সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে ‘এপস্টেইন ফাইলস’। যৌন অপরাধী ও ধনাঢ্য ব্যবসায়ী জেফরি এপস্টেইনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের নথিপত্র বা এফআইলগুলো মার্কিন রাজনীতিতে এক বিশাল বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
দীর্ঘ সময় ধরে এই নথি প্রকাশের দাবিতে চাপ তৈরি হচ্ছিল এবং সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনও এই চাপ সামলাতে বাধ্য হয়েছে। এমনকি রিপাবলিকান পার্টির ভেতর থেকেও স্বচ্ছতার দাবি ওঠে। শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কিছুটা সুর নরম করেন এবং এপস্টেইন ফাইলসের কিছু অংশ আদালতের মাধ্যমে জনসমক্ষে আসে।
গত ৩০ জানুয়ারি, যুক্তরাষ্ট্রে এপস্টেইনের বিরুদ্ধে মানি-লন্ডারিং ও যৌন অপরাধের তদন্তের সঙ্গে যুক্ত ৩০ লাখের বেশি পৃষ্ঠার নথি প্রকাশ করা হয়। এই নথি শুধু একটি সাধারণ মামলা সংক্রান্ত নয়, বরং দীর্ঘ সময় ধরে পরিচালিত একটি বিশাল নেটওয়ার্কের তথ্য ধারণ করেছে। জেফরি এপস্টেইনের অপরাধ ইতিহাস দীর্ঘ এবং বিতর্কিত। ২০০৮ সালে ফ্লোরিডার পাম বিচে এক কিশোরীকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে প্রথম তদন্ত শুরু হয়। সে সময় তিনি প্রভাব খাটিয়ে প্রসিকিউটরদের সঙ্গে একটি আপিল চুক্তির মাধ্যমে বড় সাজা থেকে বেঁচে যান, তবে যৌন অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হন।
১১ বছর পর, ২০১৯ সালে, এপস্টেইন পুনরায় গ্রেফতার হন অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের দিয়ে যৌন ব্যবসার নেটওয়ার্ক চালানোর অভিযোগে। বিচারের অপেক্ষায় থাকা অবস্থায় তিনি কারাগারে রহস্যজনকভাবে মৃত্যু বরণ করেন, যা সরকারিভাবে আত্মহত্যা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এই দীর্ঘ তদন্ত প্রক্রিয়ায় ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্য, এপস্টেইনের বিভিন্ন সম্পত্তিতে অভিযান চালিয়ে সংগৃহীত নথিপত্র, ইমেইল এবং যোগাযোগ সংক্রান্ত দলিল সংগ্রহ করা হয়। এভাবেই জন্ম নেয় ‘এপস্টেইন ফাইলস’ নামের বিশাল নথিপত্র, যা এখন জনসমক্ষে আসে।
মার্কিন বিচার বিভাগ কোনো সম্পাদনা ছাড়াই তাদের ওয়েবসাইটে ডজনখানেক তরুণীর নগ্ন ছবি প্রকাশ করেছে, যাতে তাদের মুখমণ্ডল স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। এসব তরুণীর ছবি মার্কিন ধনকুবের যৌন নিপীড়ক ও নারী পাচারকারী জেফরি এপস্টেইনসংক্রান্ত নথিপত্রের অংশ হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়েছিল।
এপস্টেইন ফাইল নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা শুরু হওয়ার প্রধান কারণ হলো প্রকাশিত নথিতে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নামের উপস্থিতি। সেখানে তাদের বিকৃত যৌন আচরণ, কন্যা শিশু পাচার, শিশুদের ধর্ষণ, মানুষের মাংস খাওয়াসহ নানান বিতর্কিত তথ্য উঠে এসেছে। যদিও সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেক সময় অভিযোগ, অনুমান ও তথ্য মিশে যাচ্ছে, তবে বাস্তবে আদালতের দৃষ্টিকোণে নাম থাকা মানে অপরাধ প্রমাণ নয়।
ফাইলগুলোতে ট্রাম্পের নামও উল্লেখ থাকায় এটি রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ট্রাম্প দাবি করেছেন, ২০০৮ সালে এপস্টেইন প্রথমবার দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগেই তিনি তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলেন এবং কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানতেন না।
এছাড়া ব্রিটিশ রাজপরিবারের প্রিন্স অ্যান্ড্রু, মার্কিন প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, বিল ক্লিনটন, প্রযুক্তি নেতা ইলন মাস্ক ও বিল গেটস-তাদের নাম নথিতে এসেছে। যদিও প্রত্যেকে দাবি করেছেন, তারা কোনো অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, তবে নথিতে তাদের উপস্থিতি বা যোগাযোগের তথ্য রয়েছে। বিনোদন জগতের কিছু নামও এসেছে, যেমন মাইকেল জ্যাকসন, ডায়ানা রস ইত্যাদি।
