ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসছে রাজনীতির মাঠে ততই যেন উত্তাপ ছড়াচ্ছে। নেতাকর্মীদের পাশাপাশি প্রার্থীদের মধ্যেও আবেগ-উত্তেজনা ভর করেছে। প্রার্থীরা প্রচার-প্রচারণায় গিয়ে নানা ধরনের বক্তব্য ও প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। পাশাপাশি প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিকভাবে ঘায়েল করতে ছুড়ছেন বাক্যবাণ। ফলে ভোটের মাঠ যেন বাগযুদ্ধের মাঠে পরিণত হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে পুলিশের সর্বশেষ মূল্যায়ন ও বিশেষ শাখার প্রতিবেদন অনুসারে রাজশাহী বিভাগের অর্ধেকের বেশি ভোটকেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অতীতে যেসব ভোটকেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলাজনিত বিচ্যুতি ও সহিংসতার রেকর্ড আছে সেগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাজশাহীর ৩৯টি সংসদীয় আসনে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্র চিহ্নিত করা হয়েছে রাজশাহী ও বগুড়ায়। তবে ভোটকেন্দ্রগুলোতে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রস্তুতিও চলছে পুরোদমে। ভোট গ্রহণের দিন এসব কেন্দ্রে যাতে কোনো ধরনের সহিংসতা না ঘটে সে বিষয়ে কাজ করছে পুলিশসহ সংশ্লিষ্টরা।
রাজশাহী বিভাগের আওতাধীন আট জেলার ৩৯টি সংসদীয় আসনে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সুষ্ঠুভাবে ভোট গ্রহণের প্রস্তুতি চলমান রয়েছে। এসব আসনে মোট হালনাগাদ ভোটার সংখ্যা ১ কোটি ৫৪ লাখ ১০৩ জন। বিভাগের আট জেলার এসব ভোটার ৫ হাজার ৫০৪টি ভোটকেন্দ্রে ভোট দেবেন। এসব ভোটকেন্দ্রের মধ্যে অর্ধেকের বেশি কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ।
রাজশাহী রেঞ্জ পুলিশের সূত্রমতে, রাজশাহী বিভাগের আট জেলার ৫ হাজার ৫০৪টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ২ হাজার ৭৮৬ ভোটকেন্দ্রকে প্রাথমিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়া বাকি কেন্দ্রেগুলোর মধ্যে ১ হাজার ৩০৭টি কেন্দ্র আংশিক ঝুঁকিপূর্ণ হলেও সেগুলো তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। এসব কেন্দ্রের ঝুঁকি কমাতে সংসদীয় আসনগুলোতে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী বিভিন্ন প্রার্থীসহ নানা শ্রেণি ও পেশার মানুষের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে মতবিনিময় করা হবে। সুষ্ঠুভাবে ভোট গ্রহণ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির কোনো ঘাটতি থাকবে না। ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালনকারী সংশ্লিষ্ট সবাইকে কঠোরভাবে আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
এদিকে রাজশাহী বিভাগের মধ্যে বগুড়ায় সর্বাধিক সাতটি আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ২৯ লাখ ৮১ হাজার ৯৪০ জন। বিভাগের মধ্যে বগুড়া জেলায় ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের সংখ্যা বেশি। বগুড়ার ৯৮৩ ভোট কেন্দ্রের মধ্যে ৫০১টি কেন্দ্র অধিক ঝুঁকিপূর্ণ। বাকি ৪৮২টি সাধারণ ভোটকেন্দ্র। অন্যদিকে রাজশাহীর ছয়টি আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ২২ লাখ ৯২ হাজার ১১৮ জন। এসব ভোটার জেলার ৭৭৮টি কেন্দ্রে ভোট দেবেন। এসব কেন্দ্রের মধ্যে ৪৩৯টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
