বাইরে থেকে সাদাসিধে আর ভেতরে জমা হয় অসংখ্যা ছোট ছোট স্বপ্ন। বলছি মাটির ব্যাংকের কথা। এই সাধারণ মাটির জিনিসটি যে কি অসাধারণ খুশি বয়ে আনা তা একমাত্র প্রয়োজনেই অনুভব করা যায়। মাটির ব্যাংকে কয়েন ফেলার যে টুংটাং শব্দ হয় তা শুধু ধাতব শব্দ নয়, বরং ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার এক নীরব বার্তা। আধুনিক সময়ে যখন সবকিছু অ্যাপ, কার্ড আর ডিজিটাল সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ, তখন মাটির ব্যাংক যেন ধীরে চলা জীবনের এক নির্ভরযোগ্য পাঠশালা।
সম্প্রতি ‘মাটির ব্যাংকে টাকা জমিয়ে নির্বাচন’ এমন খবর প্রকাশ করেছে অনেক গণমাধ্যম। যা পড়ে জানা গেছে নির্বাচনি খরচ জোগাতে প্রথম দিনে ১০টি মাটির ব্যাংক ভেঙে ১০ হাজার টাকা অর্থ সহায়তা পেয়েছেন বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ মনোনীত বরিশাল সদর আসনের প্রার্থী ডা. মনীষা চক্রবর্তী। এ পাওয়া শুধু মাত্র অর্থের জোগান নয়, এটা প্রকৃত ভালোবাসার এক অনন্য উদাহরণ।
ছবি: মাটির ব্যাংক ভেঙে ১০ হাজার টাকা অর্থ সহায়তা পেয়েছেন বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ মনোনীত বরিশাল সদর আসনের প্রার্থী ডা. মনীষা চক্রবর্তী
শৈশবের অভ্যাস, সারাজীবনের শিক্ষাবাংলাদেশের বহু ঘরে শিশুর প্রথম সঞ্চয়ের মাধ্যম ছিল মাটির ব্যাংক। ঈদের সালামি, ভালো ফলের পুরস্কার কিংবা নানাবাড়ি থেকে পাওয়া দু’একটা পয়সা সব মাটির ব্যাংকের ভেতর জমতে থাকত। এই অভ্যাস শিশুকে শেখায় অপেক্ষা করতে, লোভ সামলাতে এবং লক্ষ্য ঠিক করে সঞ্চয় করতে। অর্থনীতিবিদদের মতে, ছোট বয়সে সঞ্চয়ের অভ্যাস তৈরি হলে বড় বয়সে আর্থিক সিদ্ধান্ত অনেক বেশি বাস্তবসম্মত হয়।
মাটির ব্যাংকের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর দৃশ্যমানতা। প্রতিদিন কয়েন ফেললে ওজন বাড়ে, শব্দ বদলায়; শিশু কিংবা বড় যে কেউই বুঝতে পারে তার পরিশ্রমের ফল জমছে। এই দৃশ্যমান অগ্রগতি মানুষের মস্তিষ্কে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, হাতে ধরে অনুভব করা সঞ্চয় মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও আত্মবিশ্বাস বাড়ায়।
কেন এখনো প্রাসঙ্গিক মাটির ব্যাংক?অনেকে ভাবেন, ব্যাংক হিসাব বা মোবাইল লেনদেন থাকলে মাটির ব্যাংকের দরকার কী? বাস্তবতা হলো মাটির ব্যাংক বড় অঙ্কের সঞ্চয়ের বিকল্প নয়, বরং ছোট অঙ্কের নিয়মিত সঞ্চয়ের প্রশিক্ষণ। প্রতিদিনের অপ্রয়োজনীয় খরচ এক কাপ অতিরিক্ত চা, ছোটখাটো কেনাকাটা এসব কমিয়ে সেই টাকাই ব্যাংকে গেলে মাস শেষে চোখে পড়ার মতো অঙ্ক দাঁড়ায়।
আর্থিক শৃঙ্খলার নীরব শিক্ষকমাটির ব্যাংক সহজে ভাঙা যায় না, এই সীমাবদ্ধতাই এর শিক্ষা। হুটহাট টাকা তোলার সুযোগ না থাকায় মানুষ শেখে পরিকল্পনা করতে। কখন ভাঙবে, কেন ভাঙবে এই প্রশ্নগুলো আর্থিক শৃঙ্খলা তৈরি করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিলম্বিত তৃপ্তির অভ্যাস ভবিষ্যতে ঋণ ব্যবস্থাপনা, বাজেট পরিকল্পনা ও বড় বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে সহায়ক হয়।
শিশু থেকে বড়দের জন্যও কার্যকরমাটির ব্যাংক শুধু শিশুদের জন্য নয়। অনেক পরিবারে এখনো মাসের শুরুতে একটি নির্দিষ্ট অঙ্ক মাটির ব্যাংকে রাখার রীতি আছে। বছর শেষে সেই টাকা দিয়ে বই কেনা, ঘরোয়া সংস্কার বা জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহার করা হয়। এতে একদিকে সঞ্চয় হয়, অন্যদিকে হঠাৎ আর্থিক চাপ সামলানো সহজ হয়।
গ্রামবাংলায় মাটির ব্যাংক ছিল নারীদের আর্থিক নিরাপত্তার একটি নীরব হাতিয়ার। স্বামী বা পরিবারের অন্যদের অজান্তে নয়, বরং সম্মতিতেই গৃহস্থালি খরচ বাঁচিয়ে জমত টাকা। এই ছোট সঞ্চয় অনেক সময় চিকিৎসা, সন্তানের পড়াশোনা কিংবা দুর্যোগে বড় সহায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্ষুদ্র সঞ্চয়ের এই সংস্কৃতি গ্রামীণ অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা এনেছে।
কীভাবে মাটির ব্যাংক থেকে সর্বোচ্চ লাভ একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য ঠিক করুন, যেমন বই কেনা বা ভ্রমণ। প্রতিদিন বা সপ্তাহে নির্দিষ্ট অঙ্ক রাখার নিয়ম করুন। অপ্রয়োজনীয় ভাঙা এড়িয়ে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। শিশুদের ক্ষেত্রে ব্যাংক ভাঙার দিনটিকে উৎসবের মতো করুন, যাতে সঞ্চয়ের আনন্দ তৈরি হয়। ভবিষ্যতের পথে ছোট শব্দের বড় ভূমিকাপয়সার টুংটাং শব্দ আমাদের মনে করিয়ে দেয় বড় ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে ছোট সিদ্ধান্তে। মাটির ব্যাংক প্রযুক্তির প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং মানবিক অর্থচর্চার এক সহজ মাধ্যম। যেখানে সংখ্যা নয়, অভ্যাসই মুখ্য। আর সেই অভ্যাসই একদিন আত্মবিশ্বাসী, সচেতন ও দায়িত্বশীল ভবিষ্যৎ তৈরি করে।
মাটির ব্যাংক ভাঙার দিন যতটা আনন্দের, তার চেয়েও মূল্যবান হলো ভাঙার আগের অপেক্ষা। কারণ সেই অপেক্ষার মাঝেই মানুষ শেখে কীভাবে পয়সার টুংটাং শব্দে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে একটি শক্ত ভবিষ্যৎ।
তথ্যসূত্র: নিউজ১৮, জিনিয়াস
জেএস/