সম্প্রতি হাউস ওভারসাইট কমিটির ডেমোক্র্যাটরা এপস্টেইন ও তার সহযোগী ঘিসলেন ম্যাক্সওয়েলের মধ্যে আদান-প্রদান হওয়া কিছু ই-মেইল প্রকাশ করেছেন। ২০১১ সালের একটি ই-মেইলে ট্রাম্পের নাম উল্লেখ থাকতে দেখা গেছে। প্রকাশিত ই-মেইল অনুযায়ী, একটি ভিক্টিম তার বাড়িতে ট্রাম্পের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছে। হোয়াইট হাউস নিশ্চিত করেছে যে ওই ভিক্টিম হলেন ভার্জিনিয়া গিফ্রে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মৃত্যুর আগে নিজেই গিফ্রে জানিয়েছিলেন তিনি ট্রাম্পকে কোনো অপরাধমূলক কাজে লিপ্ত দেখতে পাননি। এর ফলে এখন পর্যন্ত ফাইলগুলোতে ট্রাম্পের সরাসরি কোনো অপরাধমূলক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এপস্টেইন ফাইলসের আলোচনায় এক ধরনের ভয়াবহ চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে, কারণ এতে শুধু ট্রাম্প নয়, অনেক ধনকুবের, রাজনীতিবিদ, বিনোদন জগতের তারকা এবং সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম আসে। যদিও আদালতে এখনো তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ নেই, তবে নথির উপস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট ই-মেইল ও যোগাযোগ বিষয়টি জনসাধারণের কৌতূহল ও সন্দেহ তৈরি করেছে। এর ফলে সোশ্যাল মিডিয়ায় নথি সংক্রান্ত ব্যাপক গুঞ্জন চলছে।
এই ফাইল ফাঁস হওয়ার পদ্ধতিটিও একটি আলোচনার বিষয়। অনেকেই মনে করছেন এটি হ্যাক বা গোপন লিকের ফল, কিন্তু বাস্তবে এটি আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এপস্টেইনের মৃত্যুর পর তার বিরুদ্ধে চলমান মামলার নথি আদালতের নিয়ন্ত্রণে ছিল। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর আদালত ভুক্তভোগী ও সাংবাদিকদের আবেদন মেনে ধাপে ধাপে নথি প্রকাশের অনুমতি দেয়। ফলে জনসাধারণের নজরে এসেছে এই ফাইলগুলো, যা কোনো গোপন হ্যাক নয়, বরং আইনের স্বচ্ছতার অংশ।
জেফরি এপস্টেইনের অপরাধ নেটওয়ার্কে ঘিসলেন ম্যাক্সওয়েল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি এপস্টেইনের সহযোগী হিসেবে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের পাচার ও যৌন নিপীড়নে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। লিটল সেন্ট জেমস দ্বীপ কিনে এক গোপন সাম্রাজ্য তৈরি করেছিলেন জেফরি। তার এই সহযোগীর সঙ্গে নিলেই করতেন নারকীয় ও জঘন্য সব কর্মকাণ্ড।
এমনকি আদালতেও প্রমাণিত হয় যে, ম্যাক্সওয়েল এপস্টেইনের নেটওয়ার্ক পরিচালনায় সহায়তা করেছেন। এই রায় একদিকে ভুক্তভোগীদের জন্য ন্যায়বিচারের একটি ধাপ হিসেবে দেখা হয়, অন্যদিকে এটি স্পষ্ট করে দেয় যে এপস্টেইন একা ছিলেন না।
এপস্টেইন ফাইল নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোচনা শুধু নাম বা ব্যক্তির সঙ্গে যুক্তি প্রদর্শনের সীমাবদ্ধ নয়। এটি আধুনিক বিশ্বের ক্ষমতা, অর্থ এবং নৈতিকতার জটিল সম্পর্কও সামনে নিয়ে আসে। ক্ষমতাবানরা কীভাবে দীর্ঘ সময় ধরে অপরাধে জড়িত থেকেও আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করতে পারে, তা এখান থেকে স্পষ্ট হয়।
এপস্টেইন ফাইল আসলে আধুনিক বিশ্বের একটি অন্ধকার আয়না। এখানে বাস্তব অপরাধ আছে, ব্যর্থ বিচারব্যবস্থা আছে, আবার গুজব ও অতিরঞ্জনের বিপদও আছে। সত্যকে সামনে আনতে হলে প্রয়োজন প্রমাণ, স্বচ্ছ তদন্ত এবং ধৈর্য। ভবিষ্যতে আরও নথি প্রকাশ পেতে পারে, নতুন তদন্ত শুরু হতে পারে, আবার কিছু প্রশ্ন হয়তো চিরকালই অমীমাংসিত থেকে যাবে। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত এপস্টেইন ফাইল নিয়ে আলোচনা শুধু একজন ব্যক্তির গল্প নয়, এটি ক্ষমতা ও নৈতিকতার বৈশ্বিক সংকটের প্রতিচ্ছবি।
আরও পড়ুননতুন প্রজন্ম জানে না শহীদ আসাদের ইতিহাস!জানেন কি সোনা আসলে পৃথিবীর নয়
কেএসকে