা-সেলিসকে গুলি করে তার পায়ে আঘাত করেন। ডিএইচএস দাবি করে, তিনি পালানোর চেষ্টা করেছিলেন এবং এ সময় এক কর্মকর্তা আঘাত পান।

তবে এ সপ্তাহে প্রকাশিত আদালতের নথিতে ভিন্ন তথ্য উঠে আসে। সেখানে বলা হয়, আইসিই কর্মকর্তারা ভুল নম্বর প্লেট স্ক্যান করে অন্য একজনকে ধাওয়া করেছিলেন, যার ফলেই সংঘর্ষ ও গুলির ঘটনা ঘটে।

২০২৬ সালের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত আইসিই হেফাজতে অন্তত ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। গত বছর আইসিই হেফাজতে ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছিল, যা গত দুই দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ।

কিউবার অভিবাসী জেরাল্ডো লুনাস কাম্পোসের মৃত্যু নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে। আইসিই প্রথমে জানায়, টেক্সাসে একটি সামরিক ঘাঁটির ভেতরে স্থাপিত আটক কেন্দ্রে তিনি ‘শারীরিক অসুস্থতায়’ মারা যান।

পরে নতুন বিবৃতিতে বলা হয়, তিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন এবং নিরাপত্তা কর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় মারা যান। তবে এল পাসো কাউন্টির মেডিকেল এক্সামিনারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গলা ও দেহে চাপের কারণে শ্বাসরোধ হয়ে তার মৃত্যু হয়েছে, যা হত্যাকাণ্ড হিসেবে বিবেচিত।

১৪ জানুয়ারি আরও দুই অভিবাসী আটক অবস্থায় মারা যান—একজন নিকারাগুয়ার নাগরিক টেক্সাসের সামরিক ঘাঁটির আটক কেন্দ্রে এবং অন্যজন জর্জিয়ার একটি কেন্দ্রে। আইসিই জানায়, এসব ঘটনার তদন্ত চলছে।

আইসিইর তথ্যমতে, জানুয়ারির শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রে রেকর্ড ৬৯ হাজার অভিবাসী আটক ছিলেন। এর মধ্যে প্রায় ৪৩ শতাংশের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধমূলক অভিযোগ বা সাজা ছিল না।

সূত্র: রয়টার্স

এমএসএম