রাজনীতি

আব্বাস-পাটওয়ারীর আসনে সমস্যার শেষ নেই

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই ঢাকা-৮ আসনে চলছে জমজমাট প্রচারণা। রাজধানীর মতিঝিল, শাহবাগ, রমনা, পল্টন ও শাহজাহানপুর থানা নিয়ে গঠিত এই আসন। আসনটিকে ঢাকার প্রাণকেন্দ্রও বলা যায়। তবে গ্যাস-পানি-বিদ্যুৎ আর নিরাপত্তাজনিত সমস্যার কারণে চরম অস্বস্তিতে আছেন এই আসনের ভোটার-সমর্থকরা। প্রার্থীরা ভোট চাইতে গেলেই নানান সংকট আর দুর্ভোগের কথা তুলে ধরছেন তারা।

স্থানীয়রা বলছেন, ঢাকা-৮ আসনে এবার এক অন্যরকম নির্বাচন হবে। যেখানে নাগরিক জীবনযাত্রার উন্নয়ন এবং সমস্যা সমাধান সবচেয়ে বড় আলোচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রার্থীরা যেমন নাগরিক সমস্যার সমাধানে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, ভোটাররা তেমনি তাদের প্রত্যাশা বাস্তবায়নকারী প্রার্থীকে নির্বাচিত করতে প্রস্তুত। এখন অপেক্ষা কেবল ১২ ফেব্রুয়ারির, যেদিন ভোট দিয়ে ফলাফল নির্ধারণ করবেন ভোটাররা।

ভোটারদের প্রত্যাশা

ঢাকা-৮ আসনে প্রার্থীদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, নাগরিকদের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান দেওয়া। যানজট, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট সমাধান, মাদকমুক্ত সমাজ, চাঁদাবাজি বন্ধ এসব দাবি তুলছেন ভোটাররা।

দুর্ভোগ বাড়িয়েছে যানজট

ঢাকা-৮ আসনের মতিঝিল, পল্টন, ফকিরাপুল, শাহজাহানপুর, মালিবাগ এলাকায় যানজট এখন বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিনের অফিসগামী মানুষ থেকে শুরু করে শিক্ষার্থীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা সড়কে সময় নষ্ট হচ্ছে। সড়ক ও ফুটপাতের সংকীর্ণতা এবং অপরিকল্পিত রাস্তা নির্মাণের কারণে এই সমস্যা আরও তীব্র হয়েছে। আর বর্ষা এলে তো কথাই নেই, রাস্তাঘাটে পানি জমে দুর্ভোগের যেন শেষ থাকে না।

এই অঞ্চলের বাসিন্দা ব্যাংকার জামান বলেন, ‘আমার বাচ্চা ভিকারুননিসা নূন স্কুলে পড়ে। প্রতিদিন অফিসে যাই মতিঝিল। কিন্তু দুটি পথেই ব্যাপক যানজটের কারণে জীবনের মূল্যবান সময় চলে যায়। নিত্যনৈমিত্তিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে যানজট। আমরা চাই, এই সমস্যা সমাধানে রাস্তা প্রশস্ত করা হোক। আমি এমন একজন প্রার্থীকে চাই, যিনি এই সমস্যার সমাধান করতে পারবেন।’

তবে জামান একাই নন, এমন সমস্যা নিয়ে পুরো আসনজুড়ে অনেকেই উদ্বিগ্ন। যানজটের বিষয়টি ঢাকার নাগরিক জীবনে একটি চিরন্তন সমস্যা। আর এর সুষ্ঠু সমাধান না হলে তা জনগণের জীবনযাত্রা আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠবে বলছেন ভোটাররা।

নগরজীবনের বড় সমস্যা গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট

ঢাকা-৮ এলাকায় গ্যাস ও বিদ্যুতের সমস্যাও প্রকট। জামান ও অন্যান্য বাসিন্দারা জানান, গ্যাসের সংকট প্রায়ই থাকে, আর বিদ্যুতের সমস্যা তো আছেই।

ভোটারদের মতে, তাদের জন্য এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। তারা চান, এমন একজন প্রার্থী নির্বাচিত হোক, যিনি এই বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের স্থায়ী সমাধান করবেন।

