গর্ভধারণের শেষ দিকে প্রতিটি নারীই অস্থির হন একটি চিন্তায়। সেটি হলো স্বাভাবিক প্রসব করা উচিত নাকি সিজারিয়ান অপারেশন করানো? বর্তমান সময়ে বিভিন্ন সামাজিক প্রভাব, স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং চিকিৎসা পদ্ধতির কারণে এই প্রশ্নটি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। এই প্রশ্নের উত্তরে বিস্তারিত জানিয়েছেন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগের অধ্যাপক ডা. রেজাউল করিম কাজল।
ডা. কাজল বলেন, যদি মা এবং শিশুর স্বাস্থ্য স্বাভাবিক থাকে, স্বাভাবিক প্রসব সবসময়ই সেরা এবং নিরাপদ পদ্ধতি। স্বাভাবিক প্রসব বলতে বোঝায় গর্ভধারণ শেষ পর্যায়ে শিশুকে যোনির মাধ্যমে জন্ম দেওয়া। এর কিছু সুবিধা হলো-
শরীরিক পুনরুদ্ধারের গতি: স্বাভাবিক প্রসবের পরে শরীর দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে এবং রক্তক্ষরণ কম হয়। শিশুর শ্বাসপ্রশ্বাস ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা: যোনির মাধ্যমে জন্ম নেওয়া শিশুর ফুসফুস এবং ইমিউন সিস্টেম দ্রুত সক্রিয় হয়। মানসিক উপকারিতা: অনেক মা স্বাভাবিক জন্মের পরে সন্তুষ্টি ও আনন্দ অনুভব করেন। হাসপাতালে দীর্ঘ সময় কাটানোর প্রয়োজন কম: স্বাভাবিক প্রসবের পরে সাধারণত মা ও শিশু দ্রুত বাড়ি ফেরতে পারেন। ছবি:বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগের অধ্যাপক ডা. রেজাউল করিম কাজল সিজারিয়ান প্রসবডা. কাজল বলেন, সিজারিয়ান শুধুমাত্র প্রয়োজন অনুযায়ী করা উচিত। অযথা অপারেশন করলে মা ও শিশুর জন্য ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। সিজারিয়ান অপারেশন হল একটি শল্যচিকিৎসার মাধ্যমে শিশুকে জন্ম দেওয়ার পদ্ধতি। এটি প্রয়োজন যখন স্বাভাবিক প্রসব ঝুঁকিপূর্ণ হয়। সিজারিয়ান যখন প্রয়োজন হতে পারে-
শিশুর অবস্থান অনিয়মিত মায়ের কঙ্কাল বা কোমরের সমস্যা পূর্ববর্তী সিজারিয়ান জন্মের ইতিহাস গর্ভকালীন জটিলতা, যেমন প্লেসেন্টা প্রিভিয়া বা প্রি-ইক্ল্যাম্পসিয়া শিশুর স্বাস্থ্য ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় (যেমন অতিরিক্ত বড় বা ছোট) প্রসবের সময় দীর্ঘমেয়াদী ব্যথা বা প্রসব বন্ধ হয়ে যাওয়া আরও পড়ুন: সুস্থ মাতৃত্বের প্রথম ধাপ, গর্ভধারণের আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষা মাসিক ও হরমোনের সমস্যায় সচেতনতা জরুরি বিয়ের আগে যাদের জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল খেতে হয় বিয়ের অনেক বছর পার হলেও সন্তান হচ্ছে না? সাধারণ মানুষ কিভাবে বুঝবে কোনটি উপযুক্ত?এ বিষয়ে ডা. কাজল উল্লেখ করেন, সাধারণ মানুষকে ভুল ধারণা থেকে বিরত থাকতে হবে। প্রতিটি মা ও শিশুর জন্য উপযুক্ত পদ্ধতি আলাদা। তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়াই নিরাপদ পথ। তবে গর্ভবতী মা বা পরিবার সহজভাবে এই নির্দেশাবলী অনুসরণ করতে পারেন-
ডাক্তারের পরামর্শ: প্রতিটি গর্ভবতী মহিলাকে নিয়মিত প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে চেকআপ করতে হবে। ডাক্তার মাতৃত্বের ইতিহাস, গর্ভকালীন স্বাস্থ্য ও শিশুর অবস্থার ভিত্তিতে সঠিক পরামর্শ দেবেন।স্বাস্থ্য ও উপসর্গ পর্যবেক্ষণ: যদি প্রচণ্ড ব্যথা, রক্তপাত, হঠাৎ শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়, ডাক্তার সঙ্গে অবিলম্বে যোগাযোগ করতে হবে।পূর্ববর্তী ইতিহাস যাচাই: পূর্ববর্তী প্রসব, বিশেষ করে সিজারিয়ান বা জটিল প্রসবের ইতিহাস থাকলে সতর্কতা জরুরি।শিশুর অবস্থান ও সাইজ: আল্ট্রাসাউন্ড এবং অন্যান্য পরীক্ষার মাধ্যমে শিশুর অবস্থান ও আকার যাচাই করা।মায়ের শারীরিক স্বাস্থ্য: হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ইত্যাদি সমস্যার প্রভাব।
সচেতনতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণডা. কাজল বলেন, সাধারণ মানুষকে বোঝা উচিত, প্রসব পদ্ধতি শুধুমাত্র মা ও শিশুর স্বাস্থ্যের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা উচিত। সামাজিক প্রভাব বা সুবিধার কারণে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। সচেতন হওয়া এবং চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ সবচেয়ে নিরাপদ।
ডা. কাজল সতর্ক করে বলেন, সর্বোপরি স্বাভাবিক প্রসব ও সিজারিয়ান উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি, তবে মায়ের এবং শিশুর স্বাস্থ্য ও পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়াই প্রধান। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, চিকিৎসকের পরামর্শ এবং স্বাস্থ্য সচেতনতা সুস্থ মাতৃত্বের চাবিকাঠি।
জেএস/