পুলিশের তালিকা অনুযায়ী, রাজশাহী জেলাতেও ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা বেশি। চাঁপাইনবাবগঞ্জের তিনটি আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ১৪ লাখ ২১ হাজার ৬৬০ জন ভোটার ৫১৫টি কেন্দ্রে ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। এসব কেন্দ্রের মধ্যে ৩৪২টি কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ। এই জেলার বেশিরভাগ কেন্দ্রই ঝুঁকিপূর্ণ।
অন্যদিকে নাটোরের ৪টি আসনের মোট ভোটার সংখ্যা ১৫ লাখ ৪৭ হাজার ২০৬ জন। এসব ভোটার ৭৮০টি কেন্দ্রে ভোট দেবেন। এসব কেন্দ্রের মধ্যে ১৯২ কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিভাগের মধ্যে নাটোর জেলায় ঝুঁকিপূর্ণ ভোট কেন্দ্রের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। বিভাগের নওগাঁ জেলার ছয়টি আসনের মোট ভোটার সংখ্যা ২৬ লাখ ২৯ হাজার ৫৯২ জন। জেলায় ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ৭৮২টি। এসব কেন্দ্রের মধ্যে ৩৬৪টিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। সিরাজগঞ্জের ছয়টি আসনের ২৬ লাখ ৮৬ হাজার ৮৫৮ জন ভোটার জেলার ৯২৩টি কেন্দ্রে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। এসব কেন্দ্রের মধ্যে ৪৬২টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনা করা হচ্ছে। বাকি ৪৬১টি সাধারণ কেন্দ্র। এই জেলার অর্ধেক কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ।
পাবনার ৫টি আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ২২ লাখ ৯৩ হাজার ৩৪১ জন। পাবনার ৭১২টি ভোট কেন্দ্রের মধ্যে ২৬৯টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের তালিকায় রাখা হয়েছে। সর্বশেষ জয়পুরহাট জেলার দু’টি আসনের মোট ভোটার সংখ্যা ৮ লাখ ১৭ হাজার ৮৪৬ জন। জেলায় ভোট কেন্দ্রের সংখ্যা ২৫৫টি। এই জেলার ১৭৬টি কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি ড. মোহাম্মদ শাহজাহান জানান, বিভাগের ভোটকেন্দ্র গুলোর ঝুঁকি বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে মূল্যায়ন করা হয়েছে। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। আজকে যে কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে, দেখা গেলো ভোটের দিন সেখানে কিছুই ঘটলো না। আবার যে কেন্দ্রকে স্বাভাবিক ধরা হয়েছিল সেখানেই কিছু ঘটলো।
তিনি আরও জানান, রাজশাহী বিভাগের আট জেলায় পুলিশের মোট জনবল ১১ হাজারের কিছু বেশি। প্রতিটি কেন্দ্রে পুলিশ, আনসার, বিভিন্ন বাহিনীর সমন্বিত ফোর্স নিয়োজিত থাকবে। ভোট গ্রহণের আগের দিন পর্যন্ত ভোটকেন্দ্র গুলোর ধরন, পরিস্থিতি ও ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হবে। সুষ্ঠুভাবে ভোট গ্রহণের সম্ভাব্য সকল উদ্যোগ ও চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে পুলিশের।
রাজশাহী বিভাগের আট জেলার ৩৯ আসনে মোট ভোটকেন্দ্রের মধ্যে অধিক সংখ্যক কেন্দ্রই ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার বিষয়ে বিভাগীয় আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা আনিছুর রহমান জানান, কেন্দ্রগুলোর অতীত রেকর্ড, চলমান প্রবণতা ও দুর্গমতা ইত্যাদি বিবেচনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থা ঝুঁকি নিরূপণ করেন। আমাদের ভাষায় এসব কেন্দ্রকে আমরা গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করি। ঝুঁকি যথাসম্ভব কমিয়ে সুষ্ঠুভাবে ভোট গ্রহণ সম্পন্ন করার কাজটি আমরা সমন্বিতভাবে করছি।
সাখাওয়াত হোসেন/এফএ/জেআইএম