‘গ্যাস-বিদ্যুতের সমস্যার সমাধান যদি না হয়, তবে কোথা থেকে উন্নয়ন আসবে?’ এমন মন্তব্য করেন মাহবুব, যিনি রেলওয়ে কলোনির বাসিন্দা।

মাদকমুক্ত সমাজ

ঢাকা-৮ আসনের আরেকটি বড় সমস্যা হচ্ছে মাদক। এখানে অবাধে মাদক বেচাকেনা চলে। আর এটি বেড়েই চলেছে। বিশেষ করে রেলওয়ে কলোনি এবং শান্তিনগর এলাকায় মাদক বিক্রি ও সেবন প্রকাশ্যে চলছে। এই সমস্যার সমাধান না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তা মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।

মাদক সমস্যা নিয়ে উদ্বিগ্ন এখানকার বাসিন্দা মাহবুব বলেন, ‘এখানে মাদক নিয়ে একেবারে ভয়াবহ পরিস্থিতি। আমরা চাই, আগামীর প্রজন্ম যাতে মাদক থেকে দূরে থাকে এবং এই সমাজ মাদকমুক্ত হয়। এই বিষয়ের ওপর যে প্রার্থী বেশি মনোযোগ দেবেন, আমরা তাকেই  ভোট দেবো।’

ব্যবসায়ীদের আতঙ্ক চাঁদাবাজি

এই এলাকার ব্যবসায়ীদের বড় সমস্যা চাঁদাবাজি। বিশেষত ফুটপাতের দোকানিরা প্রতিদিনই চাঁদাবাজির শিকার হচ্ছেন। দোকান না চালিয়েও তাদের চাঁদার টাকা দিতে হয়।

মেহের নামে এক ফুটপাত দোকানি বলেন, ‘এটা আমাদের জীবনের একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যবসা করলেই চাঁদা দিতে হবে। আবার কোনো অনুষ্ঠান হলে সেখানেও চাঁদা চাওয়া হয়। এই সমস্যা যদি দূর না হয়, তবে কোনো লাভ হবে না।’

প্রার্থীদের অঙ্গীকার

ঢাকা-৮ আসনে মোট ভোটার ২ লাখ ৭৫ হাজার ৪৭১ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৫২ হাজার ৭৯৫ জন, নারী ভোটার ১ লাখ ২২ হাজার ৬৭৫ জন। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার আছেন একজন।

ঢাকা-৮ আসনে ১১ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারা হলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমেদ, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি)মুহাম্মাদ নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্কসবাদী) এ এইচ এম রাফিকুজ্জামান আকন্দ, বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (বাংলাদেশ জাসদ) এ. এফ. এম ইসমাইল চৌধুরী, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের এস এম সরওয়ার, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কেফায়েত উল্লা, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) ত্রিদ্বীপ কুমার সাহা, গণঅধিকার পরিষদের (জিওপি) মেঘনা আলম, জনতার দলের মোঃ গোলাম সারোয়ার, জাতীয় পার্টির (জাপা) মোঃ জুবের আলম খান ও বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের (মুক্তিজোট) মোঃ রাসেল কবির।

তবে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে মির্জা আব্বাস ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর মধ্যে। দুজনের মধ্যে পাল্টাপাল্টি কথার লড়াই চলছ। দুজনই তাদের প্রচারণায় নানা সমস্যা সমাধানের অঙ্গীকার করছেন ভোটারদের কাছে।

বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস প্রতিদিনই গণসংযোগ এবং মিছিল করছেন। তার প্রচারণায় উল্লেখযোগ্য বিষয় থাকছে, নাগরিক সুবিধা, যানজট সমস্যা, মাদক নিয়ন্ত্রণ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার উন্নয়ন।

অন্যদিকে, তরুণ প্রার্থী এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী জনগণের সমস্যাগুলোর ওপর জোর দিচ্ছেন। বিশেষত চাঁদাবাজি বন্ধ, যানজট নিরসন এবং মাদকমুক্ত সমাজ গঠনের বিষয়ে তার প্রতিশ্রুতি স্পষ্ট।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, সিপিবি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও তাদের নিজস্ব প্রতীক নিয়ে মাঠে নেমেছেন। তবে তাদের প্রচারণা খুব একটা চোখে পড়ছে না।

ইএআর/এসএনআর/এমএমএআর