গ্রামের অলিগলি পেরোলেই চোখে পড়ে শিশুদের গলায় ঝোলানো কালো সুতা, নারীদের কোমরে বাঁধা ছোট কাপড়ের পুঁটলি কিংবা পুরুষের বাহুতে শক্ত করে বাঁধা কয়েক টুকরো বস্তু। কারো বিশ্বাস এতে জ্বর সারে, কারো মতে দুর্ভাগ্য কাটে, আবার অনেকের ধারণা ভূত-জ্বীন থেকে নিরাপদে থাকা যাবে। কেউ কেউ বিশ্বাস করেন বদনজর কিংবা অশুভ আত্মা দূরে থাকে। গ্রামবাংলার এই পরিচিত অনুষঙ্গের নাম ‘মাদুলি’ বা ‘তাবিজ’ যা বিশ্বাসের মোড়কে গেঁথে আছে ভ্রান্ত ধারণার এক দীর্ঘ ইতিহাস।
বিশ্বাসের শেকড় কোথায়?মাদুলি বা তাবিজে বিশ্বাস নতুন নয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে লোকজ সংস্কৃতির অংশ হয়ে এটি টিকে আছে। গ্রামে অসুখ-বিসুখ দেখা দিলেই আগে ডাকা হয় কবিরাজ বা ফকিরকে। আধুনিক চিকিৎসার আগে কিংবা চিকিৎসার পাশাপাশি তাবিজ পরানো হয় ‘নিশ্চয়তার জন্য’।
পটুয়াখালীর বাসিন্দা তোরাব আলীর ভাষায়, ‘তাবিজে মানুষিক শক্তি পাওয়া যায়। হুজুরের দোয়া থাকে, বদজ্বীন পালানোর দোয়া এতে লেখা থাকে। তাবিজে ক্ষতি কী? রাখলে তো ভালোই।’
এই ‘ভালো থাকার’ আশ্বাসই মাদুলিকে টিকিয়ে রেখেছে। বিশেষ করে যখন রোগের কারণ অজানা, পরিবারে হঠাৎ কারো মৃত্যু কিংবা দুর্যোগ অনিবার্য তখন মানুষ আশ্রয় খোঁজে অতিপ্রাকৃত শক্তির কাছে।
বরগুনার গগন মেমোরিয়াল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা হোসনে আরা হাসি বলেন, ‘গ্রামে যারা তাবিজ ব্যবহার করে- তারা মনে এক ধরনের শক্তি ও শান্তি অনুভব করে। মনের সেই জোড়ের ফলে অনেকেই চিন্তামুক্ত হন, এ কারণেই অনেক রোগ কমে যায়। ফলে তাবিজের গ্রহণযোগ্যতা আরো বাড়ে। বিষয়টি যেন-‘ঝড়ে কাক মরে, ফকিরের কেরামতি বাড়ে’ - এমন।’
রোগ পালায় না, বাড়ে ঝুঁকিচিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মতে, তাবিজ বা মাদুলির কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বরং এসবের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা অনেক সময় রোগীর চিকিৎসা বিলম্বিত করে। জ্বর, ডায়রিয়া বা নিউমোনিয়ার মতো রোগে দ্রুত চিকিৎসা না পেলে প্রাণনাশের ঝুঁকি থাকে। কিন্তু ‘মাদুলি দিলেই সেরে যাবে’ এই বিশ্বাসে অনেক পরিবার হাসপাতালে যেতে দেরি করে।
উপকূলীয় জেলা বরিশালে অবস্থিত শীর্ষস্থানীয় সরকারি চিকিৎসা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শেরে বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক সামসুদ্দোহা সামস বলেন, ‘শিশু মৃত্যুর পেছনে এমন ভ্রান্ত বিশ্বাসও দায়ী। অনেক মা-বাবা শিশুর গলায় তাবিজ বেঁধেই নিশ্চিন্ত থাকেন, অথচ টিকাদান বা ওষুধের কথা ভাবেন না।
ভয় ও অজ্ঞতার সুযোগএই বিশ্বাসকে পুঁজি করে গড়ে উঠেছে এক শ্রেণির সুযোগসন্ধানী মানুষ। ফকির, তান্ত্রিক বা কথিত ওঝারা মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে তাবিজ দেন। কখনো কোরআনের আয়াত, কখনো অজানা চিহ্ন, কখনো শুকনো গাছের ছাল সবই বিক্রি হয় অলৌকিক ক্ষমতার মোড়কে। অসহায় ও অশিক্ষিত মানুষ তাদের কথায় সহজেই প্রভাবিত হন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কেবল বিশ্বাসের বিষয় নয়; এটি এক ধরনের সামাজিক প্রতারণা।
কেন বদলাচ্ছে না বিশ্বাস?প্রশ্ন ওঠে এত সচেতনতার পরও কেন মাদুলি-তাবিজের প্রতি বিশ্বাস অটুট? বরিশাল সরকারি ব্রজমোহন কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক ড. মু. ইব্রাহীম খলিলের মতে, দারিদ্র্য, শিক্ষার অভাব এবং স্বাস্থ্যসেবার অপ্রতুলতা এর মূল কারণ। যখন চিকিৎসা দূরের বা ব্যয়বহুল মনে হয়, তখন মানুষ আশ্রয় নেয় সহজলভ্য বিশ্বাসে। এছাড়া ধর্ম ও সংস্কৃতির ভুল ব্যাখ্যাও বড় ভূমিকা রাখে। অনেকেই ধর্মীয় অনুশাসনের সঙ্গে কুসংস্কারকে গুলিয়ে ফেলেন।
পথ কোন দিকে?বিশেষজ্ঞদের মতে, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে কেবল নিষেধ নয়, প্রয়োজন সচেতনতা ও বিকল্প পথ দেখানো। গ্রামভিত্তিক স্বাস্থ্য শিক্ষা, স্কুলের পাঠ্যক্রমে বিজ্ঞানমনস্কতা এবং স্থানীয় ধর্মীয় নেতাদের সম্পৃক্ততা এই বিশ্বাস ভাঙতে সহায়ক হতে পারে।
মাদুলি বা তাবিজ হয়ত একদিনে হারিয়ে যাবে না। তবে মানুষ যদি বুঝতে পারে রোগ পালায় ওষুধে, ভয় কাটে জ্ঞানে, আর নিরাপত্তা আসে সচেতনতায় তবেই ধীরে ধীরে বদলাবে গ্রামবাংলার এই চেনা ছবি। আরও পড়ুনবিয়েতে পুরুষত্বের প্রমাণ দিতে সহ্য করতে হয় চাবুকের আঘাতনতুন প্রজন্ম জানে না শহীদ আসাদের ইতিহাস!
কেএসকে